২০২০ সালে চিকিৎসাক্ষেত্রের যুগান্তকারী ৫ উদ্ভাবন


» এইচ এম মাহমুদ হাসান | | সর্বশেষ আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০২১ - ০২:৫৬:০৮ অপরাহ্ন

করোনাভাইরাস এখন পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তাই ২০২০ সাল সবার জন্যই দুঃখের বছর। কেউ হারিয়েছেন তার প্রিয়জনকে। কেউ বা আত্মীয়কে। ব্যথা-বেদনা মনে নিয়ে নতুন বছরে পা রেখেছে বিশ্ববাসী।

তবে হারানোর ব্যথা যেমন ছিল; তেমনভাবে মহামারির বছরটি বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছে নতুন অনেক কিছু। ব্যস্ত জীবনে আমরা আসলে কেউই শারীরিক সুস্থতার দিকে নজর রাখি না। তবে করোনাভাইরাসের কারণে ঠিকই ব্যক্তিগত সুরক্ষা বজায় রাখা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়ার বিষয়গুলো শিখেছি।

ঠিক তেমনিভাবে মহামারির বছরজুড়ে চিকিৎসাক্ষেত্রেও যুক্ত হয়েছে নতুন সব উদ্ভাবন। দিন-রাত এক করে চিকিৎসক, গবেষক ও বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ হয়ে থেকেছেন। একের পর এক মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে অবসরের সময় পাননি বিভিন্ন হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সসহ ওয়ার্ডবয়রাও। যদিও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক নয়। সবাই নিউ নর্মাল লাইফ কাটাচ্ছেন।

২০২০ সালে চিকিৎসাক্ষেত্রে উদ্ভাবিত ৫টি যুগান্তকারী সাফল্য সম্পর্কে অনেকেই হয়তো জানেন না কিংবা নজরে আসেনি। অনকোলজি, জিন থেরাপিসহ হৃদরোগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের খুঁটিনাটি অনেক বিষয়ে চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের এসব আবিষ্কার পরবর্তীতে মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করবে।

জেনেটিক কোডের উদ্ভাবন: ২০২০ সালের অক্টোবরে দুই নারী গবেষক এমানুয়েল শারপেন্টার এবং জেনিফার এ ডাউডনা রসায়ন বিভাগে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। তারা ‘জেনেটিক সিজার্স’ আবিষ্কার করেন। নোবেল কমিটির মতে, এ আবিষ্কার জীববিজ্ঞানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা পশু, গাছপালা এবং মাইক্রোঅর্গানিজম বা উদ্ভিজ্জাণুর ডিএনএ-তে বদল ঘটাতে পারছেন। জীববিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে বলে আশাবাদী এ প্রযুক্তি। এমনকি তার প্রভাব নতুন ক্যান্সার চিকিৎসাতেও পড়বে।

নিউ ইয়র্কের ইংল্যান্ডার ইনস্টিটিউট ফর প্রিসিশন মেডিসিনের ডিরেক্টর পিএইচডি অলিভার এলিমেন্টো বলেন, ২০২০ সাল হলো জেনেটিক কোডের বছর। সিআরআইএসপিআর (জেনেটিক কোড) প্রযুক্তির পাশাপাশি জিন থেরাপির আবিষ্কার চিকিৎসাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।

হৃদরোগ ও স্ট্রোক গবেষণায় সাফল্য: আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ২০২০ সালে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনের তালিকা প্রকাশ করেছে। এরমধ্যে হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি (যখন হৃৎপিণ্ডের পেশী ঘন হয়ে যায় এবং শক্ত হতে পারে) এর চিকিৎসায় দারুণ সাফল্য পেয়েছেন গবেষকরা।

এটি নতুন চিকিত্সাগুলোর মধ্যে অন্যতম এক উদ্ভাবন। যা এট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন (এএফআইবি) এর প্রথম সারির চিকিৎসাপদ্ধতি পরিবর্তিত করতে পারে। নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে স্ট্রোক প্রতিরোধে এবং করোনারি হৃদরোগ প্রাথমিক চিকিৎসাতেই রোগী সুস্থ হবে বলে মত বিশেজ্ঞদের।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. মিচেল এসভি এলকিন্ড (এমএস, ফ্যান, ফাহা) বলেন, ২০২০ সালটি মেডিসিন বিভাগের জন্য দারুন সাফল্য বয়ে এনেছে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা জানতাম না যে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ব্যবহৃত সোডিয়াম গ্লুকোজ ট্রান্সপোর্টার ২ ইনহিবিটর বা এসজিএলটি ২ ইনহিবিটার ওষুধটি হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় কার্যকরী। এমনকি যদি ওই রোগীর ডায়াবেটিস না থাকে তবুও কাজ করে ওষুধটি। এমন খুঁটিনাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু পেয়েছি আমরা।

এলকিন্ড আরও বলেন, কোভিড-১৯ ব্যাধির যেমন কোনো ওষুধ নেই; তেমন আমরা রোগীদের বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ওষুধ প্রয়োগে তাদের সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেছি। সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশ-জাতি নির্বিশেষে বিশ্বের সব চিকিৎসক কোভিড মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করেছি। যার ফলেই অগ্রগতি ঘটেছে।

অনকোলজি অগ্রগতি: এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোন হেলথের পার্লমুটার ক্যান্সার সেন্টারের পরিচালক, পিএইচডি এমডি বেনজামিন নীল বলেছেন, ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা চলেছে। তার মতে, রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার প্রাথমিকভাবে শনাক্তকরণ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছে মহামারির বছরেই।

নীল আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে শরীরের টিউমারগুলো রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে ডিএনএ-তে ক্যান্সারের বিষয়টি প্রকাশ করে। এজন্য আমরা টিউমারগুলোকে পর্যবেক্ষণে রেখেছিলাম। টিউমারগুলোর সংবেদনশীলতা পরীক্ষা, ক্যান্সার পুনরাবৃত্তি এবং প্রোটিন-ভিত্তিক পরীক্ষার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে আমরা সফল হয়েছি।

বিগত একবছরের অন্যান্য গবেষণার মধ্যে গবেষকরা জেনেটিক মিউটেশনের জন্য নতুন এক উপায় ‘ড্রাগিং’ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এ ছাড়াও প্রোস্টেট ক্যান্সারের জন্য দায়ী অ্যান্ড্রোজেন রিসেপটরের (যা ক্যান্সার কোষগুলো বাড়ার কারণ) পরিমাণ হ্রাস করতে একটি যৌগ তৈরির কাজ চলমান, বলেন নীল।

চিকিত্সা ব্যবস্থা গণতান্ত্রিকীকরণ: ২০২০ সালেই মানুষ শিখেছে ‘নিউ নর্মাল লাইফ’ এ জীবনধারণ করতে। এ ছাড়াও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’সহ ঘরে বসেই নিজের চিকিৎসা করার বিষয়েও কিছু কিছু জ্ঞান আহরণ করতে হয়েছে সবাইকে।

জুমে বসে যেমন স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীরাও ক্লাস করেছে অনলাইনে; ঠিক তেমনই চিকিৎসকরাও রোগী দেখেছেন, কখনো আবার নিজেরাও মিটিং করেছেন। মরিস বলেন, যদিও বিষয়টি কোনো উদ্ভাবনের মধ্যে পড়ে না। তবে পরিস্থিতি আমাদের শিখিয়েছে সুস্থ থাকতে কত কী করতে হয়? প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মহামারি না এলে আমরা বোধ হয় কেউই অনলাইনে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতাম না।

তিনি আরও বলেন, পুরো মহামারিতে আমরা চিকিৎসক হিসেবে রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছি। তারা কখন কেমন বোধ করছেন এসব বিষয়েও আমরা ভিডিও কলিংয়ের মাধ্যমে জেনেছি এবং তাদের শারীরিক অবস্থাও বোঝার চেষ্টা করেছি। বিষয়গুলো আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে লাগবে।

রক্ত পরীক্ষা করে আলঝাইমার প্রকাশ: আলঝাইমার রোগ গবেষণা এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য অগ্রগতির একবছর ছিল ২০২০ সাল। খবরটি যুগান্তকারী হলেও এখনো পরীক্ষাধীন রয়েছে।

রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এর তথ্যমতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ লাখ মানুষ আলঝাইমারে আক্রান্ত। এ সংখ্যা ২০৬০ সালের মধ্যে তিনগুণ হয়ে যাবে।

২০২০ সালকে বিদায় দিয়ে হাজারো বেদনা মনে নিয়ে আমরা ২০২১ সালকে বরণ করে নিয়েছি। নতুন বছরটি নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও আশাবাদী।

মরিস বলেন, ২০২০ সাল বিশ্ববাসীর জন্য দুঃখের বছর। বিয়োগান্তক এবং বিপর্যয়ের এ বছর শুধু আমাদের কাঁদায়নি বরং এসব উদ্ভাবন আমাদের খুশিও করেছে। তাই যেমন সময়ই আসুক না কেন, প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞ থেকে সমস্যার সমাধান করে যেতে হবে।