মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান
উত্তরা নিউজ


শিশুর বিকাশে চাই পুষ্টিকর খাবার: সেলিনা আক্তার






আজকের শিশু আগামী দিনের পরিণত মানুষ। আগামীতে বিশ্ব পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে। সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে তারা রাষ্ট্রের সম্পদ। শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত হলে রাষ্ট্র ও জাতির ওপর তার প্রত্যক্ষ ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই এ অমূল্য সম্পদ রক্ষা করে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার বিষয়টি জরুরি। শিশুর সুস্বাস্থ্য গঠনে পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অনেক। শিশুকে উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে রাখতে হবে। তবেই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সুষ্ঠু হবে। শিশুর স্বাস্থ্য বিকাশের অনুকূল পরিবেশ চাইলে মায়েদের কথাও ভাবতে হবে। মা যদি সুস্থ থাকে ও পুষ্টিসম্পন্ন খাবার গ্রহণ করে তাহলে মায়ের গর্ভে থাকা শিশুটিও ভালো থাকবে। সুস্থ মা-ই পারে একটি সুস্থ জাতি উপহার
দিতে। ‘পুষ্টিহীনতা’ কিংবা ‘অপুষ্টি’ শব্দগুলোর সাথে আমাদের সবাই কমবেশি পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অগণিত শিশু, বৃদ্ধ, যুবকরা অপুষ্টিতে ভুগছে। আমরা এর ব্যতিক্রম নই। ‘পুষ্টি’ শব্দটি খুব শোনা গেলেও আমরা এর সঠিক সংজ্ঞা খুঁজি না। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শরীরে খাদ্য শোষিত হয়ে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন হয়। ফলে শরীরে বৃদ্ধি ঘটে। সর্বোপরি, উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে পুষ্টি শোষণ হলেই দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে চাইলে অপুষ্টি বিষয়েও জানতে হবে। আমরা বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণ করে থাকি। তবে সব কিছুরই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে, যেটুকু গ্রহণে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিংবা কম খাবার গ্রহণ করলে দেহে যে তারতম্য ঘটে তাকেই অপুষ্টি বলে। অপুষ্টি কেবল শারীরিক কিংবা পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক এমনকি অর্থনৈতিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে। আবার অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ কিংবা ঘন ঘন অসুখ হলে কম পুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার গ্রহণ এবং সাথে সাথে শারীরিক পরিশ্রম না করলে পুষ্টির বাড়তি কিংবা অতিপুষ্টিও হতে পারে। একটি শিশুর জন্মের সময় সাধারণত ওজন ৩ থেকে ৩.৫ কেজি থাকে এবং উচ্চতা থাকে ৪৯ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার। যদি ঠিকমতো শিশুকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া যায় তাহলে ৫ মাস বয়সে ওজন দ্বিগুণ হয় এবং এক বছরে ওজন হয় তিনগুণ। এই হিসেবে ৫ মাস বয়সে একটি শিশুর ওজন হওয়া উচিত ৫ থেকে ৭ কেজি এবং এক বছরে ৯ থেকে ১০ কেজি। সেই সাথে উচ্চতা হবে ৫ মাসে ৬৫ থেকে ৬৭ সেন্টিমিটার এবং ১২ মাস বয়সে ৭৪ থেকে ৭৬ সেন্টিমিটার। শিশুর প্রথম ৬ মাসে কেবল মায়ের দুধই তার জন্য একমাত্র পুষ্টিকর খাবার। ৭ মাস বয়স থেকে শিশুকে ফলের রস, সবজি, প্রোটিন ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার, ডিমের কসুম এবং ভাত, ডাল, সবজি ও তেল। এই খাবারগুলো নরম করে শিশুকে  তার উপযোগী করে খাওয়াতে হবে। পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এমন শিশুদের দেখলেই বুঝা যায়। কারণ এসব শিশুদের পরিপূর্ণ শারীরিক বিকাশ হয় না। এরা বয়সের তুলনায় খাটো ও কম ওজনবিশিষ্ট এবং পর্যাপ্ত উচ্চতা থাকলেও কম ওজনবিশিষ্ট হয়ে থাকে। অপুষ্টির শিকার হলে অনেকগুলো লক্ষণই প্রতীয়মান হয়- দুর্বল ও চুপচাপ থাকা, রোগা, ঘাড় ও পাজরের হাঁড় স্পষ্ট চোখে পড়া, কুচকানো চামড়া, রগচটা ও খিটমিটে মেজাজ, হাত-পায়ে পানি আসা, ক্ষুধামান্দ্য রোগ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এদের বেশির ভাগেরই প্রোটিন ও ক্যালরির ঘাটতি রয়েছে। এদের প্রায় ৩৫ শতাংশ খাটো, ৩৩ শতাংশ কম ওজনবিশিষ্ট এবং প্রায় ১৫ শতাংশ রোগা-পাতলা গড়নের মাতৃগর্ভ থেকে কিংবা জন্মের পর সঠিক খাবার সুষম উপাদানে না পেলেও শিশু অপুষ্টির শিকার হয়ে থাকে। তবে যেভাবেই হোক না কেন, এর প্রভাব সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি-সব কিছুর ওপরই পড়ে। মহিলাদের বেশির ভাগেরই জিংক, আয়রণ, আয়োডিনের স্বল্পতা দেখা যায়। এ সমস্যাগুলো সবক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। ২৬ শতাংশ মহিলাই রক্তস্বল্পতায় ভোগে। পাঁচ বছরের নীচে শিশুদের প্রায় ৩৩.১ শতাংশই রক্তস্বল্পতায় ভোগে। তবে বর্তমানে আয়োডিনের অভাবে যেসব রোগ হতো সেগুলো কমেছে অনেকাংশে। শিশুদের মায়ের দুধ এবং সঠিক ও যথাযথ পরিমাণে পরিপূরক খাবার দেওয়া হলে এই সামাজিক সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে। অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ, খাবার নির্বাচনে অজ্ঞতা এবং একই ধরনের খাবার বার বার গ্রহণে সমস্যা বাড়ে। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের প্রতি যত্মবান হতে হবে। এসব শিশুর মৃত্যুহার স্বাভাবিকের চেয়ে ৯ গুণ বেশি। সচেতনতা বাড়ালে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।