লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিঃ শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কারিগর

এ এইচ এম মাসুম বিল্লাহ

» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২০ - ০৭:১৭:৪২ অপরাহ্ন

সিদ্ধান্ত সঠিক হলেই মানুষ গন্তব্যে পৌঁছায়। ইতিহাস সে কথাই বলে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় শিল্পখাত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এর  সম্ভাবনা বিবেচনা করে জাতীয় শিল্প নীতি ২০১৬-এ উচ্চ অগ্রাধিকার খাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রপ্তানি বাড়াতে এ শিল্পকে  ২০২০ সালের জন্য জাতীয়ভাবে বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপরে দাঁড়িয়ে বলতে হয়, বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যেকে আরো গতিশীল করার জন্য এ সিদ্ধান্ত সময়ের সঠিক ব্যবহার। প্রধানমন্ত্রী বলেন প্রায় ১৭ কোটি ভোক্তার বাজার নিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গেটওয়ে হওয়ায় প্রায় ৪ বিলিয়ন ভোক্তার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের বিনিয়োগ বান্ধবনীতি একইসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করছে। সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হব।

আমরাও প্রধানমন্ত্রীর এই চিন্তার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বলতে চাই, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প খাতের বিকাশে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সরকারকেও সমানতালে এগিয়ে আসতে হবে। তবে প্রধান ভূমিকায় থাকতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই। বিশেষ বিশেষ সহায়তায় থাকবে সরকার, অনেকটা গাইডার হিসেবে।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিকে বলা হয় শিল্পখাতের জন্মদাত্রী। কোনো বিশেষ শিল্প স্থাপন করতে হলে যে সকল মূলধনী যন্ত্রপাতি দরকার হয় সেটির বহু মূল্যবান যন্ত্রাংশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিতে উৎপাদিত হয়। সে সঙ্গে যে-কোনো শিল্পকে সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশও এ বিশেষ খাতে উৎপাদিত হয়। এমনকি শিল্প কারখানার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রিপেয়ারিং ও সার্ভিসিংসহ অন্যান্য পরিচর্যার কাজটিও লাইট ইন্ডাস্ট্রি করে থাকে।

যেসব পণ্যকে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের আওতায় আনা হয়েছে তাদের মধ্যে বাইসাইকেল, মোটর সাইকেল, অটোমোবাইল, অটোপার্টস, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স, অ্যাকুমুলেটর ব্যাটারি, সোলার ফটোভলটিক মডিউল এবং খেলনা সামগ্রী ইত্যাদি।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। অদক্ষ জনশক্তি এ শিল্পখাতে কাজ শুরু করলেও পরবর্তীতে হাতেকলমে মেশিনে কাজ করে তারা একসময় অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠে। প্রতিবছর এখাত থেকে মেশিন অপারেটর, টার্নার, ওয়েল্ডার ইত্যাদি কাজে বহু জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং তারা অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ জনশক্তির চেয়ে অধিক পরিমাণে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশের জন্য আয় করে আনছে।

বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ৪০ হাজারের অধিক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় সরাসরি ৬ লাখ এবং পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ৬০ লাখ লোক জীবিকা নির্বাহ করছে। যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৩০ শতাংশ এবং জিডিপিতে অবদান  প্রায় ৩ শতাংশ। প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকার যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন করার মাধ্যমে অন্ততঃ বছরে  ২০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে। তবে দেশে এ খাতের বাজারের আকার প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা যার একটি বড়ো অংশ এখনও আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য হতে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ খুবই কম। বিগত চার বছরে রপ্তানি আয় যথাক্রমে ৫১০, ৬৮৭, ৩২৭, ৩২০ মিলিয়ন ইউএস ডলার, অথচ এ খাতে বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্ন্তজাতিক বাজার রয়েছে। এ বিশাল মার্কেটের সামান্য একটু ধরতে পারলেই এটি দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং মূল্য সংযোজনের পরিমাণ পোশাক শিল্পের তুলনায় অনেক বেশি। এ শিল্পের প্রভূত সম্ভাবনাকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগাতে বর্তমান সরকার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যকে ২০২০ সালের জন্য বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। সে সঙ্গে এ খাতে নতুন বিনিয়োগের আহবান জানানো হয়েছে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ খাতের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের সমস্যাসমূহ দূরীকরণে উদ্যোগী হতে হবে। তাই এখাতের উন্নয়নে স্বল্প সুদে ঋণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এদেশের পোশাক শিল্প খাতের উন্নয়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। পোশাক শিল্পের মতো হাল্কা প্রকৌশল খাতের উন্নয়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৃজনশীল বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন এখাত সংশ্লিষ্টগণ। সে সঙ্গে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির। বর্তমানে ফিনিশড পণ্য বা মূলধনী যন্ত্র আমদানি করলে শুধুমাত্র ১% শুল্ক কর, পক্ষান্তরে এই মূলধনী যন্ত্র দেশে তৈরি করলে কাচাঁমালের কর দিতে হয় ২৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত। দেশীয় হালকা প্রকৌশল খাতের স্বার্থে শুল্ক কাঠামোকে পুণঃবিন্যাস করা হলে এখাত দেশের সামগ্রিক শিল্পখাতের উন্নয়নে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

হালকা প্রকৌশল পণ্যের সুবিশাল আন্তর্জাতিক বাজারে সুযোগ পাবার জন্য এদেশে উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান উন্নয়ন অপরিহার্য। স্থানীয় কারখানায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য উৎপাদন ও চাহিদাভিত্তিক গবেষণা পরিচালনার জন্য কারিগরি সুবিধা না থাকায় মানসম্পন্ন লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য উৎপাদন ও এ খাতের রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছেনা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক) লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পণ্যের গুণগতমান উৎকর্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আধুনিক কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার বিশিষ্ট টুল এন্ড টেকনোলজি ইন্সটিটিউট স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এ ইন্সটিটিউটে অটোমোবাইলের খুচরা যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য শিল্পের উপযোগী লাইট ইঞ্জিয়ারিং পণ্য উৎপাদন করা যাবে। দেশীয় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের মান উন্নয়নে বুয়েটসহ অন্যান্য প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথভাবে সিএনসি প্রযুক্তি, হিট ট্রিটমেন্ট, প্লেটিং বিষয়ে সকল ধরনের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এছাড়া বিদ্যমান শ্রমিক, কারিগর ও প্রকৌশলীদের দক্ষতা উন্নয়নে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। একই সঙ্গে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে সফল উদ্যোক্তা তৈরিতেও টুল এন্ড টেকনোলজি ইন্সটিটিউট থেকে সহায়তা প্রদান করা হবে।

পুরাতন ঢাকা ও ঢাকার আশেপাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা ইলেকট্রনিক্স ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প কারখানাসমূহ একটি সুবিধাজনক পরিবেশবান্ধব স্থানে স্থানান্তর করার লক্ষ্যে ‘বিসিক বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগরী’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি  উপজেলায় ৫০ একর জমির ওপর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জুন ২০২২ সাল নাগাদ এ প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হবে। ৩০৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়বিশিষ্ট এ শিল্পনগরীতে মোট ৩৬২টি শিল্পপ্লট তৈরি করা হবে।

আমরা মনে করি এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন তার একটিও বিফলে যায়নি। শিল্পনগরীতে সকল অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করায় আগামীদিনে একটি উন্নত ও পরিবেশবান্ধব পরিবেশে বৈদ্যুতিক ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন। আমাদের বিশ্বাস সংশ্লিষ্টরা যদি আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসেন বর্ষপণ্য হিসেবে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যও সফলতা বয়ে আনবে।