হিটলারের জীবনী


» Md. Neamul Hasan Neaz | | সর্বশেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২০ - ১০:১১:২৮ অপরাহ্ন

এ্যাডলফ হিটলার কে চিনেন না, পৃথিবীরতে এমন মানুষ কমই আছে। অনেকের কাছে তিনি নায়ক, আবার অনেকের কাছে তিনি খলনায়ক। নায়ক থেকে কিভাবে তিনি খলনায়ক হয়ে উঠলেন- আমরা তা এই লেখার মাধ্যমে জানবো।

জন্মঃ

এ্যডলফ হিটলার, ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অষ্ট্রিয়ার ব্রানাউ নামে একটি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।

পরিবার ও শৈশব জীবনঃ

হিটলারের বাবার নাম ছিল এ্যালজ ও মায়ের নাম ছিল ক্যালারা। তার বাবা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামান্য চাকরি করতের। যা আয় করত তার পত্নী আর তাদের ছেলে মেয়েদের দুই বেলা খাবার ঠিক মত চলত না। হিটলারের বাবার তিন স্ত্রী ও ছয় সন্তান ছিল। হিটলার ছিলেন তার বাবার তৃতীয় স্ত্রীর তৃতীয় সন্তান। সংখ্যার দিক থেকে চতুর্থ সন্তান।

ছেলেবেলা থেকেই হিটলার ছিলেন একগুঁয়ে, জেদি ও রগচটা স্বভাবের। সামান্য ব্যাপারেই রেগে যেতেন। অকারণে শিক্ষকদের সঙ্গে তর্ক করতেন। পড়াশোনাতে তার তেমন মনোযোগ ছিল না। তাকে বেশি আকৃষ্ট করত ছবি আঁকা। যখনই সময় পেতেন কাগজ পেন্সিল নিয়ে ছবি আঁকতেন। তিনি একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু বাবার ইচ্ছা ছিল স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে কোনো কাজ কর্ম জুটিয়ে নেবে। কিন্তু এগারো বছর বয়সে হিটলার ঠিক করলেন আর পড়াশোনা করবেন না, এবার পুরোপুরি ছবি আঁকতে মনোযোগী হবেন। বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই স্কুল ছেড়ে দিলেন। স্থানীয় এক আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না। একটা বেসরকারি স্কুলে ভর্তি হলেন। ১৯০০ সালে তার ছোট ভাই এডমুন্ড মারা যান। এতে তিনি খুব ভেঙ্গে পড়েন কারণ এডমুন্ড শুধু ‍হিটলারের ভাই ই ছিলেন না, খুব ভাল বন্ধুও ছিলেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি ভীষণ একাকী ও আস্তে আস্তে অন্তর্মুখী হয়ে পড়েন। ১৯০৩ সালে তার বাবার মৃত্যু হয় এবং তার দুই বছর পর টাকার অভাবে হিটলারের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯০৭ সালে তার মায়ের মুত্যুর পর তিনি সম্পূর্ণ পারিবারিক বন্ধনহীন হয়ে পড়েন।

জীবিকার অন্বেষণে গ্রাম ছেড়ে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় চলে এলেন। ভিয়েনাতে এসে তিনি প্রথমে দিনমজুরের কাজ করতেন। কখনো মাল বইতেন। কখনো রং বিক্রি করতেন, কখনও পোস্টকার্ড বিক্রি করতেন। এছাড়া কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছবি এঁকেও কিছু উপার্জন হতো। কিন্তু ভিয়েনাতে, দৈনিক যৎসামান্য টাকা দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা হলেও বাসস্থানের ব্যবস্থা হতো না। ফলে তাকে রাস্তয় রাস্তায় রাত কাটাতে হতো।

ইহুদীদের প্রতি বিদ্বেষঃ

ভিনেয়াতে তিনি চারুকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুই বার ভর্তির আবেদন করেন এবং দুইবারই তিনি প্রত্যাখ্যাত হন। তৎকালীন সময়ে জার্মানির অধিকাংশ কলকারখানা, সংবাদপত্রের মালিক ছিল ইহুদীরা। দেশের অর্থনীতির অনেক খানিই তারা নিয়ন্ত্রণ করত। খৃষ্টানদের অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হতো। হিটলার কিছুতেই মানতে পারছিলেন না, জার্মান দেশে বসে ইহুদিরা জার্মানদের উপরে প্রভুত্ব করবে। এডলফ হিটলার আক্ষেপ করে বলেছিলেন- “ইহুদীরা বেইমান জাতি, এদের কখনও বিশ্বাস করতে নাই, একদিন বিশ্ববাসী বুঝবে ওদের (ইহুদীদের) সম্পর্কে আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা”। মনের মাঝে ইহুদীদের প্রতি প্রচন্ড ঘৃনা নিয়ে ১৯১২ সালে ভিয়েনা ছেড়ে জার্মানির মিউনিখে চলে আসলেন। কিন্তু ভিয়েনাতে থাকার সময়েই তার মনের মধ্যে প্রথম জেগে ওঠে ইহুদী বিদ্বেষ। তবে তার মনে কেন ইহুদী বিদ্বেষ সৃষ্টি হয় তা নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে।

সৈনিক হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানঃ

দুঃখ-কষ্ট আর বেঁচে থাকার সংগ্রামে আরো দুই বছর কেটে গেল। ১৯১৪ সালে শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর স্থায়ী ছিল। হিটলার জার্মান সৈনিক হিসেবে যুদ্ধে যোগদান করলেন। যুদ্ধে বেশিরভাগ সময়ই হিটলার অগ্রভাগ পরিহার করে পশ্চাৎ ভাগে অবস্থান করলেও হিটলার বেশির ভাগ সময় যুদ্ধ ক্ষেত্রেই উপস্থিত ছিলেন এবং সোম নামক এক যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি আহত হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হিটলার আবার মিউনিখে ফিরে আসেন এবং জার্মান সেনাবাহিনীর জন্য কাজ করেন। অসীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও আহত হওয়ায় তাকে ‘আইরন ক্রস ফার্স্টক্লাস’ খেতাব ও ‘ব্ল্যাকওউন্ডব্যজ’ দেওয়া হয়।

রাজনীতিতে প্রবেশঃ

একজন চৌকষ ও বুদ্ধিদীপ্ত সৈনিক হিসেবে জার্মান সেনাবাহিনীতে তার নাম ছড়িয়ে পড়লো। জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির (DAP) কার্যক্রম সমূহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন এবং ইহুদী বিদ্বেষ, জাতীয়তাবাদ  ও মার্ক্সবাদ বিরোধী চিন্তাধারা গুলো পার্টির প্রতিষ্ঠাতা নেতা এন্টোন ড্রেক্সলারের কাছ থেকে রপ্ত করতে থাকেন। ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে হিটলার DAP তে যোগদান করেন যা তখন তার নাম পরিবর্তন করে National sozialistische Deutsche Arbeiter partei (NSDAP) নাৎসি নাম ধারন করে। ১৯২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম নাৎসি দলের সভা ডাকা হলো। সভাতে হিটলার প্রকাশ করলেন তার পঁচিশ দফা দাবি। এরপর হিটলার প্রকাশ করলেন স্বস্তিকা চিহ্নযুক্ত দলের পতাকা। ক্রমশই নাৎসি দলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। তিন বছরের মধ্যেই দলের সদস্য হলো প্রায় ৫৬০০০ এবং এটি জার্মান রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণভূমিকা গ্রহণ করল।

হিটলার ব্যক্তিগতভাবে নাস্তিক পার্টি ব্যানার ডিজাইন করে, স্বস্তিকাকে প্রতীক করে এবং এটি একটি লাল পটভূমিতে একটি সাদা বৃত্তে স্থাপন করে। তিনি ভার্জিনিয়ার চুক্তি, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিবিদ, মার্কসবাদী ও ইহুদীদের বিরুদ্ধে তাঁর বিব্রতকর বক্তব্যের জন্য অবিলম্বে কুখ্যাতি অর্জন করেন। ১৯২১ সালে নাৎসি দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড্রেক্সলারকে বাদ দেন হয় এবং হিটলার নিজে নাৎসি পার্টির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

হিটলারের দরিদ্র বিয়ার-হল বক্তৃতা নিয়মিত শ্রোতাদের আকৃষ্ট করতে শুরু করে। প্রাথমিক অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক আর্নেস্ট রোহম, নাৎসি আধা-সামরিক বাহিনী স্টারমাবিটিলংং (এসএ) -এর প্রধান, যা মিটিং গুলিকে সুরক্ষিত করে এবং প্রায়শই রাজনৈতিক বিরোধীদের আক্রমণ করে। তার স্পষ্ট মতবাদ, বলিষ্ঠ বক্তব্য জার্মানদের আকৃষ্ট করল। দলে দলে যুবক তার দলের সদস্য হতে আরম্ভ করল। সমস্ত দেশে জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠলেন হিটলার।

বিয়ার হলের বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানঃ

১৯২৩ সালের ৮ নভেম্বর, হিটলার এবং এসএ বার্লিয়ার প্রধানমন্ত্রী গুস্তভখা এর ব্যাপারে মিউনিখের একটি বৃহৎ বিয়ার হাউসে এক আলোচনায় বসেছিলেন। হিটলার সেখানে ঘোষণা করেছিলেন যে জাতীয় বিপ্লব শুরু হয়েছে এবং নতুন সরকারের গঠন ঘোষণা করা হয়েছে। হিটলারের ঘোষণা কে কেন্দ্র করে একটি ছোট সংগ্রাম হয় এবং কয়েকজনের মৃত্যু হয়। এই স্বপ্লকালিন ও ছোট আন্দোলনটি “বিয়ার হল অভ্যুত্থান” নামে পরিচিত। কিন্তু অভ্যুত্থানটি পুরাপুরি ব্যর্থ হয়। এই ইস্যু তে হিটলার কে গ্রেফতার করা হয় এবং সাজা হিসেবে নয় মাসের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

হিটলারের আত্নজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মাইন ক্যামাফ’ (আমার সংগ্রাম)ঃ

কারাগারে থাকার সময় হিটলার তার তাঁর ডেপুটি রডলফ হেসকে দিয়ে তিনি তাঁর আত্মজীবনী মূলক বই লিখান। বইটির নাম দিয়ছিলেন “মাইন ক্যাম্ফ” (আমার সংগ্রাম)। বইটির প্রথম খন্ড ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয় এবং ১৯২৭ সালে দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয়। এটি ১১ টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ১৯৩৯ সালে ৫ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়। বইটির প্রথম খন্ডে হিটলার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, শ্রেষ্ঠ জাতিস্বত্ত্বার, ইহুদী বিদ্বেষ বিষয় সমূহ এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ ও জার্মানির পূর্বাংশ রাশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করার ঘোষণা দেন। অনেক অযোক্তিক  ও গাঁজাখুরি কল্পনা এবং ব্যকরনগত ভুল থাকার পরও ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জার্মান জাতির কাছে আশার আলোকবর্তিকা হিসেবে স্থান করে নেয়।

জার্মানির চ্যান্সেলরঃ

 ১৯৩০ সালের বিশ্বমন্দা ও বেকারত্ব হিটলারের জন্য একটি রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। কারন এমন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জার্মানরা দলে দলে সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকতে থাকে। ১৯৩২ সালে হিটলার ৮৪ বছর বয়সী পল ভন হিনডেনবার্গের বিপরীতে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে লড়েন এবং ৩৬ শতাংশের ও বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচনের সব পর্যায়ে দ্বিতীয় হন। এই নির্বাচনী ফলাফল হিটলারকে জার্মান রাজনীতির এক অন্যতম পুরোধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। হিনডেনবার্গ রাজনৈতিক সমতা আনয়নের জন্য হিটলারকে জার্মানির চ্যান্সেলর পদে নিযুক্ত করেন।

জার্মানির চ্যান্সেলর পদে হিটলার তার চ্যান্সেলর পদকে শুধুমাত্র একটি বৈধ স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সীলমোহর হিসেবে ব্যবহার করেন। সংসদে সন্দেহজনক অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর তিনি রাইখ্শ ট্যাগ অগ্নি আইন জারি করেন এবং মৌলিক অধিকার খর্ব করে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচার বহির্ভূত আটক করতে থাকেন। এরপর হিটলার সংবিধানে সংশোধনী এনে তার মন্ত্রীসভার মাধ্যমে সম্পূর্ণ আইনসম্মতভাবে চার বছর ধরে ক্ষমতা ধরে রাখার নীল নকশা ও করতে থাকেন। সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় (আইনগত ও নির্বাহী) ক্ষমতা গ্রহণের পর হিটলার ও তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের একে একে চাপের মুখে ফেলতে থাকেন।

১৯৩৩ সালে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভীতি প্রদর্শন করে জোরপূর্বক রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে থাকেন। ১৪ই জুন, ১৯৩৩ সালে নাৎসি দলকে জার্মানির একমাত্র বৈধ দল হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং একই বছরের অক্টোবরে হিটলার জাতিপুঞ্জ থেকে জার্মানির সদস্যপদ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ১৯৩৪ সালের আগস্টে হিনডেনবার্গের মৃত্যুর একদিন পূর্বে হিটলারের মন্ত্রীসভা রাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা চ্যান্সেলরের সাথে একীভূত করে একটি আইন পাশ করে। এই আইনের পর থেকে হিটলার একই সাথে সরকার প্রধান, একমাত্র বৈধ দলের সর্বোচ্চ নেতা এবং জার্মানির চ্যান্সেলরের পদে অধিষ্ঠিত হন।

সরকার প্রধান হিসেবে হিটলার সেনাবাহিনীরও সর্বাধিনায়ক হন। তিনি তার সমস্ত ক্ষমতা নিয়োগ করলেন দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে। তার সহযোগী হলেন বেশ কয়েকজন দক্ষ সেনানায়ক এবং প্রচারবিদ। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত প্রদেশে বিশাল সৈন্য সমাবেশ করলেন। তার এই সাফল্যের মূলে ছিল জনগণকে উদ্দীপিত করার ক্ষমতা। তিনি দেশের প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে ঘুরে জনগণের কাছে বলতেন ভয়াবহ বেকারত্বের কথাদারিদ্র্যের কথানানা অভাবঅভিযোগের কথা। এই কৌশলে তিনি ধীরে ধীরে জার্মান জাতির সমর্থন আদায় করতে পেরেছিলেন।

হিটলারকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করাঃ

১৯৩৮ সালে, হিটলার এবং অন্যান্য ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটি জার্মানির সুদেন্দ্রভূমি জেলাকে ভার্জিনিয়ার সংকটের অংশে পরিণত করে। সামিটের ফলে ১৯৩৮ সালে হিটলারকে টাইম ম্যাগাজিনের ম্যান অব দ্য ইয়ার নামে নামকরণ করা হয় এবং ১৯৩৯ সালে শান্তিতে নোবেল পুরুস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল।

ইহুদীদের বিরুদ্ধে আইন  বিধিমালাঃ

১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৯ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, হিটলার এবং তার নাৎসি শাসনব্যবস্থা সমাজে ইহুদীদেরকে সীমাবদ্ধ ও বাদ দেওয়ার জন্য শত শত আইন ও বিধিমালা প্রতিষ্ঠা করে। ইহুদিদের অত্যাচারের জন্য নাৎসিদের অঙ্গীকারের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে সরকার এই সমস্ত সভায় এই এন্টি-সেমিটিক আইনগুলি জারি করা হয়েছিল।

১ এপ্রিল, ১৯৩৩ তারিখে, হিটলার একটি ইহুদি ব্যবসার জাতীয় বয়কট বাস্তবায়ন। এটি ৭ এপ্রিল, ১৯৩৩ তারিখে “পেশাগত সিভিল সার্ভিসের পুনর্নির্মাণের আইন” দ্বারা অনুসরণ করা হয়েছিল, যা ইহুদিদের রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বাদ দিয়েছিল। আইনটি ছিল আরিন অনুচ্ছেদের একটি নাৎসি বাস্তবায়ন যা ইহুদিদের এবং ইহুদিদের অস্তিত্বের কথা বলেছিল। জার্মান ছাত্র ইউনিয়নের প্রেস এবং প্রচারের প্রধান অফিসে “অ-জার্মান আত্মা বিরুদ্ধে পদক্ষেপ” বলা হয়, ছাত্ররা সেন্সরশিপ এবং নাজি প্রচারের যুগের সূচনা করে ২৫ হাজার “অ-জার্মান” বই পুড়িয়ে দেয়। ১৯৩৪ সালে ইহুদী সকল অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের ফিল্ম বা থিয়েটারে অভিনয় থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

১৯৩৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, রেইচস্ট্যাগ ন্যুরেমবার্গ আইন সমূহের সূচনা করে, যা ইহুদীদের তিন বা চারটি দাদা-দাদীর সাথে যে কেউ “ইহুদী “কে সংজ্ঞায়িত করে, ইহা ইহুদী বা ইহুদীদের ধর্ম বলে মনে করে না। নুরেমবার্গ আইনসমূহ “জার্মান রক্ত ​​এবং জার্মান সম্মান রক্ষা করার জন্য আইন,” যা অ-ইহুদী ও ইহুদী জার্মানদের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ করেছে এবং রেইক সিটিজেনশিপ আইন, যা জার্মান নাগরিকত্বের সুবিধাগুলির “অ-আর্য” থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এবং সমকামীদের নির্যাতনঃ

হিটলারের ইউজেনিক নীতিগুলি শিশুকে শারীরিক ও বিকাশের অক্ষমতাকেও লক্ষ্যবস্তু করে, পরে অক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি উত্সৃষ্টির অনুষ্ঠান অনুমোদন করে। তাঁর শাসনামলে ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে প্রায় ১ লাখ জন সমকামীদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। এবং তাদের উপর বিভিন্নভাবে অত্যাচার ও হত্যা করা হয়েছিল। আটক সমকামী বন্দিদের তাদের সমকামীতা সনাক্ত করার জন্য গোলাপী ত্রিভুজ পরতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা নাৎসি একটি অপরাধ এবং একটি রোগ বিবেচনা করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধেও পৃথিবীর ক্ষমাতাধর রাষ্ট্রগুলো দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। জার্মানের সাথে ছিল জাপান, ইতালি, হাঙ্গেরী সহ আরও কয়েকটি দেশ। হিটলারের প্রতিপক্ষ ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত মিত্রশক্তি। রাশিয়াও ছিল মিত্রশক্তির সাথে। হিটলার দক্ষ কূটনৈতিক চালে জার্মানীর সাথে ইতালি ও অস্ট্রিয়া কে একই সূত্রে আবদ্ধ করে নেন।

১৯৩৯ সালের ১ লা সেপ্টেম্বর জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণ করে। এই দিন থেকেই শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রতিক্রিয়াতে, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স দুই দিন পরে জার্মানিতে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৪০ সালে হিটলার তাঁর সামরিক কার্যক্রমকে অগ্রসর করেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, লুক্সেমবুর্গ, যুগোস্লাভিয়া, গ্রীস, নেদারল্যান্ডস এবং বেলজিয়াম আক্রমণ করেন। ইতালির সহযোগীতায় জার্মানী, আলবেনিয়া ও ইথিওপিয়ার কিছু অংশ দখল নিয়ে নেয়। চারিদিক দিয়ে হিটলার বিজয়ী হতে লাগলো। ইতিমধ্যে রুমনিয়া, বুলগেরিয়া ও হাঙ্গেরি জার্মানীর সাথে যোগ দিলো। ফলে সমগ্র দক্ষিন ইউরোপ জার্মানির নিয়ন্ত্রণে এসে গেল।

ফ্রান্সের পতনের পর ১৯৪১ সালের ২২ জুন, সমস্ত চুক্তি লঙ্ঘন করে রাশিয়া আক্রমন করে। রাশিয়াতে, জার্মান বাহিনীর একটি বিশাল সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন। এটাই ছিল হিটলারের প্রধার ভুল। রাশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় হিটলার দখল করলেও শীত আসতেই হিটলার বাহিনী বিপর্যস্ত হতে লাগলো। শীতে, রাশিয়া প্রচন্ত গতিতে গেরিলা হামলা করতে লাগলো। জার্মানরা পিছু হটতে শুরু করলো। অবশেষে ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে জার্মান ও ইতালি বাহিনী মিত্রশক্তির কাছে আত্নসমর্পণ করলো।

অন্যদিকে, ১৯৪৫ সালের ২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও রাশিয়া পটাসডাম সম্মেলনে জাপানকে আত্নসমর্পণ করতে বললো। কিন্তু জাপান তা প্রত্যাখ্যান করলো। পরে, ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ পারমানবিক বোমাবর্ষণ করলো। ফলে ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট জাপান শর্তহীনভাবে আত্নসমর্পণ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল দীর্ঘ ছয় বছর স্থায়ী ছিল।

হিটলারের মৃত্যুরঃ

যখন চারিদিক থেকে পরাজয়ের সংবাদ আসতে থাকে, তখন হিটলার উন্মাদের মত হয়ে উঠেন। ১৯৪৫ সালের ২৯ এপ্রিল, হিটলারের শেষ ভরসা তার স্টেটইনের  সৈন্যবাহিনী বিদ্ধস্ত হয়ে যায়। তার অধিকাংশ সঙ্গীসাথী তাকে ছেড়ে যায় এবং আত্নসমর্পণের প্রতাব দেন। কিন্তু হিটলার নিজের আত্নসমর্পণ মেনে নিতে চাইলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জার্মান বাহিনীর পরাজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। হিটলার তার ১২ বছরের বান্ধবী ইভা ব্রাউনকে বার্লন ছেড়ে পালিয়ে যাবার প্রস্তাব দেন কিন্তু ইভা তার প্রিয়তম হিটলার কে ছেড়ে পালিয়ে যেতে অস্বীকার করেন এবং আমৃত্যু এক সাথে থাকার অঙ্গীকার করেন।

১৯৪৫ সালের ২৯ এপ্রিল মধ্যরাতে, হিটলার তাঁর বান্ধবী ইভা ব্রাউনকে তার বার্লিন বার্নকারের একটি ছোট্ট সিভিল অনুষ্ঠানে বিয়ে করেছিলেন। তারপর তিনি দুইটি চিঠি লিখলেন। একটি চিঠিতে তিনি সব কিছুর জন্য ইহুদীদের অভিযুক্ত করলেন এবং অন্য চিঠিতে তার সমস্ত সম্পত্তি পার্টিকে দান করে গেলেন।

১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল চারদিক তিনি ড্রাইভার ও আরও একজনকে বললেন, মৃত্যুর পর যেন তাদের লাশ এমনভাবে পোড়ানো হয়, দেহের কোন অংশ অবশিষ্ট না থাকে। বিকেল সাড়ে তিনটায় সবার সাথে করমর্দন করে তিনি তার ঘর ডুকলেন এবং নিজের মুখের ভিতর গুলি করে আত্নহত্যা করলেন। এবং ইভা ব্রাউন, হিটলারের মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেই বিষ খেয়ে আত্নহত্যা করেছিলেন।

হিটলার খাবারের জন্য একটি নির্দিষ্ট খাদ্য তালিকা মেনে চলতেন। তার খাবারের তালিকায় মদ্য ও আমিষ, বিশেষ করে মাংস নিষিদ্ধ ছিল। তার খাদ্য তালিকায় ধর্মের ছাপ দেখা যায়। তিনি উচ্চতর জাতিস্বত্ত্বায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি জার্মানদের তাদের শরীরে ভেজাল ও বিষমুক্ত রাখার উপদেশ দিতেন এবং দেশব্যাপী ধুমপান বিরোধী প্রচারণা চালাতেন।

বিংশ্ব শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ত্ব হলো এডলফ হিটলার এবং সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত জার্মান জাতিকে পুর্ণঃগঠন এবং পৃথিবীর অন্যতম সামরিক শক্তিতে বলিয়ান করে তুলেছিলেন। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল নায়ক ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যা বিশ্বকে শুধু ক্ষতিগ্রস্থই করেনি, করেছিল বাকরুদ্ধ।

তথ্য সংগ্রহঃ

* তরেক শামসুর রহমান, ‘বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর’, ঢাকা, ২০১৬

* মাইকেল এইচ হার্ট, ‘বিশ্বেরে শ্রেষ্ঠ মনীষীর জীবনী’, ঢাকা, ২০০৫

* ছবি সংগ্রহ- ইন্টারনেট