ভাষা শহীদ ও ভাষা সৈনিক স্মরণে

অধ্যক্ষ আবদুস সামাদ

» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ - ০৮:২৩:২৮ অপরাহ্ন

আমারই ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী,
আমি কি ভুলিতে পারি?
ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারী, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই এর রাষ্ট্রভাষা কি হবে এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠালগ্নে জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানিন্তন ভিসি ডঃ জিয়াউদ্দিন আহমদ হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষার অনুরূপ পদক্ষেপ অনুযায়ী উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করে ভাষণ দেন। মহামনিষী,জ্ঞান তাপস ও ভাষাবিদ ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন। এতে তিনি বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে রাজনৈতিক পরাধীনতা হবে বলে মত প্রকাশ করেন। এটিকে তিনি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার নীতির পরিপন্থী বলে অভিমত দেন। তাঁর বক্তব্যকে তদানিন্তন বাঙালী সমাজ সাদরে গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালে এই নিবন্ধটিই ভারতের তৎকালীন ইংরেজি পত্রিকা ‘কমরেড’- এ ‘দ্যা ল্যাংগুয়েজ প্রব্লেম অব পাকিস্তান’ নামে প্রকাশিত হয়। এভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে তার পরিনাম কি হবে এই নিয়ে বিভিন্নপর্যায়ে শিক্ষিত সমাজে আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হবে এই মর্মে তৎকালীন পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি লিখিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পূর্বের চুক্তির বেমালুম ভুলে গিয়ে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় তিনি ঘোষণা দেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের আমজনতা।
এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পালিত হয় ধর্মঘট। ইতিমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) এর উদ্যোগে এর তদানিন্তন ভি.পি অরবিন্দ বোস এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ডাকসু জি.এস গোলাম আযম ছাত্রদের পক্ষ থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে তদানিন্তন সরকারের নিকট একটি স্মারকলিপি পেশ করেন।
এই অবস্থায় ঢাকা বার লাইব্রেরীতে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট একটি সর্বদলীয় কর্মপরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদে অন্যান্যদের মধ্যে আবুল হাশিম, অধ্যাপক আব্দুল গফুর, সামসুল হক, অধ্যাপক আবুল কাশেম, আতাউর রহমান খান, অলি আহাদ, আনোয়ারা খাতুন, সামসুল হক চৌধুরী, খয়রাত হোসেন, সৈয়দ আব্দুর রহিম প্রমুখ সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এই কর্মপরিষদের দিক-নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় এ আন্দোলন ক্রমশঃ বেগবান হয়। এই পর্যায়ে মোস্তফা নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি সংসদ গঠন করা হয়। এই সময়ে উর্দু হরফে বাংলা বই লিখে দেওয়ার জন্য টেন্ডার আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের এই অপচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী ছাত্রজনতার এক বিস্ফোরণ ঘটে। এক পর্যায়ে ছাত্রজনতার এক মিছিলে অকস্মাৎ পুলিশের গুলিতে সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র শহীদ হন। এই ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। আজ ২১ ফেব্রুয়ারী ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজও রাষ্ট্রের সর্বপর্যায়ে (অফিস-আদালত) সহ এখনো বৃটিশ শাসনের কলঙ্ক চিহ্ন ইংরেজির ব্যবহার অবাদে চলছে। জানিনা আমাদের শুভবুদ্ধির কবে উদয় হবে? পরিশেষে সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করি, যাদের অবদানে আমার মায়ের ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেল আল্লাহ তায়ালা যেন তাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকামে স্থান দেন,আমিন।