শাপলা চত্বর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বনাম ইতিহাসের কবর রচনা


» উত্তরা নিউজ ডেস্ক জি.এম.টি | | সর্বশেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২০ - ০৮:২৭:২৯ অপরাহ্ন

৫ই মে। ইতিহাসের এক রক্তাক্ত রজনীর কথা বলছি।হয়তো সবার সেই রক্তের ইতিহাস জানা আছে। কিন্তু সবার জানা নেই সে রাতে পেছন থেকে কারা কলকাটি নাড়ছিল।২০১৩ সালে ৫ মে এর কথা বলেছিল। সেদিন ছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আহবানে ঢাকা অবরোধ। নাস্তিক ব্লগাররা প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ( সা) কে নিয়ে কটুক্তি ও ইসলামের বিভিন্ন বিধি বিধান নিয়ে ব্লগে নোংরা লেখালেখি করায় তাদের বিচারের দাবিতেই এই অবরোধ। কাউকে ক্ষমতা থেকে নামাতে এবং কাউকে ক্ষমতায় বসানো অবরোধের উদ্দেশ্য ছিলনা। তা স্বর্থেও হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করে সেদিন পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার দিবা স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের সেই স্বপ্ন ভেস্তে গেছে আওয়ামী লীগ সরকারের কৌশলের কাছে।

আমি বলছিনা সেদিন আওয়ামী লীগের কোন দোষ ছিলনা। কিন্তু এর চেয়ে বড় দোষ তাদের যারা হেফাজতে ইসলামের কাধে ভর করে ক্ষমতায যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধ গড়ে উঠা হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন কে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের মূখ্য সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে বিএনপি জামায়াত ক্ষমতায় যাওয়ার ছক এঁকেছিল।জামায়াতের বিভিন্ন নেতা এবং বিএনপির জোটে থাকা কওমী ঘরানার ইসলামী দলের নেতাদের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্ন বাস্তবায়নে যাতে কোন বাধা না থাকে সে জন্যে শুরু থেকে সুকৌশলে চরমোনাই পীরের নেতৃ্ত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে হেফাজতে ইসলামের সকল আন্দোলন সংগ্রাম থেকে দূরে রাখে।

সর্বপ্রথম হাটহাজারি মাদরাসার ওলামা সম্মেলন থেকে চরমোনাই পীর ও তাঁর সংগঠন কে হেফাজতে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে ইচ্ছা করেই বির্তকিত বক্তব্য দেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের আমির মুফতি ওয়াক্কাস।এটা ছিল বিএনপি জামায়াতের পরোক্ষ মদদতে চরমোনাই পীর সাহেব কে হেফাজতে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রাথমিক কৌশল মাত্র। অনেকে হয়তো বলবেন,পবিত্র রমজানে এসব কথা না বলায় শ্রেয়।আমি দায়বদ্ধতা থেকে এই সঠিক ইতিহাস জাতির কাছে পৌছে দিতে চাই। কথা লম্বা না করে সংক্ষেপে বলছি। হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ ছিল নাস্তিক ব্লগারদে শাস্তির দাবিতে।হেফাজতে ইসলাম নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ১৩ টি দফা দিয়েছিল।

আন্দোলন সংগ্রামে ব্যর্থ বিএনপি জামায়াত হেফাজতে ইসলামের শক্তির জোরে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখার কারণেই ৫মে,২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ডাকে অবরোধে আসা নীরহ মানুষ শহিদ হয়েছিল। সেদিন সরকার হেফাজতে ইসলামকে শাপলা চত্বরে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত থাকার অনুমতি দিয়েছিল।সেদিন হেফাজতে ইসলাম ৫টায় শাপলা চত্বর ত্যাগ করলে হেফাজতের সব দাবি না মানলে অন্তত কিছু দাবি সরকার মানতে বাধ্য হত।কারা সেদিন সরকারের আইন অমান্য করে রাত যাপনের সিন্ধান্ত নিয়েছিল। যারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরাণা মাহফিলে করে শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দিয়েছিল তারাই হেফাজতে ইসলামের ডাকে অবরোধে অাসা নীরহ তৌহিদী জনতাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। যারা সেদিন হেফাজতের মঞ্চে উঠে ১৩ দফা নিয়ে কথা না বলে সরকার বিরোধী বক্তব্য দিয়েছিল,সরকার পতনের ডাক দিয়েছিল পরবর্তীতে তারাই অাওয়ামী লীগের নৌকায় উঠেছে। সরকার যখন জানতে পারল হেফাজতে ইসলামের ঘাড়ে পা দিয়ে বিএনপি জামায়াত পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চাইছে তখনই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা বাঁচাতে নির্মমভাবে নিরীহ তৌহিদী জনতার উপর হামলা করে।বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে রাতের অাঁধারে নির্দয়ভাবে, নির্মমভাবে শহিদ করে নীরহ মানুষকে।

এই হত্যার দায় আওয়ামী লীগ যেমন এড়াতে পারবেনা, ঠিক তেমনি বিএনপি জামায়াতও দায় এড়াতে পারে না। দায় এড়াতে পারে না ঐক্যজোট, জমিয়তের ক্ষমতালোভী নেতারাও। একদিন রক্ত কথা বলবে। সেদিন ছাড় পাবে না শাপলা চত্বরের কোন খলনায়করা।সরকার কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল বিএনপির ৭২ ঘন্টার সরকার পতনের অাল্টিমেটাম। ২ মে বিএনপি ঢাকায় সমাবেশ করেছিল। সেই সমাবেশ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সরকারকে ৭২ ঘন্টা অাল্টিমেটাম দিয়েছিল। সেই আল্টিমেটাম হেফাজতে ইসলামের অবরোধের দিনও ছিল।বিএনপি জামায়াত যে হেফাজতে ইসলামের ঘাড়ে পা দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিল সেটাই তার প্রমাণ।

বিএনপি জামায়াতের ক্ষমতার স্বপ্নে বলি হয় নীরহ মানুষের জীবন।পঙ্গু করে দেওয়া হয় হেফাজতে ইসলামকে।বিএনপি জামায়াত ক্ষমতায় যেতে আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার লড়াইয়ে রক্ত ঝরে তৌহিদী জনতার। শহিদ হয় নিরীহ মানুষ। হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করে বিএনপি জামায়াত যে ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল তার বহু প্রমাণ পাওযা যায।

সেদিন রাতে আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী কে গ্রেপ্তার করা হয়। সেদিন গ্রেপ্তার হয়নি বিএনপির জোটে থাকা কোন নেতা। গ্রেপ্তার হয়নি মুফতি ফয়জুল্লাহ, মুফতি ওয়াক্কাস, মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব। অথচ তারাই সেদিন বিএনপি জামায়াত কে ক্ষমতায় নিয়ে যেতে হেফাজতে ইসলামের মঞ্চ থেকে সরকার পতনের ডাক দিয়েছিল। সেদিন রাতের অাঁধারে মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব লন্ডনে পালিয়ে যায়।

গা ঢাকা দেয় জামায়াত, ঐক্যজোট, জমিয়তের নেতারা যারা বিএনপি জামায়াতকে ক্ষমতায় নিয়ে যেতে কাজ করেছিল। সেটা যদি পরিকল্পিত না হয় জুনাইদ অাল হাবিব রাতের অাঁধারে কিভাবে লন্ডনে পালিয়ে গেল? কখন টিকেট করল, কখন ভিসা ঠিক করল? নিশ্চয়ই এটা পূর্বপরিকল্পিত।

যারা সেদিন বিএনপি জামাযাতকে ক্ষমতায় নিয়ে যেতে অসহায় নীরহ মানুষকে অস্ত্রের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সেই তারাই ২০১৮ সালে ৪ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে কওমী জননী উপাধি দেয়।প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব যখন বলেছিল,শাপলা চত্বরে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি তখন শাপলা চত্বরের খলনায়করা নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করে। এখনো যখন দেখি তাদের পক্ষে কওমী অঙ্গনে স্লোগান উঠে তখন হতাশ হই। শাপলা চত্বরের রক্তের ইতিহাস চাপা পড়ে যায় ২০১৮ সালে ৪ নভেম্বর শোকরণা মাহফিলের নামে ইতিহাস বিকৃতির মধ্য দিয়ে। যারা স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করেছে তাদের শাস্তি যদি অর্ধশতাব্দী পরে এসে হতে পারে, তাহলে জেনে রাখুন যারা শাপলা চত্বরের রক্তের ইতিহাস যারা বিকৃতি করেছে তাদের বিচারও একদিন হবে ইনশাআল্লাহ ।

লেখকঃ নুর আহমদ সিদ্দিকী