বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:২৯ পূর্বাহ্ন

ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা || পর্ব-৬

উত্তরা নিউজ। সাহিত্য ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

কয়েকদিন পরেই ঈদ-উল-ফিতর। তাই কীভাবে সবাইকে ছেড়ে এবার ইন্ডিয়াতে ঈদ কাটাবো সে-চিন্তাও মাথায় ছিল। সারাটা জীবন ফ্যামিলির সাথে ঈদ উদ্যাপন করেছি, এবার ফ্যামিলি ছাড়া ঈদ উদ্যাপন কেমন লাগে তার অভিজ্ঞতা অর্জনের আগ্রহও কম ছিল না। শিলা আপা ভাবছিলেন মালা আপার সাথে ঈদের সকালটা কাটাবো কিন্তু ভাগ্য আল্লাহর হাতে। কী কারণে হলো না তাও বলতে পারছি না। ঢাকা থেকে যাওয়ার পথে আমার এক কলিগ সুন্দর একটা পাঞ্জাবি কিনে দেয়। ভাবছি সেই পাঞ্জাবিটা পরেই ঈদ উদ্যাপন করবো। ঈদের আগের দিন রাতে বাসায় কথা বলতে বলতে রাত বেশি হয়ে যায়। ঘুমাতে পারিনি খুব একটা ঐ রাতে। এই প্রথম ফ্যামিলির সবাইকে রেখে দেশের বাইরে ঈদ করছি। আমাকে ছাড়া ফ্যামিলির সকালটা কেমন হবে ভাবতেই খারাপ লাগতো। বিশেষ করে ছোট ছেলে তাওসিফের জন্য। ও সকালবেলা আমার সাথে ঈদের নামাজ পড়তে যায়। আর দুই ছেলে বড় হয়েছে, যে যার মতো যেখানে ইচ্ছা ঈদের নামাজে যেতে পারবে কিন্তু তাওসিফ পারবে না। ওকে বড় দুই ছেলে নিয়ে যাবে কিনা এইসব ভেবে ভেবে রাত পার করি। তবে আমার ছেলেদের উপর খুব আস্থা আছে, আছে অনেক বিশ্বাস। খারাপ কিছু ওরা করবে না এমন আশা থাকে সব সময়।

আগামীকাল ঈদ-উল-ফিতর হবে কি হবে না এ নিয়ে বেশ নাটকীয়তা চলে। তাই রাতে ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারিনি। গভীর রাতে ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারি অবশেষে আগামীকালই ঈদ হচ্ছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ হাস্যরসের অবতারণাও হয়। সন্ধ্যার পর থেকে শিলা আপা ঈদের প্রস্তুতি নিতে বলেন। কোন পাঞ্জাবি পরবো কি করবো এ নিয়ে তার জানার আগ্রহের শেষ নেই। শেষ পর্যন্ত সেলুনে ঢুকে পড়ি। সামান্য পরিপাটি হয়ে বের হতেই দেখি শিলা আপা ও তার বোন কেনাকাটার জন্য পাহাড়গঞ্জের এ দোকানে ও দোকানে ঢু মারছে। আমাকে একটি পরিচ্ছন্ন মুখে দেখে তারা খুশি হয় যে, আমি ঈদের প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেলুন বয় ছিল মুসলিম তাই ওর কাছে ঈদের নামাজের খোঁজখবর নিয়ে আসি। ছেলেটা আমাকে আবার ওর বাসায় দাওয়াত দেয়। আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঈদের বখশিশ দিয়ে হোটেলে চলে আসি।

রাত যত গভীর হয়, ততই মনটা অস্থির হতে শুরু করে। বাসার সাথে একটু পর পর কথা বলছি। তারপরও স্থির হতে পারছি না। ঢাকা থেকে কোলকাতায় আসার একদিন আগে লিমার সাথে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। আসার সময় দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি। আগামীকাল ঈদ তাই ওর বিষয়টা নিয়েও মন খারাপ হয়। আমার কোনো নাম্বারও জানে না তাই কথাও হয়নি। আমার কলেজে ৫/৬ বছর যাবত চাকরি করলেও আজ পর্যন্ত সে আমার ফেসবুক বন্ধুও হতে পারেনি। তবে কিছুদিন আগে ওর একটা রিকোয়েস্ট আমি পেয়েছি। তাই বিলম্ব না-করে গ্রহণ করি এবং ওর ম্যাসেঞ্জারে যুক্ত হই। রাতেই ওর সাথে কথা বলি এবং সকালে আমার বাসায় যেতে ওকে অনুরোধ করি। ইন্ডিয়াতে কী কী কেনাকাটা করলাম তার ফিরিস্তি জেনে নেয় লিমা। কিছু বিষয়ে ওর পরামর্শও নিলাম। এমন করে মানসিকতা কিছুটা হালকা হলে ঘুমিয়ে পড়ি।

রাতে যদিও মালার সাথে কথা হয়, তবে আমি শিওর ছিলাম আগামীকাল আমি কারো বাসায় যাচ্ছি না। সকাল হতেই শিলা আপা নামাজের জন্য ডাকাডাকি শুরু করেন। নামাজে যাব যাব বলে ঘুমিয়ে পড়ি। উঠে গোসল করে নামাজ পড়ে ঈদের আয়োজন দেখতে বেরিয়ে পড়ি। আমাকে দিল্লির লাড্ডু আর মিষ্টি খাওয়ানোর জন্য আমার সঙ্গী-সাথিরা উঠে-পড়ে লেগে যায়। কোথায় ভালো মিষ্টি পাওয়া যায় তার খোঁজ-খবর শুরু করে। অবশেষে বাহ্যিক চেহারা দেখে একটা মিষ্টি পছন্দ করে মুখে দিয়ে ফেলে দিতে হলো। মোটেই ভালো লাগছিল না। আমি মুসলিম, আজ ঈদ, তাই আমার বোন সমতুল্য শিলা ও মাবেল আপা আমাকে আপ্যায়ন করানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাদের আশা পূর্ণ হয় এবং ঈদ মোবারক জানিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করি।

আমরা সম্ভবত ঐ দিন রাতেই কোলকাতা ফিরে আসবো তাই নানা ধরনের প্রস্তুতির জন্য রাস্তায় বের হই। তবে বাংলাদেশের ঈদ আয়োজন আর ইন্ডিয়ার ঈদ আয়োজনে অনেক পার্থক্য রয়েছে। মুসলিমরা ঈদ করছে আর হিন্দুরাও উৎসবের দিন মনে করে মজা করছে। রাস্তা-ঘাটে মিষ্টি বিলানোর অনেক দৃশ্য চোখে পড়েছে। গরিব-দুঃখী মানুষকে একজন আরেকজন আপ্যায়ন করাচ্ছে। এইসব দৃশ্য দেখছি, তবে মনের দিক থেকে নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছে। কেন যে ঈদের সময় ঢাকায় ফিরতে পারলাম না!

লেখক : ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান
প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ, ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কলেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২১
themesba-lates1749691102