উত্তরা নিউজ উত্তরা নিউজ
অনলাইন রিপোর্ট


রেমিটেন্স প্রণোদনায় পাঁচ ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত






প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে প্রণোদনা সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ পাঁচটি সমস্যা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে বারবার প্রণোদনা নিতে একই রেমিটেন্স ফের বিদেশে পাঠানো, বিধিবহির্ভূত প্রণোদনা গ্রহণের পর তা ফেরত না দেয়াকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এছাড়া প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব, রফতানিকারকরা কৌশলে এ সুবিধা ভোগ করতে পারেন এমন শঙ্কা এবং ভবিষ্যতে এ সুবিধা প্রত্যাহারের সমস্যাও এর অন্তর্ভুক্ত। এসব ঝুঁকি মাথায় রেখেই প্রণোদনার কৌশল নির্ধারণ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক হিসাবে প্রবাসীদের রেমিটেন্সে প্রণোদনা দিতে বছরে সরকারের ব্যয় হবে ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরের বাজেটে বৈধপথে প্রবাসীদের রেমিটেন্স বাড়ানোর জন্য ২ শতাংশ হারে প্রণোদনার ঘোষণা দেয়া হয়। এ বছর থেকেই এটি কার্যকর করা হবে। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরে রেমিটেন্সের পরিমাণ ১৫ শতাংশ বাড়ানো এবং হুন্ডিকে নিরুৎসাহিত করতে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এমকে মুজেরি বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স পাঠালে ১ ডলারের বিপরীতে ৮৫ টাকা পাবে। অপরদিকে কার্ব মার্কেটের মাধ্যমে এলে পাওয়া যাবে ৯০ টাকা। মুদ্রা বিনিময় হার এক্ষেত্রে দু’ধরনের হয়ে যাচ্ছে। প্রবাসীরা ব্যাংকের মাধ্যমে যাতে টাকা পাঠান এবং কার্ব মার্কেটকে নষ্ট করতেই সরকার রেমিটেন্সে প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এ উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে না। পাশাপাশি দীর্ঘদিন চললে প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে মুদ্রার মূল্য বিনিময় হার সমন্বয় করা। টাকার অতি মূল্যায়ন হলে এটি কমাতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ১৫ শতাংশ রেমিটেন্স বাড়ানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা হিসাবে ধরলে রেমিটেন্সের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ৭২৩ কোটি মার্কিন ডলার। যা স্থানীয় মুদ্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। প্রতি ১০০ টাকার রেমিটেন্সের বিপরীতে দেয়া হবে ২ টাকা প্রণোদনা। এ জন্য চলতি বাজেটে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা।

প্রথমবারের মতো রেমিটেন্সে প্রণোদনা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে ইতিপূর্বে এর কোনো নীতিমালা বা ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়নি। তবে এখন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রণোদনা দেয়ার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি এ প্রণোদনা দেয়ার ওপর সম্ভাব্য পাঁচটি ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়েছে।

প্রথম ঝুঁকিতে বলা হয়, প্রবাসীরা নিজ নামে তার আপনজনের কাছে রেমিটেন্স পাঠায়। প্রচলতি ব্যবসায়িক লেনদেনের মতো আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তির প্রয়োজন হয় না। পাশাপাশি রফতানি বাণিজ্যের মতো লেনদেন সম্পাদনের সপক্ষে কোনো কাগজপত্রের প্রয়োজন হয় না। ফলে রেমিটেন্স খাতে আর্থিক প্রণোদনা সুবিধা নেয়ার পর একই অর্থ (রেমিটেন্স) অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে ফের বিদেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। প্রণোদনা লাভের সুবিধা গ্রহণের জন্য পুনরায় ওই অর্থ রেমিটেন্স আকারে দেশে আসতে পারে।

দ্বিতীয় ঝুঁকিতে বলা হয়, রফতানি বাণিজ্যে প্রণোদনা দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করে নিরীক্ষা কার্যক্রম শেষে নগদ সহায়তা বা ভর্তুকি পরিশোধ করা হয়। এ সুবিধা বিধিবহির্ভূত ভাবে নেয়া হলে তা আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু প্রবাসী আয়ের বিপরীতে নগদ পরিশোধিত প্রণোদনার অর্থ কেউ বিধিবহির্ভূতভাবে নিলে তা সহজে আদায় করা যাবে না। স্বল্প মেয়াদে এ প্রণোদনা ফলপ্রসূ হলেও দীর্ঘ মেয়াদে শ্রমবাজারে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তৃতীয় ঝুঁকিতে উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রফতানিকারদের অনুকূলে নগদ সহায়তা দেয়া হয়। এ কারণে প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে কম মূল্যে পণ্য রফতানি কার্যক্রম পরিচালনা করেন ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে ন্যায্যমূল্যে পণ্য রফতানি না করেও উদ্যোক্তারা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। অপরদিকে প্রবাসী আয়ের ওপর প্রণোদনা সুবিধা দেয়ার ফলে প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক শ্রম বাজারে প্রবাসীদের সস্তায় শ্রম বিক্রিতে উৎসাহ দেয়ার মতো অবস্থা দাঁড়াতে পারে। প্রণোদনার ঝুঁকিতে আরও বলা হয়, রফতানিতে সব খাতে নগদ সহায়তা দেয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর ব্যবসায়ীরা তাদের রফতানি মূল্যের অংশবিশেষ প্রবাসী আয় হিসেবে নিয়ে আসার চেষ্টা করবেন। এতে সফল হলে তিনি উৎসে কর থেকে অব্যাহতি প্রাপ্তিসহ প্রণোদনা গ্রহণের সুযোগ পাবেন।

সর্বশেষ ঝুঁকিতে বলা হয়, প্রণোদনা সুবিধা একবার দেয়া হলে অদূর ভবিষৎতে তা প্রত্যাহার বা কমানোর সুযোগ নাও থাকতে পারে। কারণ এ ধরনের সুবিধা প্রদানে ইতিবাচক প্রভাবের চেয়ে প্রত্যাহার বা কমানোর নেতিবাচক প্রভাব সাধারণত অনেক বেশি হয়ে থাকে।

জানা গেছে, এর আগে বৈধ পথে রেমিটেন্স বাড়াতে সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটি কয়েকটি সুপারিশ করেছে তাদের প্রতিবেদনে। সুপারিশটি সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে জমা দেয়া হয়। ওই সুপারিশে বিদেশ যাওয়ার আগে প্রবাসীদের ব্যাংক হিসাব খোলা বাধ্যতামূলক, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে নেয়া পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা, মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশের সঙ্গে তা আধুনিকায়ন এবং তাদের কার্যক্রম মনিটরিং করা, প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরে বিশেষ ডেস্ক চালু, বৈধ চ্যানেলে রেমিটেন্স পাঠাতে উদ্বুদ্ধকরণের কথা বলা হয়। এছাড়া প্রবাসীদের জন্য রেমিটেন্স কার্ড চালু, এ কার্ডের আওতায় বৈধ পথে রেমিটেন্স পাঠানোর পরিমাণের ভিত্তিতে তাদের সন্তানের স্কুল ভর্তি, হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা, দূতাবাস সেবা গ্রহণে অগ্রাধিকার, ব্যাংক হিসাবে বাৎসরিক এক্সাইজ ডিউটি ও উৎসে কর কর্তনে অব্যাহতি, বছরে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বিনা শুল্কে ইলেকট্রনিক সামগ্রী আনার সুবিধা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।

উত্তরা নিউজ-এস,এম,জেড