রাজনীতিতে হঠাৎ উত্তাপ


» এইচ এম মাহমুদ হাসান | | সর্বশেষ আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২০ - ১০:২২:৫৯ পূর্বাহ্ন

অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো উত্তাপ নেই। এতটাই নিরুত্তাপ যে রাজনীতি আছে কি নেই, সেটা নিয়েই সন্দেহ জাগে মাঝে মাঝে। এক আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের কোনো তৎপরতাই নেই যেন। ওবায়দুল কাদের মাঝে মাঝে হাওয়ায় তলোয়ার ঘুরিয়ে বিএনপির অস্তিত্ব জানান দেন বটে, নইলে বিএনপির আওয়াজও শোনা যায় না।

আমি বাজি ধরে বলতে পারি, ওবায়দুল কাদের বিএনপির নাম নেয়া বন্ধ করে দিলে, মিডিয়ায় তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হতো। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতি না করার শর্তে মুক্তি পেয়ে নিজ বাসায় আইসোলেশনে আছেন। বিভিন্ন মামলায় দণ্ডিত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান লন্ডনে বসে রিমোট কন্ট্রোলে দল চালাবার চেষ্টা করছেন। দলের সিনিয়র নেতাদের কেউ পদত্যাগপত্র দিয়ে বসে আছেন। কেউ কেউ দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কথা বলছেন প্রকাশ্যে। এমনকি মা-ছেলের মধ্যে দ্বন্দ্বের কথাও আসছে পত্রিকায়।

 আমরা রাজনীতি চাই, গণতন্ত্র চাই, সুষ্ঠু নির্বাচন চাই, ভোটাধিকার চাই; কিন্তু কোনো নাশকতা, দুর্বৃত্তপনা, অন্ধকারের শক্তির তৎপরতা চাই না। 

গত নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল বিএনপি, সে স্বপ্ন হাওয়া মিলিয়ে গেছে নিমেষেই। বিনা ঘোষণায় ইন্তেকাল করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তো গেছেই, ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরাম খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে অনু, পরমাণুর রূপ নিয়েছে। মাহমুদুর রহমান মান্নারও কোনো আওয়াজ শব্দ নাই, টেলিকনফারেন্সও ফাঁস হয় না আর। শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির পর অনেকটাই আন্ডারগ্রাউন্ডে জামায়াত। কঠিন শৃঙ্খলায় চলা জামায়াতেও ভাংচুর হয়েছে। যখন আরো কঠিন ঐক্য দরকার, তখন সরকার বিরোধীরা ভাঙতে ভাঙতে নিজেদের অস্তিত্বই হারাতে বসেছে।

বিরোধী শিবিরে যখন অসহ্য নৈঃশব্দ্য। সরকারি শিবিরও তখন চুপচাপ। পাল্টাপাল্টি না থাকলে রাজনীতি ঠিক জমে না। সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অস্তিত্ব হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এরশাদ বেঁচে থাকতে তবু মাঝে মধ্যে ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে নিজের এবং দলের অস্তিত্ব জানান দিতেন। এখন আওয়াজও নেই। হাসানুল হক ইনু আর রাশেদ খান মেনন মন্ত্রী থাকার সময় জাসদ আর ওয়ার্কার্স পার্টির কিছু তৎপরতা চোখে পড়তো, এখন মনে হয় তারাও শীতনিদ্রায় আছেন। মোহাম্মদ নাসিম বেঁচে থাকতে তবু ১৪ দলের মিটিং-টিটিং হতো। এখন তাও নাই। সব মিলিয়ে রাজনীতি এখন ডিপ কোয়ারেন্টাইনে। রাজপথ দেখলে মনে হবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ শুধু ইসলামী দলগুলো। তারা একে সময় একে আবদার নিয়ে মাঠে নামে।

রাজনীতির এই ডিপ কোয়ারেন্টাইন কালে হঠাৎ উত্তাপ নিয়ে এলো আগুন। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা ও সিরাজগঞ্জে দুটি উপনির্বাচনের দিনে রাজধানীতে ১১টি বাসে আগুন রাজনীতিকেই হঠাৎ আলোচনায় নিয়ে এলো। পুলিশ বাস পোড়ানোসহ নাশকতার ঘটনায় অন্তত ১৫টি মামলা করেছে, যাতে বিএনপির ৫০০ নেতাকর্মীকে আসামী করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই সরকারি দলের নেতারা বাস পোড়ানোর জন্য বিএনপিকে দায়ী করে বিচার দাবি করে আসছে। তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি দল রাজপথে প্রতিবাদ মিছিলও করেছে। তবে বিএনপি বারবার অস্বীকার করে আসছে, এই কাজ তারা করেনি। বিএনপি বরং এই নাশকতার জন্য সরকারের এজেন্টদের দায়ী করেছে।

আলোচনাটা রাজনীতির। তবে ঘটনাটা মোটেই রাজনৈতিক নয়। এটা স্রেফ নাশকতা। কারণ এখন পর্যন্ত কেউ এর দায় স্বীকার করেনি। তাহলে এই নাশকতায় কার লাভ, কার ক্ষতি? বিএনপির অভিযোগ হলো, সরকারি দলের এজেন্টরা করেছে। কিন্তু দেশের সবকিছু যখন সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে, রাজনীতি যখন ডিপ কোমায়, বিএনপি যখন শীতনিদ্রায়; তখন সরকারের এজেন্টরা কেন নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে বাসে আগুন দিয়ে দেশে আতঙ্ক ছড়াবে, অস্থিতিশীল করতে চাইবে।

মামলা-হামলায় বিএনপি এমনিতেই পর্যুদস্ত। তাদের কাবু করার জন্য আর নতুন মামলা দরকার নেই। বাস পোড়ানোতে সরকারের অন্তত কোনো লাভ নেই। ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালের স্মৃতি যাদের মনে আছে; তারা এই ঘটনার জন্য সহজেই বিএনপিকে দায়ী করতে চাইবেন। আগুন সন্ত্রাস, পেট্রোল সন্ত্রাসে বিএনপি অভ্যস্থ। তখনও বিএনপি অস্বীকার করেছে। কিন্তু তাদের আন্দোলনের সময়ই দেশজুড়ে আগুন সন্ত্রাস হয়েছে। তাদের আন্দোলন যখন শেষ, তখন নিভেছে আগুনের লেলিহান শিখাও। তাই যতই অস্বীকার করুক, আগুনের দায় বিএনপিকেই নিতে হবে।

এবারও তাই বাসে আগুনের দায় পারসেপশন ঠেলে দিয়েছে বিএনপির দিকেই। তবে বিএনপির এখন যা মনোবল, সাংগঠনিক যে অবস্থা; তাতে একসাথে ১১ বাসে আগুন দেয়ার সক্ষমতা তাদের আছে বলে মনে হয় না। আর তারা এখন নিজেদের ঘর গোছানো নিয়ে ব্যস্ত। এ সময় বাসে আগুন দেয়া মানে নিজেদের ক্ষতি করা। কারণ বাসে আগুন দিলে মামলা হবে, পুলিশের দৌড়ের ওপর থাকতে হবে, এটা তো তারাও জানে নিশ্চয়ই। তাতে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ বিঘ্নিত হবে। বাসে আগুন দেয়া সরকারি দলের জন্য যেমন নিজের পায়ে কুড়াল মারা, বিএনপির জন্য তারচেয়ে বেশি।

বিএনপির কেউ যদি বাসে আগুন দিয়ে থাকে, তবে সেটা পায়ে কুড়াল নয়, মাথায় কুড়াল মারার শামিল। তবে বিএনপির এখন কোনো নির্দিষ্ট নেতৃত্ব নেই। কে যে কার নির্দেশে, কোথায় বসে, কী করে বোঝা মুশকিল। কোনটাতে দলের ভালো হবে, কোনটাতে খারাপ হবে সেটা তারা বোঝে কিনা সেটাও বলা মুশকিল। তবে বিএনপি আসলে আছে উভয়সঙ্কটে। যদি কিছু না করে, আমরা বলি, বিরোধী দলের কিছু করার সামর্থ্য নেই। আর যদি কিছু করে, তাহলে নাশকতা বলে গলা ফাটাই। আসলে আমরাও বুঝতে পারছি না বিএনপির আসলে কী করা উচিত, বিএনপি তো অনেক আগেই জানা বোঝার উর্ধ্বে উঠে গেছে। রাজনীতি আর নাশকতার পার্থক্যটা বুঝতে পারলে বিএনপির আজকের এই দশা হতো না।

বাসে আগুন দেয়ার দায় কেউ স্বীকার যেমন করছে না। আবার কারো দৃশ্যত লাভও নেই। এমন নয় যে ১১টা বাসে আগুন দিলেই সরকারের পতন ঘটবে, বিএনপি ক্ষমতায় চলে আসবে এমনও নয়। আওয়ামী লীগ যেমন নিশ্চিন্তে জাকিয়ে বসেছে, তাতে এইটুকু নাশকতা তাদের জন্য হাতির গায়ে পিঁপড়ার কামড়ের মত। তাই আপাতত মনে হতে পারে কারোই লাভ নেই। তবে ঘোলা পানিতে যে কেউ না কেউ মাছ শিকারের চেষ্টা করছে, সেটা পরিষ্কার। একটা মহল দেশের বাইরে বসে নানারকমের উস্কানি দিচ্ছে। তারা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যেই করুক অল্প সময়ের মধ্যে ব্যস্ত রাজধানীতে ১১টি বাস পুড়িয়ে দেয়া নাশকতা হলেও সুপরিকল্পিত। যেই করুক, পুলিশের দায়িত্ব তাদের খুঁজে বের করে সত্যিকারের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। আর কোনো অপশক্তি যেন দেশে অপতৎপরতা চালাতে না পারে, নজর রাখতে হবে সেদিকেও। আমরা রাজনীতি চাই, গণতন্ত্র চাই, সুষ্ঠু নির্বাচন চাই, ভোটাধিকার চাই; কিন্তু কোনো নাশকতা, দুর্বৃত্তপনা, অন্ধকারের শক্তির তৎপরতা চাই না।