রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৭:৩৪ অপরাহ্ন

উন্মোচিত আত্মার গান || পর্ব-৮

উত্তরা নিউজ, সাহিত্য ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: বৃহস্পতিবার, ১০ জুন, ২০২১

জাহিদ আসবে এটিএন নিউজ থেকে। বেশ কয়েকদিন যাবত আসার জন্য যোগাযোগ করছে। কী নিয়ে কথা হবে জাহিদের সাথে, মন কি ভালো আছে? কথা কি ভালোভাবে বলতে পারবো? আমার মন যে এখন আর ভালোনেই। দুই দিনের বৈরাগী আমি। আমি জানি এ-শব্দটা তানি আমাকে বলেনি, তবুও ভেতরে ভেতরে মানতে পারছিলাম না। অন্যসব সময় প্রতি-উত্তর দেয়ার চেষ্টা করলেওএখন আর চেষ্টা করলাম না, থেমে গেলাম। আমি বড়, ও আমার বয়সে ছোট, জ্ঞানবুদ্ধিও কম হবে ভেবে ফোন করবো না বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। ইতোমধ্যে জাহিদ প্রবেশ করলো। কুশল বিনিময়ের পর জাহিদ আমাকে শিক্ষামূলক একটি অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব দিলো এটিএন নিউজে। বিস্তারিত জানালো, অফিসের সাথে আমার নামে নাম নজরুল নামে এক ভদ্রলোকের সাথে আলোচনা করলো। আজই বিকাল ৩টায় আসবে।

এর ফাঁকে ড্রাইভার ঠিক হলো। তানির বাড়িতে যাব বলে ভাবছি কোথায় যাব কী করবো, আদৌ কি যাওয়া হবে? যেতে হবেই, না হয় আমার শিষ্যমাইন্ড করবে। যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা আছে। ২৫ তারিখ একটা সম্ভাবনা আছে। সেলিম সাহেবকে ফোন করলাম ২৫ তারিখের ব্যাপারে। তিনি ২৮ তারিখের কথা জানালেন। তারপর আমি ২৮ তারিখের পর ছাড়া ঢাকা ত্যাগ করতে পারছি না। এ-কথা তানিকে আর বলা যাবে নাÑও মাইন্ড করবে। পপি এসব জানে না, তবে আমি আসবো তা জানে। ওরা অপেক্ষা করছে দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেখা হবে। কী কথা হবে তা জানি না, কেমন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে তাও জানা নেই কারো। একটা আবেগ, একটা উৎকণ্ঠা কাজ করছে। আমার কোথাও কারো অফিস বা বাড়িতে গেলে আগাম বলে যেতে ইচ্ছা করে না। বাড়তি একটা চাপ অনুভব করি। যখন ইচ্ছা চলে যাব, কোনো যোগাযোগ করি না, চাপও অনুভব করি না কিন্তু এখানে কী করে না-বলে যাই! এরা যে আমার শিষ্য। একজন যে আমাকে খুবই ভালোবাসে। যদিও সে জানিয়েছে দীর্ঘ বিরতির পর তার মনে যদি আমি রেখাপাত করতে পারি, সেই শর্তে ভালোবাসা। এসব আমি আমলে দিই না। কারণ আমি জানি ‘নারীর মন আকাশের মেঘের মতোই বদলায়’। প্রেম-ভালোবাসা বিশেষত গুরু-শিষ্যের প্রেম-ভালোবাসা অন্যরকম। যা অন্যদের সাথে তুলনা করলে চলবে না, মিলবে না। এ-কথা বারবার শুনেছি কানে, গুরুত্ব দিইনি জীবনে। এখন শুধু গুরুত্বই পায়নি, জীবনে স্থান করে নিয়েছে হৃদয়ের গহিনে।

আমার আরেক ছাত্রী মিনম আমাকে প্রায়ই বলতো, স্যার, আপনাকে যে কখন ভালোলেগেছে আমি টের পাইনি। কেন যে আপনাকে ভালো লাগে তার উত্তর নেই আমার কাছে। জানতে চাইলে বলতো, এসব বলেকয়ে ঘোষণা দিয়ে হয় না, নিজের অজান্তে হয়ে যায়। ও এখন আমেরিকা আছে। যাওয়ার আগে বলেছিল কত কী করবে আমার জন্য। আর এখন যোগাযোগটুকুও নেই আমার সাথে। আমি ইচ্ছা করেই যোগাযোগ এক সময় করতাম না। ওর সংসার আছে, আমার কারণে যেন তা নষ্ট না-হয়। এফবি আইডিটাও ভুলে গেছি। আমার আইডিটা ওর খেয়াল আছে নিশ্চয়। আমি যে নিজের নামের পরিচয়ে আছি। ওর বাবা অবশ্য আমার সাথে রীতিমতো যোগাযোগ রাখে। ওর ভালোমন্দ খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করি। ভালো থাক মিনম সব সময়ে।

তানির সাথে বারবার বিরতি নেয়ার প্রশ্ন আসছে কেন। ৫/৭ দিন পরপরই একথা বলে আমাকে, শুরুতে আমি বুঝতে পারিনি। কারো সাথে কোনো সম্পর্ক হলে তাতে আমার বিরতি কেন? কথা শুরু হলে শেষ কি আর করা যায়? সকলের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। কেউ কেউ ক্লান্ত হতে পারে, নতুন সাবজেক্ট না-ও থাকতে পারে। নতুন নতুন বিষয় সামনে না-এলে তো কথা বলা যায় না। আমি অধ্যাপনা করি দীর্ঘ ২৫ বছর। আর তানি শিক্ষকতায় আছে প্রায় ১৬ বছর। অভিজ্ঞতার কমতি নেই কারো।

জানার খুব আগ্রহ নিয়ে একটা গবেষণার পরিকল্পনা করবো ভাবছি মনে মনে। মনে মনে যে গবেষণা করে তার কী নাম দেয়া যায় তা নিয়েও গবেষণা চালাতে হবে। আমার ধারণা এসব গবেষণার মধ্যদিয়ে একটা ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। অনেকদিন কেন মানুষ বন্ধত্ব সম্পর্ক টেনে নিয়ে যেতে পারে না। আজকাল কি এ-কারণেই সবাই বন্ধু পাল্টায়। জানি না, এর পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। তবে আমার মতো করে ওর কারণ জানবো, প্রয়োজনে অনেকদিন অপেক্ষা করবো। আমি যাদের সাথে কথা বলি কারো না কারো একটা কিছু আলাদা ক্যারেক্টার আছে। এটাই তানির নতুন কোনো ক্যারেক্টার কি না তা আমাকে জানতে হবে। আমার ধারণা আমার এ জানা পজেটিভ হবে। কারণ নেগেটিভ ধারণা অপছন্দ করি, নেগেটিভ কিছু আমার জন্য অপেক্ষা করে না। ওর সাথে এসব বিষয়ে অনেক মিল আছে। আমাদের চিন্তাগুলো অনেক সময় বড় অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। আশা করি এবারও মিলে যাবে, তবে মিলন হবে না!

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, মিলনে তৃপ্তি নেই, যা আছে বিরহে। মিলন আর বিরহ নিয়ে আমাদের পথ চলা। যার যা নেই তাই নিয়ে আফসোস করে। তাই মিলন ও বিরহ এমন জিনিস যা জীবনে সকলেরই কাম্যবস্তু। জীবনে যে যেটার দেখা পায় সে সেটির মূল্যায়ন করে না, যেটি না-পায় তার জন্য আফসোসের শেষ থাকে না। এই টানাপড়নের নামই কি বিরহ! ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এপিজে আবুল কালাম বলেছেন,‘স্বপ্ন সেটা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটা যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’। এ-কথা শোনার পর আমার মনে হচ্ছে প্রেম সেটা নয়, যে প্রেম কাজ করতে দেয়; প্রেম সেটা যা মানুষকে কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে। কেউ প্রেমে না-পড়লে এটা অনুভব করা কঠিন। আমার ফিলিংসটা এমন ছিল না কিন্তু তানির নাকি এমনটা হয়। কোনো কাজ করতে পারে না। প্রায়দিন বাড়িতে ওর মায়ের বকা খায়। গোসল ঘুম বিশ্রামের কোনো টাইম-ট্যাবল নেই। পড়াশোনার কোনো বালাই নাই।

আর আমার বেলায় সম্পূর্ণ উল্টো, আমার চলছে বেশ ভালো। অনেকদিন পর লেখা শুরু করলাম। প্রতিদিন লিখে যাচ্ছি। বরং যেদিন কথা কম হয় সেদিন লেখাও কম হয়। তাই লেখাই যেহেতু উদ্দেশ্য তাই কথা আর কম বলে লাভ কি? আমার এ-মতের সাথে তানি একমত না-ও হতে পারে। প্রত্যেকের আলাদা একটা জগৎ আছে, আছে আলাদা চিন্তাশক্তিও। তাই কাউকে কিছু চাপিয়ে দেয়া যায় না, উচিতও না।

মাঝে মাঝে ভাবি দুই অক্ষরের প্রেমের মধ্যে এমন কী শক্তি আছে যে, সকল কাজের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। পাঠক মাত্র বুঝতে পারবেন যে, আসলে এই শব্দের মাঝে অনেক শক্তি লুক্কায়িত আছে। এই শব্দটি মনে আসা মাত্র শরীরে এক ধরনের কম্পন তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রেমিক-প্রেমিকা একসঙ্গে কিছুক্ষণ থাকলে তাদের মধ্যে রক্ত-সঞ্চালন প্রক্রিয়া এত দ্রুত সম্পাদন হয় যা অন্য সময় হয় না। দুইজন একসাথে হলে কপালে ঘাম চলে আসে। হাত-পা কাঁপাকাঁপি শুরু করে। এর কারণ একটাই, রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া খুব দ্রুত সম্পাদন হচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা এভাবে সাধারণ দম্পতি ও প্রেমিক-প্রেমিকার রক্ত পরীক্ষা করে দেখেছেন দুই গ্রুপের রক্তের সঞ্চালন প্রক্রিয়া আলাদা। তারা প্রমাণ করেছেন অসুস্থ কোনো মানুষের পাশে যদি তার প্রেমিক বা প্রেমিকাকে রাখা যায় তবে সে দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। একথা প্রমাণিত সত্য যে, প্রেম ভালোবাসা বিরহ এগুলো কোনোটাই খারাপ না। তবে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য করে এটা স্বাভাবিক। কে কীভাবে গ্রহণ করলো, তার মাথায় কীভাবে সেটআপ দিলো তার উপর নির্ভর করছে সবকিছু। এই সেটআপের বিষয়টি নিয়ে কাজ করা দরকার। এখানে মেধার প্রশ্ন আছে, আছে বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজনও। জাগতিক জীবনের কর্মফলই মানুষ পারত্রিক জীবনে ভোগ করবে। এটা জেনেশুনে বুঝে প্রত্যেকেরই এই সেটআপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত। এটা যার যেমন ভালো হবে, সে তেমন ভালো ফল উপভোগ করবেন। ভালো না-হলে এর প্রায়শ্চিত্ত তাকে ভোগ করতেই হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হোক সেটা দুনিয়ায় কিংবা পরকালে। মানুষের সকল কর্মকাণ্ডের উত্তম ফল আসবে পরকালে এটা ভেবেই কাজ করা উচিত। উত্তম ভাবনাই নিয়ে যায় মানুষকে কল্যাণের পথে, স্বর্গীয় পথে।-চলবে

লেখক : ড. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম খান
প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ, ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কলেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা

নিউজটি শেয়ার করুন..

এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২১
Technical Support: Uttara IT Soluation
themesba-lates1749691102