শুদ্ধাচার বিকাশে অনুকরণীয় হতে পারে সততা স্টোর


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৯ - ১০:৫১:৩৩ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে জনগণ। তাদের মানসিকতা, মননশীলতা ও নৈতিকতার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের সার্বিক চিত্র। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের মানুষের সততা ও নৈতিক মূল্যবোধের অতীত ঐতিহ্য গর্ব করার মতোই ছিল। তবে দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে এদেশ থেকে যেমন সম্পদ শোষণ করা হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরে কৌশলে অনৈতিকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তি তথা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের কারণেও সমাজ ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে।

ঘুষ-দুর্নীতিসহ সকল প্রকার পঙ্কিলতা থেকে মুক্তির জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বহুমাত্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এদেশে ঘুষ-দুর্নীতি প্রতিরোধের আইনি দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের। কমিশনও বসে নেই, দুর্নীতি প্রতিরোধ, দমন ও নিয়ন্ত্রণে বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুর্নীতি দমনে কমিশন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণমূলক/প্রতিকারমূলক বিভিন্ন ব্যবস্থা যেমন- মামলা দায়ের, গ্রেফতার, আদালতে মামলা পরিচালনা করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা ইত্যাদি কাজ করে যাচ্ছে।

শুধু শাস্তি নয়, অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ আইনি প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের অনুকূলে আনার কাজও করছে কমিশন। মামলা মোকাদ্দমার মতো আইনি প্রক্রিয়া দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা যা টেকসই করতে হলে সমাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থাপনায় অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনেও প্রতিরোধের ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর মুখবন্ধে বলা হয়েছে, “দেশে দুর্নীতি এবং দুর্নীতিমূলক কার্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি এবং অন্যান্য সুনির্দিষ্ট অপরাধের অনুসন্ধান এবং তদন্ত পরিচালনার জন্য একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধানকল্পে প্রণীত আইন”। অর্থাৎ দুদক আইনের মুখবন্ধে প্রতিরোধ শব্দটিকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া কমিশনের কার্যাবলীতেও দুর্নীতি প্রতিরোধে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে সমাজে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টি করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তোলার দায়িত্বও দুদকের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। কমিশন নিজস্ব কর্মকৌশলের আলোকে কার্যকর এনফোর্সমেন্ট এর পাশাপাশি নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কার্যকর অনুসন্ধান, তদন্ত ও প্রসিকিউশন, কার্যকর দুর্নীতি প্রতিরোধ কৌশল, শিক্ষা কৌশল, প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো জোরদারকরণ, তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, গোয়েন্দা কার্যক্রম বৃদ্ধি ইত্যাদি দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কমিশন দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি সমাজে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দেশব্যাপী নগর/মহানগর ও জেলা/উপজেলা পর্যায়ে সমাজের সৎ ও আলোকিত মানুষদের নিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা, তরুণ প্রজন্মের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে সততা সংঘ গঠন করে বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। এছাড়া কমিশনের সৃজনশীল কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও গণসচেতনতা সৃষ্টিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।

সৃজনশীল এবং অভিনব কর্মসূচির অংশ হিসেবে কমিশন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গঠন করছে “সততা স্টোর”, অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। সততার আবার দোকান হয়! সততা ও নৈতিকতা হচ্ছে মানুষের নিজস্ব আত্মিক অনুভূতির বিষয়, যা অন্যের কাছে প্রতিভাত হয়। বাস্তবতা হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সততা ও নৈতিকতা চর্চার বিকাশে দুর্নীতি দমন কমিশন ব্যবহারিকভাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সততা স্টোর স্থাপন করছে। প্রকৃতপক্ষে সততা ও নৈতিকতা প্রাত্যহিক জীবনে নিবিড় চর্চার বিষয়। দুদক এই উদ্দেশ্যেই তরুণ প্রজন্মের মাঝে সততা ও নৈতিকতাকে শাণিত করার জন্য বহুমাত্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কমিশনের এই কার্যক্রমের নবতর সংযোজন হচ্ছে সততা স্টোর। ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিনব এই স্টোর বা দোকান স্থাপন করা হচ্ছে । এসব দোকানে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ, চিপস, চকলেটসহ বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী রয়েছে। আবার প্রতিটি পণ্যের মূল্য তালিকা, পণ্যমূল্য পরিশোধের জন্য ক্যাশবাক্স ইত্যাদি সবই রয়েছে, নেই শুধু বিক্রেতা।
শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ক্যাশবাক্সে পণ্য মূল্য পরিশোধ করছে। কমিশন এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সততা স্টোর গঠন করেছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল কর্মসূচি (ইউএনডিপি) সততা স্টোর গঠনে দুর্নীতি দমন কমিশনকে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। এছাড়া কমিশনের নিজস্ব অর্থায়নেও সততা স্টোর গঠন করা হচ্ছে। আবার স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে স্ব-স্ব অর্থায়নে সততা স্টোর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি সততা স্টোর গঠনে দুদক থেকে ৩০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়।