উত্তরা নিউজ উত্তরা নিউজ
অনলাইন রিপোর্ট


সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নামে নতুন আমদানীকৃত অপসংস্কৃতির সয়লাব






মুহাম্মদ ইয়াকুব

সংস্কৃতি বা কৃষ্টি ইংরেজি Culture শব্দের সমার্থক হিসেবে বাংলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ইংরেজি Culture-এর প্রতিশব্দ হিসেবে সংস্কৃতি শব্দটি ১৯২২ সালে বাংলায় প্রথম ব্যবহার করা শুরু হয়। শব্দটির আভিধানিক অর্থ চিৎপ্রকর্ষ বা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের উৎকর্ষ সাধন।
পরিভাষায় – কোন স্থানের মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য , নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয় তাই সংস্কৃতি।
খাদ্যাভ্যাস, জীবন যাপন, পারিবারিক জীবন, খেলাধুলা, জীবিকা, আচার-ব্যবহার ইত্যাদি সাংস্কৃতিক মানসিকতায় বাঙালি একই সংস্কৃতির। অন্যদিকে ধর্মীয় রীতি-নীতি ও বিশ্বাসের দিক হতে বাঙালি মিশ্র সংস্কৃতির। পাঠকগণকে এই পয়েন্টটি মনে রাখার জন্য অনুরোধ করছি।

পৃথিবীর বুকে সমৃদ্ধ ক্যালেন্ডার হিসেবে ইংরেজি খ্রিস্টাব্দ, আরবি হিজরি এবং ফার্সি নওরোজের পরপরই বাংলা ক্যালেন্ডার বঙ্গাব্দের অবস্থান। বাংলা সনের প্রবর্তন কখন কার দ্বারা হয়েছিলো সে সম্পর্কে
দুই-তিনটি মতামত পাওয়া যায়। সার্বিক বিবেচনায় বিশেষজ্ঞগণ মোগল সম্রাট আকবরকে বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে যুক্তিপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। প্রাচীন বাংলার জীবিকার প্রধান মাধ্যম কৃষিকাজের সুবিধার্থে মোঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তাঁর সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চন্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।
বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে ০১ বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানে ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা পঞ্জিকা সংশোধনের জন্য অনুরূপ একটি কমিটি গঠন করা হয়। ডঃ শহীদুল্লাহ কমিটির সুপারিশ ছিলো নিম্নরূপঃ
১. মোগলদের সময় থেকে চালু বাংলা পঞ্জিকাকে জাতীয় পঞ্জিকা করা।
২. বছরের হিসাব হিজরি বছরের গণনা হিসাবে গ্রহণ করা।
৩. বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিনের এবং অন্যান্য ৩০ দিনের করা।
৪. অধিবর্ষের জন্য চৈত্র মাসে একটি অতিরিক্ত দিন হিসাব করা।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে বাংলা পঞ্জিকার ক্ষেত্রে ড. শহীদুল্লাহ কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে, তবে ১৪ এপ্রিল বছর শুরুর দিন ধার্য করা হয় এবং খ্রিস্টীয় পঞ্জিকায় অধিবর্ষের বছরে চৈত্র মাসে একদিন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বাংলা বর্ষপঞ্জিকা যেই আবিষ্কার করুক না কেন, এটি বাঙালির হৃদয় দখল করেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রাচীন জমিদারী প্রথার সুবিধার্থে বাংলা সন চালু হলেও ক্যালেন্ডারটির নাম বঙ্গাব্দ! একটি সমৃদ্ধ ক্যালেন্ডারের মালিক হিসেবে প্রতিটি বাঙালিই গর্বিত। সুতরাং ১০০% বাঙালি বাংলা সন ও তারিখ সম্পর্কে জানুক বা না জানুক বাংলা নববর্ষ কবে শুরু হবে সে সম্পর্কে জ্ঞান রাখে।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে, নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে (০১ বৈশাখ) তাদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তারা নতুন- পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে।

বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষে ইদানিং যোগ হচ্ছে অদ্ভুত ভূতুড়ে উপাদান। জাতির সংস্কৃতিতে নতুন উপাদান যোগ হওয়া দোষের কিছু নয়। কিন্তু তাকে ঐতিহ্য বিবেচনা করে সকল বাঙালির সংস্কৃতি হিসেবে উপস্থাপন করা নিঃসন্দেহে দোষের।

ইতিহাস কী? ঐতিহ্য কী? অতীত মানেই ইতিহাস সেটি আমরা কম-বেশি সবাই জানি। কিন্তু ঐতিহ্য সম্পর্কে সবার পরিচ্ছন্ন ধারণা নেই।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, কোন জাতির ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়কে ঐতিহ্য বলা হয়।
বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা নাকি হাজার বছরের ঐতিহ্য! এবার আসি সেই প্রসঙ্গে। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর সর্বপ্রথম পাওয়া যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর ইংরেজ দখলদারদের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে ০১ বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।
অর্থাৎ ইংরেজ প্রভুদের মনোরঞ্জনে আয়োজিত পূজাকেই আজ বিবর্তিত রূপ মঙ্গল শোভাযাত্রাতে পরিণত করা হয়েছে। বর্তমানের মঙ্গল শোভাযাত্রা তো আরও অনেক পরে শুরু হয়েছে। ১৪২৫তম বর্ষে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলা সন। মঙ্গল শোভাযাত্রা সর্বপ্রথম শুরু হয়েছে ১৯৮৬ সালে যশোরে। পরে ১৯৮৯ সাল হতে ঢাবি’র চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর এটি পালন করে আসছে। এখন সকল জেলা ও প্রায় উপজেলায় এটি পালন করা হচ্ছে।

আরেকটা ব্যাপার যেটা না করলে ইদানিং অনেকে বাঙালি পরিচয় দিতেই লজ্জা পায় তা হল পান্তা ইলিশ।
পান্তা-ইলিশের ইতিহাস নিয়ে মতভেদ আছে। কথিত আছে, পান্তা-ইলিশের সূচনা হয় ১৯৮৩ সালে রমনার বটমূলে। দৈনিক জনকন্ঠের সাংবাদিক বোরহান আহমেদ ছিলেন এর উদ্যোক্তা। অন্যদিকে সাংবাদিক শহিদুল হক খান নিজেকেই এর উদ্যোক্তা বলে দাবী করেন। তবে বলা হয়ে থাকে, শহিদুল হক সাংবাদিক বোরহানের দুই বছর পর থেকে নিয়মিত নববর্ষে পান্তা ইলিশের আয়োজন করে থাকেন। সেই হিসেবে পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার এই রীতির প্রবর্তক বলা যায় সাংবাদিক বোরহান আহমেদকে।বাংলার ৯০% জনগণ যে মাছ খাওয়ার সক্ষমতা রাখে না সেটিও নাকি বাঙালির ঐতিহ্য! হায়রে বাঙালি!

বাঙালি হিসেবে একজন বাঙালির প্রথম সাংস্কৃতিক পাঠ হলো-বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে জানা এবং বাংলা তারিখ, মাস ও সন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন। সেটি না করে ইলিশের মতো হাজার টাকা কেজির দামি মাছের স্বাদ নেওয়া কোন সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। অথচ যারা একদিনের জন্য পান্তার সাথে ইলিশ খায় আর ১৯৮৯ সাল হতে প্রবর্তিত মঙ্গল শোভাযাত্রা করে তারা বাংলা তারিখ ও সন জানে না! পক্ষান্তরে যারা মাসে একদিন বা দুই দিন তেলাপিয়া আর পাঙ্গাস খায়, নিয়মিত পান্তার সাথে কাঁচা মরিচ খায় আর মঙ্গল শোভাযাত্রা নামক আজব মিছিলের নামও জানে না, গ্রামের সে সকল খেটে খাওয়া মানুষই বাংলা তারিখ ও সাল সম্পর্কে জ্ঞান রাখে।
তাইলে কারা ধারণ করে বাঙালি সংস্কৃতি? গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ? নাকি শহুরে আজব মানুষ?

মঙ্গল শোভাযাত্রায় বাঙালির কোন ঐতিহ্য প্রদর্শিত হয় না। যে শোভাযাত্রার প্রচলনই শুরু হয়েছে আশির দশকে সেটি কিভাবে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে? ১৯৭১ সালে বাঙ্গালীত্বের সতীত্ব রক্ষার সংগ্রামে যে ত্রিশ লক্ষ তাঁজা প্রাণ শহিদ হয়েছেন তারা কী বাঙালি চেতনার লালন করতেন না? তাইলে কেন তারা মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে শোভাযাত্রা করেননি? আরেকটু অতীতে গেলে ১৯৫২। ভাষাশহিদ বা সৈনিকগণ কেন মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেননি? তাঁরা কি বাঙালি ছিলেন না? নাকি তাদের চেয়ে উদ্ভট শোভাযাত্রাকারীরা বড় মাপের বাঙালি? মঙ্গল শোভাযাত্রাকে অনেকে সার্বজনীন আখ্যায়িত করার প্রয়াস চালান। সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী একটি শোভাযাত্রা কিভাবে সার্বজনীন হয় তা আমার ছোট মাথা ধারণ করতে পারে না! শোভাযাত্রায় যে সকল মুখোশ ব্যবহার করা হয় তা শিশুদের জন্যও ভীতিকর। বাংলা তারিখ প্রচলনের ইতিহাস, সর্বপ্রথম স্বাধীন বংলার ইতিহাস, বাংলা বর্ণমালার ইতিহাস বা সাহিত্যের ইতিহাস কোনটির সাথেই এই শোভাযাত্রার সামঞ্জস্য নেই।

১৩৫০-এর দশকে গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁ জয় করে ‘শাহ-ই বাঙালিয়ান’ অর্থাৎ বাঙালিদের শাহ উপাধি গ্রহণ করেন। বৃহত্তর ‘বাঙ্গালা’র জন্ম তার আগে হয়নি। অন্য দিকে, বাংলা ভাষাও আবার মোটামুটি ওই সময়েই নিজের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে স্বতন্ত্র ভাষার রূপ লাভ করে। কিন্তু এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল এই অঞ্চলের হাজার হাজার বছরের পুরানো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে। একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায় যে, খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাঙালিদের নাম ‘ভেতো’ বাঙালি। আর্য অথবা মুসলমানরা এ দেশে ধান আনেননি, ধানের চাষ এ অঞ্চলে আরম্ভ হয়েছিল অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে। পরে কখনো আর্য, কখনো সেন, কখনো তুর্কি, কখনো আফগান, কখনো মোগল এবং সবশেষে ইংরেজরা বঙ্গভূমি দখল করেছেন। তবু বাঙালিদের ভাত খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন হয়নি। ভাত বাঙালির একটি সাংস্কৃতিক ভিত্তি। বর্ণমালার ভিত্তিতে বাংলার প্রাচীন যে নিদর্শন পাওয়া যায় তা হলো চর্যাপদ। চর্যাপদ বৌদ্ধ ধর্মের প্রার্থনা শ্লোক। বৌদ্ধ ধর্ম প্রাচীনকাল হতে (বাংলা ভাষার জন্মের সূচনালগ্ন হতে) বাংলার সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে। উদাহরণ সরূপ বলা যায়, কক্সবাজারের রামুর রামকুট বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮সনে।
বাংলা তারিখ প্রবর্তনের ইতিহাস, বাংলা রাষ্ট্র প্রবর্তনের ইতিহাস, বাংলা বর্ণ-ভাষা-সাহিত্য প্রবর্তনের ইতিহাস যে শোভাযাত্রায় উপেক্ষিত সেটি বাঙালির কোন ঐতিহ্য ধারণ করে? আলোচনার শুরুর দিকে মিশ্র সংস্কৃতির কথা বলেছিলাম। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক হতে মিশ্র সংস্কৃতির সম্প্রদায় বাঙালির সার্বজনীন উৎসবে ধর্মের পোষাক পরিধান করালে সকল ধর্মের পোষাক পরাতে হবে। নয়তো ধর্মীয় আবরণ বাদ দিতে হবে।
অনেকে হয়তো আমাকে ভুল বুঝেছেন। আচ্ছা আমি যদি মুসলমানদের ঈদুল আজহায় সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উৎসব করতে বলি সেটি কি যৌক্তিক হবে? হবে না। কারণ হিন্দু ধর্মের আদর্শের সাথে গরু জবাই করা সাংঘর্ষিক। তাইলে মুসলিম ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক কোন কিছু কি জোর পূর্বক ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি বলে চাপিয়ে দিতে পারেন?

তবে হ্যাঁ। বৈশাখী মেলা(প্রচলিত জুয়া ও যাত্রা সর্বস্ব মেলা নয়), হিসাবের হালখাতা বন্ধ ও খোলা, নতুন ফসলের উৎসব, মিষ্টিমুখ এগুলো ০১ বৈশাখের বাঙালি ঐতিহ্য। এগুলো পালনে আমার কোন আপত্তি নেই। এর বাইরে নতুন নতুন মাল পুরানো বোতলে ঢুকিয়ে পুরানো বলে প্রচার চালালে সেটি অন্তত আমি গ্রহণ করবো না।