সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন ও দিল্লি সহিংসতা

মোঃ হাসান তারেক

» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১২ মার্চ ২০২০ - ০১:৪৪:১০ অপরাহ্ন

বৈচিত্র্যপূর্ণ ধর্ম-বিশ্বাস সংস্কৃতির মানুষের একত্রে বসবাসের গর্বিত ইতিহাস বয়ে চলা ভারতে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন নেমে এসেছে। এই নিপীড়নের প্রধানত শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। তবে, পাশাপাশি খোদ সনাতন ধর্মের নিম্নবর্ণের দলিতরাও শিকার হয়ে চলেছে গণপিটুনির নামে সাম্প্রদায়িক হত্যাকান্ডের।

গত কয়েক দিন ধরে ভারতের দিল্লিতে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে রক্তক্ষয়ী সহিংসতার ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৪২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ। তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতারা। তাদের এই ক্ষোভ প্রকাশের পরের দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী বার্ণি স্যান্ডাসও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

দিল্লি সহিংসতায় কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগানও। এই নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টালমাটাল অবস্থা দাঁড়িয়েছে। রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদল গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে স্মারক লিপি প্রদান করেছেন।

এই দাঙ্গা ছড়িয়েছে উত্তর-পূর্ব দিল্লির জাফরাবাদ, সিলামপুর, মৌজপুর, ভজনপুর, গোকুলপুরীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায়। অথচ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাক আর দিল্লী পুলিশ নীরব দর্শক। অনেক বিশ্লেষক এই দাঙ্গার ব্যাপ্তি বেড়ে যাওয়ার জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করছেন। হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি চাইছে, প্রথমে সংখ্যালঘুদের বৈষম্যের শিকার করতে। তারপর তারা প্রতিবাদে নামলে সেটিকে যথাসম্ভব উসকে দিয়ে একটি অজুহাত দাঁড় করাতে। এরপর ক্ষমতাসীনরা সংখ্যালঘুদের উপর চড়াও হবে।

ভারতে বর্তমান থেকে অতীতে যে সকল দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে সেগুলোর চিত্র বিশ্লেষণ করলে একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শুরু বহু বছর আগে এবং চলছে আজও। হিন্দু-মুসলমান, হিন্দু-শিখ, শিয়া-সুন্নি, মুসলমান-বৌদ্ধ, হিন্দু-বৌদ্ধ-জৌন-খ্রীস্টান প্রমুখ ধর্মের নামে দাঙ্গা ছাড়াও সমাজের অগ্রসর-অনগ্রসর আদিবাসীর দাঙ্গা ও ভাষার নামেও যেমন-মারাটী-গুজরাটী-কন্নড়, অসমীয়-বাংলা, ওড়িয়া, হিন্দু-উর্দু নিয়ে দাঙ্গা সংঘটিত হয়ে চলে ভারতে। তবে, এবারের দিল্লি সহিংসতার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু। কেননা, দিল্লি সহিংসতায় নরেন্দ্র মোদী ও তার সমর্থিত দল বিজেপির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ রয়েছে।

এই সহিংসতার সূত্রপাত ঘটেছে, এনআরসি, সি.এ.এ কে কেন্দ্র করে। যা ধীরে ধীরে সকল ভারতীয় জনগণ ও রাজনৈতিক দলের বিবেচ্য বিষয় হিসাবে অবর্তীণ হয়। মমতার তৃণমূল কংগ্রেস, সোনিয়ার কংগ্রেসসহ সকল বিরোধী দল নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের এই ধর্ম নিরপেক্ষ ভারত বিরোধী এই সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সর্বদা মুখর ছিল। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদী ও তার দল বিজেপি এন.আর.সি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। যার ফলশ্রুতিতে, হিংসা ছড়িয়েছে সারা ভারত জুড়ে। সর্বশেষ, হিংসা ছড়িয়ে পড়লো দিল্লিতে। দিল্লির এই হিংসা, দাঙ্গা ভারতে অতীতে ঘটে যাওয়া দাঙ্গাগুলোর কথা বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে।

অতীতে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশরা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধিয়ে তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করেছে। যার নিমর্ম বলি হতো সাধারণ ভারতীয় জনগণ। দেশভাগ ইস্যুকে কেন্দ্র করে কলকাতায় যে দাঙ্গা হয়েছিল ১৯৪৬ সালে, যাকে বলা হয় “দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস” তা বাংলা তথা গোটা উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সর্ম্পকের ধারণায় একটা বড় পরিবর্তন এনেছিল। সে বছর ১৬ই আগস্ট কলকাতায় হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে হিংসার বিস্ফোরণে যত মানুষ খুন হল, যত সম্পত্তি ধ্বংস হল, অতীতে তার নজির মেলেনি।

এই দাঙ্গার কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, দাঙ্গা ঘটেছিল রাজনৈতিক উসকানিতে এবং হিন্দু-মুসলিমদের পরস্পরের প্রতি ঘৃণার কারণে। এই দাঙ্গার ফলশ্রুতিতে, পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গের নোয়াখালীতে অনুরূপ দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটেছিল। নোয়াখালী দাঙ্গার কারণ ছিল মুখ্যত ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস, নোয়াখালী দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে বিহারে ১৯৪৬ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ১১ই নভেম্বর পর্যন্ত দাঙ্গা হয়েছিল। বিহার দাঙ্গায় ৫০০০ এর উর্ধ্বে মানুষ মারা গিয়েছিল।

১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকে কেন্দ্র করে ৩১ই অক্টোবর ১৯৮৩ সালে পাঞ্জাব, দিল্লিতে যে শিখ বিরোধী যে দাঙ্গা হয়েছিল তা পূর্ববতী দাঙ্গাগুলোকে নিহতের সংখ্যার দিক দিয়ে পিছনে ফেলেছিল। প্রায় ৮০০০-১৭০০০ জন নিহত হয়েছিল এই দাঙ্গায়। দিল্লিতে বর্তমানে চলমান এই দাঙ্গায় রাষ্ট্র যন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরোধী ও সমর্থকদের সংঘর্ষে গত ২৩ই ফেব্রুয়ারী থেকে ২৬ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষে কেপেঁ উঠেছে দিল্লি। পুলিশ প্রশাসন এই ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় এই অভিযোগ খোদ দিল্লিবাসীর।

ইতিমধ্যেই, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটেছে মেঘালয়েও। তার জেরে মেঘালয়ের ছয়টি জেলায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়েছে। কারফিউ জারি করা হয়েছে শিলংসহ একাধিক জায়গায়। এভাবে দাঙ্গা যদি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুধু ভারতে পড়বে তা নয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে দক্ষিণ এশিয়া সহ সারা বিশ্বে। এরকম ধমের্র ভিত্তিতে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন করে মোদী তার ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইলেও সাধারণ জনগণ তার মত বিরোধী।

সাধারণ জনগণ ভারতীয় সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ধর্ম নিরপেক্ষ ভারত দেখতে চায়। কিন্তু, মোদী বা তার দল হিন্দুত্ববাদের ধোঁয়া তুলে ব্রিটিশদের ন্যায় ক্ষমতাকে আঁকড়ে থাকতে চায়। বাস্তবে মনে হচ্ছে, এই বিজেপি সরকারের দাঙ্গা-দাঙ্গা খেলা ভারতে শুধু অশান্তি ও বিভাজনের সুরের সূত্রপাত ঘটাবে। অতীতে দাঙ্গা সুখবর যেমন দেয়নি বর্তমানেও কিছু দিবে না। এই দাঙ্গা শুধু হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ সৃষ্টি করবে মাত্র।

এই দাঙ্গা বা হিংসার অন্তরালের রাজনীতি যত দ্রুত ভারতীয় জনগণ বুঝবে তত দ্রুতই সমাধান ঘটবে এই হিংসার। যুদ্ধ নয়, দাঙ্গা নয়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ভারতকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। যে ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে বলেছেন ”ধর্মমোহ”। যে ধর্ম বৃহত্তর মিলনের ভিতর দিয়ে মুক্তির পথে নিয়ে যায় সেই ধর্মই শ্রদ্ধেয়। অতএব, সারা ভারতে দাঙ্গা ও হিংসা বদ্ধ করে শান্তি, সম্প্রীতির জয়গান গাইতে হবে।