হজে ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন


» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯ - ০২:০৪:১৩ অপরাহ্ন

পবিত্র কুরআনকে তিন ভাগে ভাগ করলে দেখা যায় একাংশে রয়েছে ইসলামী আইন বা বিধিবিধান। একাংশে রয়েছে মানুষের জন্য উপদেশ ও দৃষ্টান্ত। আর একাংশে রয়েছে বিগত জাতিগুলোর মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা বা ইতিহাস। পবিত্র কুরআন শরিফে বর্ণিত ইতিহাস অকাট্য ও পরিষ্কার স্পষ্ট; সেই সাথে এই ইতিহাসের রয়েছে নানাবিধ গুরুত্ব ও তাৎপর্য। পবিত্র কুরআন শরিফে বর্ণিত ইতিহাসকে স্মরণে রাখার জন্যই আল্লাহ নাজিল করেছেন হজের বিধান। হজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি সকল মানুষকে হজের জন্য আহ্বান করুন; তারা দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে ও উটে চড়ে আসবে যাতে তারা কল্যাণ দেখতে পায়, যা তাদের জন্য এখানে রাখা হয়েছে এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনে তারা ওই পশুদের উপর আল্লাহর নাম নেয়, যা তিনি তাদের দিয়েছেন। তা থেকে তারা যেন নিজেরাও খায় এবং অভাবী লোকদেরও খাওয়ায়।’ (সূরা হজ : ২৭-২৮)

হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাতের কাজগুলো মক্কাতেই সম্পন্ন করতে হয়। মক্কার ১৫-২০ কি.মি. এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের সেসব স্থান। ইসলামের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলির অধিকাংশই আবর্তিত হয়েছে মক্কা-মদিনাসহ আশপাশের স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ হজরত আদম আ: থেকে শুরু করে হজরত মুহাম্মদ সা: অবধি সব নবী-রাসূলের জীবনে সঙ্ঘটিত ঘটনাবলির চারণভূমিই ছিল আরব ভূমি। মুহাম্মদ সা:-এর জীবনে সঙ্ঘটিত যাবতীয় ঘটনার স্মৃতিও বুকে ধারণ করে রেখেছে এই আরব ভূমি। কাজেই ইসলামের ইতিহাসের আধার হিসেবে আরব ভূমির গুরুত্ব বর্ণনাতীত। সে কারণেই কুরআনের ইতিহাসসংশ্লিষ্ট স্থানগুলো সরেজমিন অবলোকন করা যায় পবিত্র হজব্রত পালনের মাধ্যমে। হজরত আদম আ:, হজরত ইসমাইল আ:, হজরত হাজেরা আ:-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো পরিদর্শন করার নির্দেশ হজের মধ্যে রয়েছে।

উম্মতে মুহাম্মদির জন্য ৬৩১ সালে নবম হিজরিতে হজের বিধান ফরজ হয়। পরের বছরে ৬৩২ সালে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সাথে করে পবিত্র হজ আদায় করেন। মুহাম্মদ সা: যেখানে, যে সময়ে, যে তারিখে, যে নিয়মে যেসব আহকাম-আরকান পালন করেছিলেন সেসব স্থানে একই নিয়মে এখনও ৮ থেকে ১৩ জিলহজ পবিত্র হজ পালিত হয়ে থাকে।

হজের জন্য নির্ধারিত অন্যতম স্থান হচ্ছে মক্কা শরিফ। এখানে বায়তুল্লাহ অবস্থিত। এটি মুসলমানদের কিবলা, যা আল্লাহ তায়ালার এক অপূর্ব সৃষ্টি। হজ ও ওমরার সময় মুসলমানগণ কাবাঘর তাওয়াফ করতে মক্কায় আগমন করেন। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে মক্কা নগরীর অবস্থান হওয়ায় আল্লাহ তায়ালা ‘বায়তুল্লাহ’ বা ‘কাবাঘর’ মক্কাতেই স্থাপন করেন।

পবিত্র এই ঘরটির সাথে হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল আ:-এর ইতিহাস জড়িত। এই ঘরটি তাওয়াফের মাধ্যমে স্মরণ করা যেতে পারে হজরত ইব্রাহিম আ: নবী হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট। স্মরণ করা যেতে পারে হজরত নূহ আ:-এর প্লাবন শেষে ইব্রাহিম আ: ও তার একমাত্র পুত্র ইসমাইল আ: মিলে কাবাঘর সংস্কার করেছিলেন সেসব কথা। এই পবিত্র ঘরটি ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিলেন দক্ষিণ আরবের বাদশা আবরাহা। তিনি হস্তিবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করলে আল্লাহ আসমান থেকে আবাবিল নামক পাখি পাঠিয়ে বাদশা আবরাহা বাহিনীকে শায়েস্তা করেছিলেন। কাবাঘর ধ্বংসের সেই ষড়যন্ত্রের কথা পবিত্র কুরআনের সূরা ফিলে বার্ণিত হয়েছে। কাবাঘরের সামনে দাঁড়ালে সেসব ইতিহাসের কথা সহসাই মনের ভেতর ভেসে উঠতে পারে।

কাবা শরিফের দক্ষিণ-পূর্বকোণে মাতাফ (তাওয়াফের জায়গা) থেকে দেড় মিটার উপরে লাগানো ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা কালো পাথর; যা প্রাগৈতিহাসিক ইসলামী নিদর্শন ও বহু মূল্যবান বরকতময় বেহেশতের উপকরণ। কাবাগৃহের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে প্রায় দেড় মিটার উঁচু দেয়ালের কিছুটা ভেতরে প্রোথিত কালো থালার মতো গোল এ পাথরের নাম হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর। এই পাথরটি বেহেশতি পাথর হিসেবেও পরিচিত। পাথরটি প্রথমে সাদা ছিল। মানুষের চুম্বন ও গোনাহ আকর্ষণ হেতু ক্রমে পাথরটি কালো হয়ে গেছে। পাথরটির চার পাশে রূপার বৃত্ত লাগানো। রূহের জগতে এই পাথরের উপরে হাত রেখে হুজুর সা:-এর রূহ মোবারককে ‘আমরা আল্লাহর বান্দা ও আল্লাহ আমাদের প্রভু’ এই প্রতিশ্রুতি পাঠ করিয়েছিলেন। হজরত আদম আ: পৃথিবীতে আসার সময় আল্লাহ পাক সেই পাথর তার সাথে দিয়ে দেন, পরে তিনি সেটা জাবালে আবু কোবাইসে রাখেন। তখনো সে পাথর বরফের মতো সাদা ও সূর্যের মতো আলোকিত ছিল। নূহ আ:-এর বন্যার সময় আল্লাহ পাক এটি পুনরায় আসমানে উঠিয়ে নেন। হজরত ইব্রাহিম আ:-এর দ্বারা কাবা ঘর তৈরির সময় আবার তা ফেরেশতার মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং ইব্রাহিম আ: সেই পাথরকে আল্লাহর ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে স্থাপন করেন। এখান থেকেই বায়তুল্লাহ তাওয়াফ শুরু করা হয়। হাদিস শরিফে আছে, হাজরে আসওয়াদ প্রথম আবু কুবাইস পাহাড়ে নাজিল হয়, সেখানে তা ৪০ বছর পর্যন্ত থাকে। তারপর তা হজরত ইব্রাহিম আ:-এর আগেই কাবার ভিত্তির ওপর লাগানো হয়। অর্থাৎ মাকামে ইব্রাহিম ও হাজরে আসওয়াদ এই পাথর দু’টিই বেহেশতের পাথর।

ইতিহাসের আরো একটি নিদর্শন মাকামে ইবরাহিম। কাবা শরিফের পাশেই আছে ক্রিস্টালের একটা বাক্স, চার দিকে লোহার বেষ্টনী। ভেতরে বর্গাকৃতির একটি পাথর। পাথরটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান, প্রায় .৫ মিটার। এ পাথরটিই মাকামে ইবরাহিম। ‘মাকাম’ শব্দের অর্থ হচ্ছেÑ দাঁড়ানোর স্থান অর্থাৎ হজরত ইবরাহিম আ:-এর দাঁড়ানোর স্থান। এ পাথরে দাঁড়িয়ে তিনি কাবা শরিফ নির্মাণ করেন। কাবা শরিফ থেকে মাকামে ইবরাহিমের দূরত্ব হচ্ছে ১৩.৫ মিটার। মাকামে ইবরাহিম অর্থাৎ আল্লাহর ঘরের দরজার সামনে হজরত আদম আ: নামাজ পড়েছেন এবং তার পাশেই হজরত জিবরাইল আ: নামাজ পড়ে নবী করিম সা:-কে নামাজের প্রথম সময় ও শেষ সময় এবং নামাজের তরিকা সম্বন্ধে ধারণা দিয়েছেন। এজন্য এই জায়গাটাকে মুসল্লায়ে আদম বা মুসল্লায়ে জিবরাইল বলা হয়। হজের মাধ্যমে হাজরে আসওয়াদের সেই ইতিহাসকেও স্মরণ করা যেতে পারে।

আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের অন্যতম ফরজ। আরাফাতে অবস্থান করাকে এমনি এমনি ফরজ করা হয়নি। এখানে যে ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে তা প্রসিদ্ধ। প্রথম মানব হজরত আদম আ: ও মাতা হজরত হাওয়া আ:-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থান হচ্ছে আরাফাতের ময়দান। এখানেই আদম আ:-এর সাথে হাওয়া আ:-এর প্রথম পরিচয় হয়েছিল। মহানবী সা: পৃথিবীর মানুষকে উদ্দেশ করে জীবনের শেষ ভাষণটি এখানেই দিয়েছিলেন। মক্কা থেকে ১৫ কিলোমিটার নিকটবর্তী সুবিশাল আরাফাতের ময়দান সেই ইতিহাসের বাস্তব সাক্ষী।

হযরত ইসমাইল আ:-কে নবী হজরত ইব্রাহিম আ: যে স্থানে কোরবানি করার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন সেই ঐতিহাসিক স্থানের নামই মিনা। আর হজরত আদম আ: ও বিবি হাওয়া আ: যে স্থানে প্রথম বাসর উদযাপন করেছিলেন সেই স্থানটিই মুজদালিফা। মক্কা থেকে আরাফাতের পথে রয়েছে ইতিহাসের অনেক চিহ্ন। এসব চিহ্ন হজ পালনকারীদের অতীতে নবী-রাসূলদের যুগে ফিরে নিয়ে যেতে পারে। কাবাগৃহের দ্বারপ্রান্তে মক্কা শরিফে অবস্থিত ‘জমজম কূপ’ আল্লাহর অসীম কুদরতের একটি অপূর্ব নিদর্শন। আরবদের কাছে জমজম শব্দের অর্থ প্রাচুর্য ও জমা হওয়া। পৃথিবীতে যত আশ্চর্যজনক সৃষ্টি রয়েছে, জমজম কূপ তার মধ্যে অন্যতম। জমজমের পানি কখনো নিঃশেষ হয় না, যা অতি পবিত্র ও উপকারী। নবজাত শিশু হজরত ইসমাইল আ:-এর পিপাসা নিবারণের জন্যই স্বর্গীয় আবে শেফা, আবে রহমত ও বরকতময় জমজম পানির উৎপত্তি হয়েছিল। রহমতে জমজম সেই ইতিহাসকেও স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।

ঐতিহাসিক মর্যাদায় সমৃদ্ধ ‘গারে হেরা’ মক্কার সবচেয়ে বড় এবং উঁচু পাহাড়। ইতিহাস বলছে এখানে নবী করিম সা: ধ্যানমগ্ন থাকতেন এবং এখানেই সর্বপ্রথম তাঁর কাছে অহি (প্রত্যাদেশ) নাজিল হয়। প্রথম কুরআন নাজিলের স্থান হিসেবে হেরাগুহার মর্যাদা অনন্য। হজের মাধ্যমে এই ইতিহাসকেও জানা যেতে পারে। মসজিদুল হারামের পশ্চিমে অবস্থিত গারে সাওর। হিজরতের সময় এই প্রকাণ্ড সুউচ্চ পাহাড়ে হজরত রাসূলুল্লাহ সা: আবু বকর রা:-কে সাথে করে শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তিন দিন অবস্থান করেছিলেন। ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে ইসলামের প্রারম্ভিক অবস্থাকে অনুমান করা সম্ভব হতে পারে। বলা বাহুল্য, মুসলমানদের জন্য পবিত্র ভূমি মক্কা-মদিনার যে স্থানে যে যে কার্যাবলি সম্পন্ন করা হয়ে থাকে সেসব নিদর্শনের প্রত্যেকটিরই একেকটি অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও ইতিহাস রয়েছে। সেই সব ইতিহাস ও ঐতিহাসিক স্থানের পরিচয়-পরিচর্যা মুসলিমদের পথ চলাকে সহজ করতে পারে।