রমজানের আমলগুলো সবসময় বাঁচিয়ে রাখি


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২০ - ০১:৪৯:২৬ অপরাহ্ন

আল্লাহ পাকের অপার কৃপায় মুসলিম উম্মাহ মহামারি করোনাকালেও বিশেষ ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে রমজান অতিবাহিত করার সৌভাগ্য পেয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ। রমজান শেষ হলেও একজন মুমিন তার ইবাদতে কখনই দুর্বলতা প্রকাশ করেন না বরং বছরজুড়ে রমজানের আমল জীবন্ত রাখবেন।

মানুষের জীবন জন্ম ও মৃত্যুশাসিত। এমন কেউ নেই যাকে মৃত্যু স্পর্শ করবে না। পবিত্র কুরআনে এসেছে-
‘প্রত্যেক আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৩৫)

মানুষ যেমন নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি, তেমনি নিজের ইচ্ছায় সে এ পৃথিবী ছেড়ে যেতেও পারে না। তাকে অবশ্যই আল্লাহ তাআলার অমোঘ নিয়তির নির্দেশ মানতে হবে। কিন্তু মানুষ ইচ্ছে করলে মৃত্যকে জয় করতে পারে আর সে বেঁচে থাকতে পারে যুগ যুগ ধরে।

যুগ যুগ বেঁচে থাকার জন্য তার বিশেষ কিছু কর্ম প্রয়োজন হবে। এমন কর্ম, যে কর্মের ধ্বংশ বা বিলয় নেই। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে মহামানবেরা যে অনন্ত জীবন লাভ করেছেন তাদের সেই পরিচয়ের মূলে রয়েছে তাদের কর্ম ও সৃষ্টি। মানুষের জন্য যারা কাজ করেন তারাই অমরত্ব লাভ করেন।

রমজানের এই দিনগুলোতে আমরা অনেক পুণ্যকর্ম করেছি, সেগুলোকে আমাদের জীবনের স্থায়ী রূপ দান করতে হবে। যদি আমরা এমনটি করি তাহলেই এই রমজান আমাদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ হবে।

আমরা যদি রমজানের পুণ্যকর্মগুলো নিজেদের মাঝে সারা বছর জীবিত রাখি তাহলে বছরজুড়েই আমরা আল্লাহর রহমতের চাদরে আবৃত থাকব। হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমআ থেকে আরেক জুমআ এবং এক রমজান থেকে আরেক রমজান মধ্যবর্তী সময়ের গোনাহগুলো মুছে দেয়, যদি সে কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।’ (মুসলিম)

আমরা দেখতে পাই, সেই আদিম ও গুহাবাসী পর্যায় থেকে মানুষ যে বর্তমান উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে তারও মূলে রয়েছে মানুষের কর্ম-সাফল্য।

অনেকেই মনে করেন, স্মরণীয় কীর্তি সবাই রেখে যেতে পারে না। ক্ষুধা, দারিদ্র, অনাহার-অর্ধাহারের মধ্যে যাদের দিন কাটে তাদের পক্ষে যুগান্তকারী কোনো কিছু সৃষ্টি সম্ভব নয়। আসলে এধরাণা সত্য নয়।

মানুষ যুগ যুগ বেঁচে থাকবে তার কর্মের ফলে, এমন কর্ম সমাজ থেকে আজ যেন উঠেই গেছে। আজ কারো কর্মের জন্য কেউ বেঁচে থাকে না। কারণ বর্তমানে এমন লোক পাওয়া খুবই দুষ্কর। যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করেন।

আজ আমরা সবাই নিজের স্বার্থের জন্য কাজ করি। মৃত্যুর পরও সবাই আমাদের স্মরণ করুক এটা আমরা চাই না। অর্থ-সম্পদের পাহাড় বানিয়েছি কিন্তু পাশের ঘরের লোকটি যে না খেয়ে আছে তার খোঁজ পর্যন্ত রাখছি না। রমজানের দিনগুলোতে যদিও কিছুটা খেয়াল রাখি, বছরের বাকি দিনগুলোতে একে অপরকে ভুলে যাই। হয়ে যাই পরস্পর অপরিচিত।

দুনিয়া মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার সব আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল অব্যাহত থাকে। হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষের মৃত্যুর পর তিনটি আমল ব্যতিত সব রকমের আমলই বন্ধ হয়ে যায়।
প্রথমত : সদকায়ে জারিয়া,
দ্বিতীয়ত : উপকারি ইলশ বা জ্ঞান,
তৃতীয়ত : এমন সুসন্তান, যে তার জন্য দোয়া করতে থাকে।’ (মুসলিম)

সদকায়ে জারিয়া
যার অর্থ এমন ধরনের জনকল্যাণকর কাজ ব্যয় হয়, যার সুফল বহু দিন পর্যন্ত চলতে থাকে। মানুষ এ কাজে উপকার পেয়ে থাকে। যেমন- পুকুর কাটা, কুপ খনন করা বা পরিস্কার পানির ব্যবস্থা করা, মুসাফিরদের জন্য সরাইখানা তৈরি করা, রাস্তার পাশে ছায়াদানকারী বৃক্ষ রোপন করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করে যাওয়া, রাস্তাঘাট নির্মাণ বা ব্রিজ-কালর্ভাট তৈরি করা

উপকারি জ্ঞান
এমন জ্ঞানমূলক বই-পুস্তক লেখা, যার মাধ্যমে লোকেরা সঠিক পথের সন্ধান লাভ করবে। কল্যাণের পথে পরিচালিত হবে। দুনিয়া ও পরকালের যাবতীয় জ্ঞান লাভে জীবন সাজাতে পারবে। কিংবা মৃতব্যক্তি কাউকে এমন কিছু শেখায় যে তার ফলেও সে প্রতিদান পেতে থাকবে।

নেক সন্তান
তৃতীয় যে কাজটির জন্য মৃত্যুর পরও সে প্রতিদান পেতে থাকবে তা হল তার নেক সন্তান। যাকে সে প্রথম থেকেই সুশিক্ষা প্রদান করেছে এবং তার চেষ্টার ফলেই সে আল্লাহভীরু ও দ্বীনদার হতে পেরেছে। যতদিন পর্যন্ত এমন নেক সন্তান দুনিয়ায় জীবিত থাকবে ততদিন পর্যন্ত তার কৃত সৎকাজের ছওয়াব সেও পেতে থাকবে। এমনকি সে সন্তান বাবা-মার কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে বলবে-
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণ : রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।’ (সুরা বনি ইসরাঈল : আয়াত ২৪)
অর্থ : হে আমার প্রভু! তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’

সুতরাং আমাদের রমজানের আমলগুলো যেন এমন হয় যে, রমজান পরবর্তী সময়ে সঠিকভাবে জীবন পরিচালনায় সহায়ক হয়। এমনকি মৃত্যুর পরও যেন তা আমাদের জন্য সাদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভূক্ত হয়।

আমাদের এ কথাও ভাবা উচিত, সদকায়ে জারিয়া হিসেবে আমরা কি রেখে যাচ্ছি? আমরাতো শুধু নিজের অহংকার আর আভিজাত্য নিয়েই ব্যস্ত, পরকালের কোনো চিন্তাই করি না। আমাদেরকে এমন কিছু করে যেতে হবে যাতে মরেও হতে পারি অমর। তাই এ কাজগুলো আমরা করে যেতে পারি। আর তাহলো-
– আগের চেয়ে আরও বেশি বাবা-মার সেবায় নিয়োজিত হব।
– প্রতিবেশির খোঁজ-খবর রাখব।
– অসহায়দের ঘরে ঈদের উপহার পৌঁছে দেব।
– বিপদ-আপদে অন্যের পাশে দাঁড়াব।
– অহংকার-দম্ভ পরিহার করব।
– সব পাপ কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখব।
– ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা অবলম্বন করব।
– অন্যের সম্পদ অধিগ্রহণ থেকে দূরে থাকব।
– সর্বাবস্থায় মিথ্যা পরিহার করব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন নেক আমল করার তাওফিক দান করুন, যার মাধ্যমে আমরা বেঁচে থাকব অনন্তর। আসুন, রমজানের নেক আমলগুলো বছরজুড়ে জীবন্ত রাখি, আর আল্লাহর সন্তুষ্টির চাদরে নিজেদের আবৃত রাখি। আমিন।