স্ট্যাপলিং পিনের ব্যবহারে নষ্ট হচ্ছে টাকা, বাড়ছে খরচ


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ২২ মে ২০২০ - ০৫:০২:৪২ অপরাহ্ন

নোটের উপর বড় স্ট্যাপলিং পিন ব্যবহার, লেখা ও ঘষামাজাসহ নানা অসচেতনতার কারণে অল্প দিনেই নষ্ট হচ্ছে বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন টাকার নোট।

এতে সময়ের আগেই বাজার থেকে তুলে নিতে হচ্ছে এসব নোট। নতুন করে ছাপতে হচ্ছে। তাই রাষ্ট্রীয় সম্পদেরও অপচয় হচ্ছে।

এজন‌্য ব্যাংক নোটের স্থায়িত্ব বাড়াতে এবং চলমান নোটগুলো নষ্ট করার প্রবণতা রোধে কয়েকদফা প্রদক্ষেপ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু বিভিন্ন মহলের অসচেতনতায় এখনো দেশের অসংখ্য ব্যাংক নোট নষ্ট হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টাকা ব্যবহারে অসচেতনতার কারণেই বাংলাদেশের টাকার নাজেহাল অবস্থা। নোট নষ্ট হওয়ার কারণে সময়ের আগেই বাজার থেকে তুলে নিয়ে নতুন নোট ছাপতে হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে।

আবার অন্যদিকে মানুষের ভোগান্তিও বাড়ছে। ছেঁড়া, পোড়া, লেখাযুক্ত, পিনযুক্ত এবং ময়লাযুক্ত টাকায় ভরে গেছে পুরো দেশ। এসব টাকা দিয়ে লেনদেন করতে প্রায়ই অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে। এছাড়া বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে এসব সমস্যাযুক্ত নোট যেন একটি আতঙ্কের নাম হয়েও দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘টাকা ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। কাগজের টাকা ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতনতামূলক কোনো প্রচারণা আমরা কখনোই লক্ষ্য করিনি। বাংলাদেশ বাংকের উদ্যোগের কথা শুনেছিলাম, কিন্তু কিছু কার্যক্রম রয়েছে এগুলো যথেষ্ঠ নয়। সরকারি কিংবা বেসরকারি মাধ্যমেও জাতীয় এই সম্পদ রক্ষার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ সঠিক নজরদারির অভাবে প্রতিবছর সরকারকে নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ গচ্চা দিতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে টাকার ব্যবহারের ব্যাপারে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা থাকায় টাকা অনেক ভালো এবং সুন্দর থাকে। গণমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।’

টাকা অর্থনীতির সবচেয়ে সচল জিনিস। ব্যবহারের সময় টাকা ছেড়ে, পোড়ে কিংবা রং পরিবর্তিত হয়। ধীরে ধীরে তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই সব টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে জমা নিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। চাহিদা পূরণে ওই পরিমাণ টাকা ছাপাতে খরচ করতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রিন্টিং ও মিন্টিং খরচ প্রকাশ করা হয়। তবে প্রতিটি নোটের উৎপাদন খরচ আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয় না।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, প্রতি বছর চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত টাকার মুদ্রাগুলো উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ উৎপাদন প্রক্রিয়া তদারকি করে। আর টাকার নোট ছাপানো হয় গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশের টাকশাল (দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ লিমিটেড) থেকে। ছাপার কাগজ, কালি, রং, নিরাপত্তা সুতা ও অন্যন্য উপকরণ আমদানি করা হয় বিদেশ থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণত নিরাপত্তার স্বার্থে দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড থেকে শুধুমাত্র এক হাজার টাকার নোটে পিন লাগানো হয়। বাকি সব টাকার নোট বাঁধা অবস্থায় সরবরাহ করা হয়। তফশিলী ব্যাংকগুলো আগে অন্যান্য নোটের উপর পিন লাগাতো। এ বিষয়ে নির্দেশনা জারির পর এটি বন্ধ হয়েছে। তবে ভোক্তা পর্যায়ে এখনও অসচেতনতা রয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘‘বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের নোটের সুরক্ষায় বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নোটের স্থায়িত্ব বাড়াতে, চকচকে ভাব ধরে রাখতে, নোটকে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার উপযোগী রাখতে, নোটের ওপর ময়লা-আবর্জনা যাতে জমতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘ফলে নোট ছাপানো ও সরবরাহ বাবদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খরচ কমবে। একই সঙ্গে খরচ কমবে ব্যাংক নোটের ব্যবস্থাপনায়। এসব বিষয়ে ব্যাংকার ও জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নানামুখী প্রচার বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।”

সিরাজুল ইসলাম জানান, নোট ভাঁজ করার কারণেও টাকা নষ্ট হয়। নোট ভাঁজ না করার ব‌্যাপারে গ্রাহকদের সচেতন করতে গণমাধ্যমে প্রচার চালানোরও উদ্যোগ নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংক সূত্র আরো জানায়, নোটের ওপর ব্যাংক বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের নাম বা সাংকেতিক চিহ্ন লিখে বা সিল দিয়ে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, নোটের ওপর ব্যাংক বা কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো কিছু লিখতে পারবে না। এমনকি ব্যক্তিগত কোনো কিছুও লেখা যাবে না। সিল দেওয়া যাবে না।

নোটের বান্ডিল তৈরির সময় অনেক প্রতিষ্ঠান মোটা পিন ব্যবহার বা স্ট্যাপলিং করে। এগুলোও করা যাবে না। অনেক সময় সুঁই দিয়ে নোটের বান্ডিলের এপাশ-ওপাশ সুতা দিয়ে বাঁধা হয়। এগুলোও করা যাবে না। নোটের মধ্যে কোনো রকম ছিদ্র করা যাবে না।

পলিমারযুক্ত পুরু কাগজ দিয়ে নোট বান্ডিল করতে হবে। এছাড়া বান্ডিল করার সময় রাবার ব্যবহার করা যাবে। কোনোভাবেই নোট ভাঁজ করে বান্ডিল তৈরি করা যাবে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের এ নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হলেও সেটি যথাযথভাবে পরিপালন করা হচ্ছে না।

এটি যথাযথভাবে পরিপালন করার জন্য ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোকে আবারও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নোট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

সূত্র: রাইজিংবিডি