হাজার বছরের হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান ভারত উপমহাদেশ

আদব আলীর সত্যকথন

» উত্তরা নিউজ ডেস্ক জি.এম.টি | | সর্বশেষ আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২০ - ১১:০৪:০৭ পূর্বাহ্ন

আজ আমি কোন মুহাম্মদ বিন কাসিমের কথা বলছি না। আমি কোন সুলতান মুহাম্মদ ঘুরি কিংবা ইব্রাহিম লুধির কথা বলছি না। অবশ্য আমি কোন প্রীর্তিরাজ কিংবা কোন মুসলিম যোদ্ধার ইতিহাসও টানবো না এখানে। অতীতে কি হয়েছে সেটা বলার জন্য আমার আজকের এ লিখনী না। বৃহত্তর ভারত উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ঘটেছে বহু পূর্বে। যে কোন প্রেক্ষাপটেই হোক না কেন এখানে মুসলমানদের আগমন হয়েছে আনেক আগে থেকে। কেউ বলছে তলোয়ারের তেজস্বীয়তায় মুসলমানরা জয় করেছে গোটা ভারত। কেউ বলেছে সুফি দরবেশ আর অলি আল্লাহগনের দাওয়াতের মাধ্যমে এদেশের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। কেউ বলেছে আরব বনিকদের ব্যবসায়ী কাজে ঘন ঘন আসা-যাওয়ার ফলে ভ্রাতৃত্বের যে বন্ধন হয়েছে উভয় জাতির মাঝে, তাতে ইসলামের পথে পা বাড়িয়েছে এদেশের মানুষ। কেউ বলেছে দীর্ঘকাল যাবত সনাতন ধর্মে উচু নিচু আর ধনী গরিবদের মধ্যে গোষ্ঠীগত পার্থক্য আর নিচুদের উপর জুলুম অত্যাচারের ফলে নিচু জাতিরা নতুন এক ধর্মের অপেক্ষোয় ছিলো বহু কাল যাবত আর তারই প্রতিফলন। অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করেছে তারা।

যে যাই বলুক আজ; আমি বলবো ভারত উপমহাদেশে ইসলাম এসেছে মূলতঃ মুহাম্মদ (সা:) এর আগমনকাল থেকেই। রাসূলের আঙুলের ইশারায় চাঁদকে দিখন্ডিত করার দৃশ্য কেরালা থেকে স্বচক্ষে দেখেছিলেন কেরালার জমিদার পরিবার প্রথম। ফলে তাদের মধ্যে পরিমল নামক ব্যক্তি প্রথম কলমা পাঠ করেন। খন্ডিত চাঁদ দেখে মনে মনে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, মদিনায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করবেন তিনি। অবশ্য তাই করেছিলেন তিনি অথচ মুহাম্মদ (সা:) ইতোমধ্যে পরকালে গমন করেন। তিনি মুসলমান হয়ে কেরালায় ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি সঙ্গে থাকা তার সন্তানকে উপদেশ দিয়ে যান, যেন তার পরিবারের সকলকে এই ইসলাম গ্রহনের কথাটি বলে দেয়। এছাড়া তাদের সকলকে ইসলামের পথে দাওয়াত দেয়। এরপর সে পরিবারের সকলেই ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত হয়েছিলেন। এই ধারাবাহিদতায় কেরালায় সর্বপ্রথম জুমা মসজিদটি স্থাপিত হয় ৬২৯ সালে।

তারপর মুহাম্মাদিন কাশেম, আরব বণিকদের আগমন, আরব থেকে ছুটে আসা হাজার হাজার রিলিজিয়ন প্রিচার্স ও মধ্য এশিয়া হতে বহু গুনিজনদের আগমনের ফলে আজ সমগ্র ভারতবর্ষ প্রায় ৮০ কোটি মুসলমানের আবাসভূমি। বাংলাদেশ পাকিস্তানেই তো এককভাবে চল্লিশ কোটির কাছাকাছি। চল্লিশ কোটির মত রয়েছে খুদ ভারতে। বিশে^র সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার চেয়েও বেশী মুসলমান ভারতে বসবাস করছে। হিন্দু-মুসলিম সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে ১৯৪৭ সালে। অথচ এর পূর্বে প্রায় হাজার বছরের বেশী কাল যাবত এ ভারতের মাটিতে হিন্দু-মুসলিমের সহাবস্থান ছিলো। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯৪৭ এর পরের সময়ে হিন্দু-মুসলিম উভয়ের মাঝে কয়েকবার রায়ট কিংবা দাঙ্গা হয়েছে। তবে তার আগে তো কখনো কোন দাঙ্গা হয়নি। এর আগের ইতিহাস প্রায় হাজার বছরের এক সোনালী যুগের ইতিহাস। হিন্দু-মুসলিম উভয়ের মধ্যকার ভালোবাসা আর সহমর্মিতার ইতিহাস। এক জাতি অন্য জাতির প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কাঁেধ কাঁধ মিলিয়ে জীবন অতিবাহিত করার ইতিহাস।

ভারত উপমহাদেশের মাটিতে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে বহুবার। সুলতান, তুগলক আর মোঘলরা যুদ্ধ করেছে বারবার। তা ছিলো শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই। তাদের পক্ষে কখনো কোন প্রকার দাঙ্গা কিংবা ধর্মযুদ্ধ হয়নি। এতবড় দেশটি শাসন করেছে সংখ্যালঘু মুসলিমরা প্রায় হাজার বছর। তাদের শাসন আর নীতির উপর সম্মান দেখিয়েছে সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দু ভাইয়েরা। এমনকি হিন্দু ভাই-বোনদের মুখ থেকে উচ্চারিত হতো “দিল্লিশ্বর ইশ্বর” মানে দিল্লির যিনি ইশ্বর তথা রাজা তিনিই আমার ইশ্বর। মুসলিম শাসকগণ কখানো হিন্দু আর মুসলিমের মাঝে পার্থক্য করে এক পক্ষিয় আচরণ করেনি কোনদিন। যোগ্যতার ভিত্তিতে সেনাবাহিনী আর যোদ্ধাদের মাঝে পদ ভাগাভাগি করে দেয়া হতো। কে মুসলিম কে হিন্দু সেদিকে নজর দেননি সুলতান, মোঘল কিংবা সম্রাটগণ। যেখানে মসজিদ বানানোর প্রয়োজন সেখানে অবাধে মসজিদ তৈরী করে দিয়েছেন তারা। যেখানে মন্দিরের প্রয়োজন সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় খরচে অসংখ্য মন্দির। বলা বাহুল্য, হাজার বছরের হিন্দু-মুসলিমের সহাবস্থান সমগ্র বিশ্বের মাঝে এক অনন্য নজীর এই মহাভারত।

বিশ্বের কোথাও পাওয়া যাবে না এরকম সৌহার্দ্যের মিতালী। পরস্পর পরস্পরের মাঝে ভ্রাতৃত্বের মহান বন্ধন যেনো বিশ্বের বুকে অনন্য ও অদ্বিতীয় এক উপমা। আর সে কালের ইতিহাসের পাতাগুলি হয়ে থাকলো সোনালী যুগের মহান এক বার্তা সেজে। উপ মহাদেশের চিরায়ত শ্লোগান ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই’ সৃষ্টি করে দিলো দুনিয়ার বুকে শ্রেষ্টতম নজীর। আমি বলছিনা যে, সে ভ্রাতৃত্বের খাতিরে একজন হিন্দু কোন মুসলমানের ঘরে গিয়ে গো-মাংশ খেয়েছে। তেমনি করে কোন মুসলমান হিন্দুর ঘরে গিয়ে শুকর খেয়েছে। এ কথাও বলছিনা যে, কোন হিন্দু মসজিদে গিয়ে নামাজ আর কোন মুসলিম মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করেছে। আমি তাও বলছি না, হিন্দু মুসলমানের মাঝে স্বধর্ম ত্যাগ না করে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। তবে ধর্ম যার যার পালন করে তারা স্বদেশ ভুমিকে রক্ষার ক্ষেত্রে উভয়ে মিলে মিশে পাহাড়া দিয়েছিলো। বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার তাগিদে উভয়ে উভয়ের কাঁদে কাধ মিলিয়ে চলছিলো। নিজের দেশটিকে সোনার দেশ হিসেবে পরিচয় করাবার লক্ষ্যে বিশ্বের বুকে একত্রে কাজ করেছিলো তারা উভয়ে মিলে।

আজকের আমার লিখনির মূল উদ্দেশ্য, বর্তমান সময়ের হিন্দু-মুসলিম ভাইদের উদ্দেশ্যে একটি বার্তা পৌছানো। আমরা আজ বাস করছি বিশ্বায়নের জগতে। বিশ্ব আজ আধুনিকতার ছুঁয়ায় এগিয়ে যাচ্ছে চরমভাবে। উন্নয়নের পথ ধরে সারা বিশে^র মানুষ আজ পৌছে গেছে উন্নতির স্বর্ণ শিখড়ে। ধর্মীয় দাঙ্গা-কলহ বিশ্বের কোথাও এখন অগের মত হয় না। শুধুমাত্র বার্মা আর ভারতের বুকেই সময় সময় কিছু অঘটন ঘটে থাকে, যা বর্তমান সময়ের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। আমরা কি পারি না হিন্দু-মুসিলিম উভয়ের মাঝে তৈরী করে দিতে আত্মার মহান এক বন্ধন? পারি না কি আমরা দেশ জাতির উন্নয়নের স্বার্থে পূর্বের হাজার বছরের ন্যায় তৈরী করে দিতে মমতার বন্ধন? পূর্বের ন্যায় সোনালী শান্তিময় ইতিহাস আরেকবার রচনা করে দেখিয়ে দিতে কি পারি না আমরা ? পারি না আমরাও কি ড. আব্দুল কালামের মত কিংবা ব্যাবসায়ী আজিম প্রেমজীর মত দেশের উন্নয়নের পেছনে জীবন বিলিয়ে দিতে।

এ মহাভারতে আজ কেনো তবে হই হই কলরব ? কেনো আজ কথায় কথায় গযওয়ায়ে হিন্দ-এর ডাক-ঢোল পেটনো হচ্ছে? অন্য দিকে কিছু জাতিয়তাবাদী হিন্দু ভাইয়েরা এক বাবরি মসজিদ আর রাম মন্দির নিয়ে ব্যস্ত কেনো ? কেনো তারা ঘোষনা দিচ্ছে সকল মুসলমানদের পাঠিয়ে দিবে পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে ? কেনো উস্কানি দিয়ে গুজরাট, মুম্বাই, দিল্লি, কাশ্মির, আসাম আর কলকাতায় রায়ট ঘোষনা দিয়ে মুসলিম খেদানোর পায়তারা করা হচ্ছে? কি লাভ এসবের পেছনে। বরং এতে নিজেদের মাঝে দূরত্ব বাড়ছে দিন দিন। ক্ষতি হচ্ছে আমাদের আগত সন্তানদের দেমাগ, মন-মানসিকতা। তারা আগামী সময়কে দেখছে চরম এক অমানিষার রাত? এর ফলে তৈরী হচ্ছে উভয়ের মাঝে এক ধরণের দাঙ্গাময় মনোভাব। হিন্দু যুবকদের মাথায় ঢুকছে ‘আর এসএস’ এর মতো মুসলিম বিদ্বেষী একজাতীয়তার মনোভাব। অন্যদিকে মুসলিম যুবকদের মাথায় ঢুকছে জেহাদী এক কট্টর মনোভাব।

ভারত একটি গণতান্ত্রিক ও সেকুলার রাষ্ট্র। পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠির দেশ। আর সমগ্র বিশ্বের মাঝে এক নম্বর গনতান্ত্রিক দেশ এ ভারত। এখানে সেখানে কোথাও কোথাও দাঙ্গা হয়েছে কিংবা হচ্ছে। মূর্খতার বসবতি হয়ে অনেকই নেক্কারজনকভাবে এ সকল কাজ করে যাচ্ছে। এতে আইনের মাধ্যমে বিচারও পাচ্ছে নির্যাতিতরা। ঘটনাস্থলে অবাধে যেতে পারছে সাংবাদিক আর মানবাধিকার কর্মী। তদন্তও হচ্ছে যথাযত। কিন্তু আমাদের পার্শ্ববর্তী বৃহৎ দেশ চীন ? সেখানে উইঘুরের মুসলমানদের ভাগ্যে কি ঘটছে তা সবের কাছে অস্পষ্ট। গোটা দুনিয়ার কাছে অন্ধকার। কেউ জানতেও পারছে না তাদের ভাগ্যলিপি সম্পর্কে। মাওসেতুংএর দেশে নেই কোন আইন। নেই কোন স্পষ্ট জবাবদিহিতার ব্যাবস্থা। প্রতিবাদের ভাষাকে তারা গুলি মেরে উড়িয়ে দেয় আকাশের শুন্যতায়। সেখানে যেতে পারছে না কোন বিদেশী সাংবাদিক কিংবা মানবাধিকার কর্মী। অন্ততঃ কাশ্মির, দিল্লি, গুজরাট বা মুম্বাই এর দাঙ্গাগুলির ভিডিও চিত্র দেখতে তো পারছে দেশ বিদেশের মানুষ। দুঃখ জনক হলেও সত্য, চীনে তো তাও পারছেনা।

অতএব, আমার বিশ্বাস, এখানো ইচ্ছে করলে আমরা আমাদের মানষিকতার পরিবর্তন ঘটাতে পারি। আমরা পারবো মূর্খতা পরিহার করে ‘হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই – নিজেদের একতা চাই’ এ স্লোগানটি প্রতিষ্ঠিত করতে। আমরা ঘৃণা করি তাদের, যারা দাঙ্গার পক্ষে কিংবা ইন্ধন যুগিয়ে পরিবেশ খারাপ বানাচ্ছে। আমরা ঘৃণা করি তাদের, যারা ভারত থেকে মুসলামানদের তাড়াতে চায়। আমরা সমর্থন করি না, যারা বলে গযওয়ায়ে হিন্দ এর মাধ্যমে ভারতের সকল হিন্দুদের হত্যা করতে চায়। আমরা চাই শান্তির এক গোলাপ বাগান। আমরা চাই প্রত্যেকেই স্ব স্ব স্থানে বহাল থেকে মিলে মিশে নিজের দেশর উন্নয়ন সাধন করা। আমরা চাই বিগত হাজার বছরের মতো হিন্দু-মুসলিমের মধ্যকার শান্তির এক সহাবস্থান। আশা করি আবারো যেনো ঘটে সকলের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও মমতার মহৎ এক বন্ধন।

লেখক: এমদাদ খান
(বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ও মানবাধিকার কর্মী