সিয়াম সাধনায় আমাদের করণীয়


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২০ - ১১:৩২:৪৭ পূর্বাহ্ন

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ। রোজা বা সিয়াম সাধনা তার অন্যতম একটি। আল্লাহতায়ালা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলেছেন ‘হে মুমিনগণ তোমাদের জন্য সিয়াম ফরজ করা হলো যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য তা ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)

বিশ্বব্যাপী এবারের রোজা বা সিয়াম সাধনার প্রেক্ষাপট একটু ভিন্নতর। আমরা সবাই জানি, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বের সব প্রান্তেই ঈমানদার মুসলিমরা এবারের রোজাকে ভিন্নভাবে পেয়েছে। আমাদের রয়েছে বরকতময় পবিত্র মাহে রমজান আবার পাশাপাশি অতিবাহিত করছি এমন একটি সময় যখন আমাদের চারপাশে রয়েছে করোনা আতঙ্ক। এ ক্ষেত্রে ঈমানদার মুসলিম হিসেবে আমাদেরকে একটি কথা স্মরণ রাখতেই হবে। তা হলো, যেকোনো রোগ আল্লাহতাআলা দিয়ে থাকেন আবার তার প্রতিষেধকের ব্যবস্থাও তিনি করে দেন। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই প্রতিষেধক বের করে নেওয়া।

যেকোনো মহামারি অথবা রোগব্যাধি, বিপদ-আপদ আল্লাহতায়ালা মানুষকে পরীক্ষা করার জন্যই দিয়ে থাকেন আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধনসম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৫)। আবার অন্যত্র আল্লাহতায়ালা বলেছেন ‘মানুষের কৃতকর্মের ফলে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা রূম, আয়াত-৪১)

আল্লাহর এসব কথা থেকে স্পষ্টভাবেই আমরা বুঝতে পারি, বর্তমানের করোনা মহামারি মানবজাতির কৃতকর্মের শাস্তিস্বরূপ, মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহতাআলা দিয়েছেন। এটি একটি মহামারি বা দুরারোগ্য রোগব্যাধিএটি নিয়ে আতঙ্কিত বা শঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। আল্লাহর দেওয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য আমাদের তাঁর প্রতি ফিরে যাওয়া উচিত। পবিত্র রমজানে রোজা বা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমরা আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ করে থাকি। এই সিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে এই মহামারি থেকে মুক্তি পেতে পারি। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে বসে না থেকে তারই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পথে আমাদের চলা উচিত। তাহলেই এই মহামারি থেকে নিজেদেরকে বাঁচানোর পথ খুঁজে পেতে পারি।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যদি তোমরা শুনতে পাও যে, কোনো জনপদে প্লেগ বা মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তবে তোমরা সেথায় যাবে না। আর যদি তোমরা যে জনপদে অবস্থান করছো সেখানেই তার প্রাদুর্ভাব ঘটে তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না। (আল বুখারী, হাদিস নম্বর ২১৬৩)

বর্তমানের করোনার কারণে লকডাউনের মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে কাজটি করা হচ্ছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে কাজটির ইঙ্গিতই হাদিসে দিয়েছেন। পবিত্র মাহে রমজানে আমাদেরকে খাবার-দাবার, ইফতার-সাহরি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে হবে। আমরা এই রোজার মাসে কৃচ্ছতা অবলম্বন করতে পারি। রোজার মাসকে ইবাদতের মৌসুম হিসেবে যেমন আমরা গ্রহণ করতে পারি, তেমনি করোনার ভয়াল থাবা থেকে আমাদের নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারি। মহানবীর হাদিসটি বিশ্লেষণ করলে একটি কথা বোঝা যায় যে, করোনা সরাসরি ছোঁয়াচে না হলেও এর ভাইরাস বহনকারী কফ, থুথু, লালা, হাঁচি-কাশি ইত্যাদির সংস্পর্শে গেলে, যে কারোরই এই রোগ হতে পারে।

এজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই করোনা থেকে দূরে থাকার জন্য নিজেকে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সতর্কতামূলক বেশকিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছে। এই দিক নির্দেশনা মেনে রোজা বা সিয়াম পালন করতে কোনো অসুবিধা নেই। বরং পবিত্র মাহে রমজানে আমরা সার্বিক সতর্কতার মধ্যে থেকে এই সিয়াম পালন করতে পারি। সেই ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে সুস্থদের রোজা রাখতে দেওয়া, তাদের জন্য খাবার-দাবারের ব্যাবস্থা করা, অনাড়ম্বরভাবে ইফতার-সাহরি ইত্যাদির ব্যবস্থা করা উচিত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কখনোই আত্মহননকে বৈধতা দেননি। নিজের স্বাস্থ্য, শরীর, মন এবং আত্মাকে সংকটে ফেলার জন্য বলেননি। তাই স্বাস্থ্য নিয়ে সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, এমন যেকোনো কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।

আমরা ইফতারিতে পরিমিতভাবে শাক-সবজি, সাধ্যানুযায়ী ফলমূল এবং পানীয় দিয়ে ইফতার করতে পারি। যেসব খাবারে ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-সি বেশি পরিমাণে  রয়েছে সেসব খাবার বেশি খেতে পারি। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মতে যাদের এই জাতীয় ভিটামিন বেশি রয়েছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে সাহরিতে পরিমিতভাবে খাবারের আয়োজন করা যায়। সেখানেও বাড়াবাড়ি না করে যারা সামর্থ্যবান তারা খুব বেশি খাবেন, আর যারা দরিদ্র বা দুস্থ তারা না খেয়ে থাকবেন এমন না করে মাঝামাঝি ধরনের খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলে খাদ্য বণ্টনে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারি।

আমরা বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করতে পারি, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে রমজানের সিয়াম সাধনার সকল কাজ করতে পারি, সালাত আদায় করতে পারি, আমাদের আশেপাশে থাকা গরিব-দুঃখী, দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারি, আমাদের কৃতকর্মের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে তাওবা করতে পারি। আল্লাহ আমাদের সব ভালো কাজ করা, করোনাকে ভয় না পেয়ে সর্তকতা অবলম্বন করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার সাহায্যে এগিয়ে আসার কাজগুলো বেশি বেশি করার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক: সম্পাদক, মাসিক সংস্কার