শত বছরের ‘ঘাটকুড়ি’ হাট প্রাণ হারাতে বসেছে


» শামীম শিকদার | কাপাসিয়া, গাজীপুর | | সর্বশেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২০ - ০৯:১৩:৪৯ অপরাহ্ন

সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ হাটে আসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য ক্রয় করতে। কৃষকরা ঝুড়ি ভরে তাদের উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজি ও ফলমূল হাটে বিক্রি করে। বিক্রি শেষে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তারা এখান থেকেই কিনে নেয়। হাটের পশ্চিম পাশ ঘেষে চলে গেছে একটি খাল। হাটের নামানুসারে পরিচিতি পেয়েছে খালটির।
এই খাল দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত নৌকা নিয়ে পাইকাররা স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে ভেজালমুক্ত সবজি ও ফলমূল ক্রয় করতে আসে। নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সকল জিনিসই পাওয়া যায় এ হাটে। মৌমাছির মতো হমহম শব্দে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে বলে দেয় হাট জমে উঠেছে। কালের বিবর্তনে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় এখন প্রায় প্রাণহীন এ হাট। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিদের মুখে শোনা যায় ঐহ্যিবাহী এ গ্রাম্য হাটের গল্প। প্রবীণ ব্যক্তিরা যেন শত বছরের পুরনো হাটের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এখনও। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ঘাটকুড়ি হাটের কথাই বলছি।
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বে ১৯৩০ সালের দিকে সূচনা হয় এ হাটের। উপজেলার দূর্গাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম শেষ প্রান্তে এবং চাঁদপুর ইউনিয়নের পূর্ব শেষ প্রান্তে প্রায় ৪০ বিঘা জমির উপর বসত এ হাট। পুরো জমি ছিল চাঁদপুর গ্রামের কুদ্দুস পলোয়ান নামে এক ব্যক্তির। হাট চলাকালীন সময় প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার দূর থেকে শোনা যেত মানুষের সমাগমের হমহম শব্দ। শীতলক্ষ্যা নদীর দক্ষিণ পাশের তিন ইউনিয়নসহ উপজেলাবাসী অপেক্ষা করতো সপ্তাহে দুই দিন বসা এ হাটের জন্য। উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় হাট ছিল ঘাটকুড়ি হাট। বর্তমান সময়ের মতো ঘন  ঘন হাট-বাজার না থাকায় মানুষ অনেকটা নির্ভরশীল ছিল এ হাটের উপর। দাড়িয়াবান্ধা খেলাসহ বিভিন্ন খেলার মাধ্যমে হাটকে জমজমাট রাখা হতো। পূর্ব পাশ দিয়ে বসতো গরুর হাট। হরেক রকমের বাহারি পণ্য সামগ্রী কিনতে মানুষ ভিড় করতো এখানে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রির পাশাপাশি যাবতীয় জিনিসপত্রসহ সব পাওয়া যেত ঘাটকুড়ি হাটে।  পূর্ব পাশ ঘেষে রয়েছে ঘাটকুড়ি খাল। যা হাটের নামানুসারে নামকরণ করা হয়। এ খাল দিয়ে ফরিদপুর, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা আসত পণ্যদ্রব্য ক্রয় করতে। সাপ্তাহিক এ হাটকে কেন্দ্র করে আশপাশের গ্রামগুলোর মধ্যে আনন্দের আমেজ ছিল। কৃষকের উৎপাদিত সবজি বিক্রির জন্য সপ্তাহ জুড়ে জমিয়ে রাখা হতো। এ হাটটি ছিল গ্রামবাসীর নিদিষ্ট স্থানে মিলিত হওয়ার একটি মাধ্যম। গ্রামের লোকদের জীবনযাতত্রা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম হাটকে বাদ দিয়ে চিন্তা করা অসম্ভব ছিল। নৌকায়, গাড়িতে ও পায়ে হেটে বিপুর পণ্যসম্ভার নিয়ে বিক্রেতারা হাটে এসে সমাবেত হতো। জিনিসপত্র বিক্রয়ের দোকানগুলো ছিল সারিবন্ধ। কাঁচামাল, পান-সুপারি, গুড়-তামাক, মাছ, দা-বাডি, মাটির তৈরি  তৈজসপত্র, কাপড়ের দোকান, ওষধের দোকান, চায়ের দোকান ও গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি বিক্রি এবং ক্রয়ের ব্যবস্থা ছিল এক জায়গায়ই। প্রচুর লোকসমাগমের কারণে হাট হয়ে উঠতো সরগরম। অন্যদিকে বিচিত্র পোশাকে বিভিন্ন ফেরিওয়ালার হাকডাক, মাইকে ভাষণ, হারমোনিয়াম বাজিয়ে নানা ধরনের পন্যসামগ্রী বিক্রি ছিল আকর্ষণীয়। ক্রেতা-বিক্রেতার দর কষাকষির কলরবে মুখর হয়ে উঠতো পুরো হাট। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাট ভাঙতে শুরু হতো। ক্রেতারা ব্যগভর্তি পণ্যসামগ্রী নিয়ে বাড়ি ফিরতো। বিক্রেতারা ফিরতো মনের অনন্দে পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে। এ হাট শুধু ক্রয়-বিক্রয়ের কেন্দ্র নয়; কর্মব্যস্ত গ্রামীণ জীবনে পারষ্পরিক ভাব বিনিময় অপূর্ব এক মিলন স্থাল ছিল। ক্রমেই জনশূণ্য হয়ে হাট এখন নিথর-নিস্তব্ধ।
নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী এ গ্রাম্য হাট আজ বিলুপ্তির পথে। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে তেরমুখ এলাকায় খালের মধ্যে সুইচগেট তৈরি করা। এর ফলে নৌকা চলাচলে বাঁধার সৃষ্টি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে নৌকা আসা বন্ধ করে দেয়। এছাড়াও আধুুনিকতার ছোঁয়ায় অন্যান্য নতুন বিভিন্ন হাট-বাজার আবিষ্কারের মাধ্যমে এ হাটে জনসামাগম কমতে শুরু করে। এবং ঘাটকুড়ি ও দূর্গাপুর দুই ইউনিয়নের রেষারেষিতে আজ বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী এ গ্রাম্য হাট।
সরেজমিনে দেখা যায়, নেই পুরনো সেই রূপ। ক্রমেই ছোট হয়ে গেছে হাট বসার জায়গা। বিভিন্ন ছোট ছোট আগাছা গাছে ভরে গেছে চারপাশ। মাটির তৈরি দোকানগুলোর টিনের চালে জং ধরে ভেঙে পড়ছে। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাটির দেয়ালগুলো। অল্প কিছু ক্রেতা-বিক্রেতায় চলছে হাট।
প্রাণহীন এ হাটের পুরোনো গল্প শোনা যায় প্রবীণ কয়েকজন বিক্রতার মুখে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাশক গ্রামের হাটের প্রবীণ ব্যবসায়ী মুসলেম উদ্দিন বলেন, আমি এখানে ৪০ বছর ধরে সার বিক্রি করছি। ওই মাটির ঘরটি আমার। খালে সুইচগেট তৈরি ও চাঁদপুর-ঘাটকুড়ি দুই হাটের রেষারেষি ছিল বেশ।
ব্যবসায়ী আকাম উদ্দিন বলেন, তিলের নাড়া, খাজা, কদমা, কাগজের চড়কি, বাতাসা, চিনির তৈরি নানা ডিজাইনের হাতি, নিমকি, মুড়ালি, খৈ, মুড়ি-মুড়কি, হাওয়াই মিঠাইসহ শিশুদের বাহারি রকমের খেলনা ও খাবার বিক্রি করেছি আমি। প্রায় ২শ মিটার লম্বা দুই সারিতে এসব দোকান ছিল। আমার এক ভাইয়ের ২২টি সেলাই মেশিন ছিল। এখন তার কিছুই নেই।