উত্তরা নিউজ উত্তরা নিউজ
অনলাইন রিপোর্ট


‘মা বলতেন, স্বপ্ন হলো বটফলের মতো: শুভেন্দু মাইতি






‘মা বলতেন, স্বপ্ন হলো বটফলের মতো। এর ভেতরে ছোট্ট ছোট্ট প্রচুর বীজ থাকে যা সোনামুখী সুঁচ দিয়েও আপনি তুলতে পারবেন না। কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত এক শক্তি আছে। একটু আশ্রয় পেলেই তা ওই পাহাড়ে হোক বা অরণ্যে হোক বেড়ে উঠবে। মানুষের স্বপ্নকেও ঠিক তেমনি আশ্রয় দিতে হয়। আশ্রয় পেলে সেটিও বড় হয়ে ওঠে।’

কথা ও গানে স্বপ্ন নিয়ে এমন দর্শনের কথা বলছিলেন প্রখ্যাত লোক ও গণসঙ্গীতশিল্পী শুভেন্দু মাইতি। শনিবার (২৭ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছায়ানট মিলনায়তনে কৃষ্টি ফাউন্ডেশনের আয়োজন ‘গানে গানে শুভেন্দু মাইতির সঙ্গে বাংলা গানের পরম্পরা’ শীর্ষক আয়োজনের প্রথম পর্বে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।

কথা বলার খানিক আগেই শুভেন্দু মাইতি কেবল হারমোনিয়াম নিয়ে গেয়ে শোনান- ‘স্বপ্ন দেখার সাহস করো/ স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে নাকি/ স্বপ্ন ছাড়া কেমন করে গান গাইবে পাখি’-কথার গান। হারমোনিয়াম থেকে হাত তুলে বলেন, ‘এই ৭৫ বছর বয়সেও আমি স্বপ্ন দেখি। আমি যেন সারাজীবন গান গাইতে পারি, গান গাইতে গাইতে আমার যেন মৃত্যু হয়, আমি সেই স্বপ্ন দেখি।’

এরপর কথামালায় শুভেন্দু মাইতি বলেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখি ৩২ কোটি বাঙালির সঙ্গে কুটুম্বিতা করতে। বাংলার সংস্কৃতি সারা পৃথিবীতে প্রশংসিত। সেটা সমগ্র জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে। এখন আমাদের সংস্কৃতি রক্ষার জন্য একটা ভূমি প্রয়োজন। তবে সেটা রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে। আকাশ আছে, সেটিও রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভেতর। তবে মহাকাশ আলাদা। সেখানে কারও মালিকানা নেই। বাঙালিকে সেই মহাকাশে জায়গা নিতে হবে। জায়গা নিয়ে বিশ্বের সব বাঙালিকে ওয়েব দুনিয়ার মধ্যে একত্রিত করতে হবে। একটা গানের টিভি চ্যানেল করতে হবে। এরজন্য সব বাঙালি যদি ১০ টাকা করেও দেয়, তবু ৩২০ কোটি টাকা। এটা হয়তো অসম্ভব, তবে আমি স্বপ্ন দেখি। এটা আমার উজ্জীবনী মন্ত্র, যা আমার শক্তিকে জাগিয়ে দেয়, আমার শক্তি সম্পর্কে আমাকে ধারণা দেয়।

চৌধুরীতিনি বলেন, ‘শেকড়ে পা রেখে বাংলাকে সারা পৃথিবীতে মেলে ধরতে হবে। রাষ্ট্র আজ ছিন্ন ভিন্ন, ছিন্ন ভিন্ন আকাশ। কিন্তু চিন্তনের ক্ষেত্রে বিশ্বের ৩২ কোটি বাঙালিকে এক জায়গায় আসতে হবে। আর বাংলাদেশ হবে তার কেন্দ্র। বাংলাদেশই বাঙালির নিজস্ব বাসভূমি যা তারা লড়াই করে অর্জন করেছে। বুদ্ধি, সৃজনে, মননে, চিন্তনে, সহনশীলতায়, দেশপ্রেমে, সমগ্র পৃথিবীতে বাঙালির মত আর কেউ নেই। সারা পৃথিবীর যেখানে যত বাঙালি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাদের উচিত বাড়িতে বাংলাটা বলা, লোকাচারটা ধরে রাখা, যেন অন্তত মায়ের পায়ে পা লাগলে শুধু ‘সরি’ না বলে লোকাচার রক্ষা করে তাকে প্রণাম করা হয়। তাহলেই আমাদের লোক সংস্কৃতি, লোকাচারটা জাগ্রত হবে সকল স্থানে।’

লোকসঙ্গীত প্রসঙ্গে এই সংগীতবিদ বলেন, ‘প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের যে লড়াই, তার অস্তিত্ব রক্ষার নাম হলো লোকসঙ্গীত। যেমন মাঝি যখন প্রকৃতির বিরুদ্ধে নদীতে দাঁড় টানে, তখন সে গেয়ে ওঠে- ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে’। লোক সংস্কৃতি হচ্ছে, আটপৌড়ে মায়ের মত। এটা স্টুডিওতে বসে সাজানো গান গাইবার জিনিস নয়।

আয়োজনের এক পর্যায়ে মঞ্চে আসেন অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার অনলাইন নিউজপোর্টাল বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের সম্পাদক জুয়েল মাজহার। তিনি বলেন, ‘আজকের এই সুন্দর সন্ধ্যায় শুভেন্দু দাদাকে পেয়ে গর্ববোধ করছি। বাংলা গানের জন্য এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে একটি একতারে বাজানোর জন্য তিনি যে ব্রত নিয়েছেন এটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমি মনে করি আমাদের সীমান্ত এবং কাঁটাতারের কোনো ভেদাভেদ নেই। রাষ্ট্র দ্বি-খণ্ডিত হলেও বাঙালির আত্মা এক। বিশ্বে বাঙালি যেখানেই থাকুক বাংলা ভাষার মধ্য দিয়ে আমরা সবাই সম্পৃক্ত। বাংলা ভাষা আমাদের এক করে রেখেছে এবং আগামীতেও রাখবে বলে আশা করি। আর এমন কার্যক্রম নিয়ে সামনে এগোনোর জন্য কৃষ্টি ফাউন্ডেশনকে অভিনন্দন জানাই।

রাজীন চৌধুরী তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের মানুষের দূরত্ব, বৈপরীত্য সব এক করে দিতে পারে সুর। যিনি সুর নিয়ে কাজ করেন তিনি সমগ্র অসুরের লম্ফঝম্প থেকেও দূরে থাকতে পারেন। গান আমাদের একটা একতারে নিয়ে যাবে, একই ছায়াতলে নিয়ে আসবে, একই মাতৃক্রোড়ে আমরা খেলা করবো, এই শুভকামনা।’

আয়োজনে শুভেন্দু মাইতিকে নিয়ে প্রচার করা হয় ১০ মিনিটের একটি বিশেষ তথ্যচিত্র। সেখানে তিনি কথা বলেন জীবনের বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার গান শেখা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি গান শিখেছি নগ্ন-রুগ্ন মানুষদের কাছে। তাদের কাছে শিখেছি কীভাবে গান গাইতে হয়, কাদের জন্য গান গাইতে হয়।’

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শুভেন্দু মাইতি বলেন, ‘আমরা তিনজন বন্ধু প্রতিদিন বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে গান করতাম। আর গামছা পেতে চাঁদা তুলে যা পেতাম, তা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পাঠাতাম। ১৬ ডিসেম্বর যখন চায়ের দোকানে বিজয়ের ঘোষণা শুনলাম, তখন তা ছড়িয়ে গিয়েছিল আমাদের হাজারো মানুষের মধ্যে। কেননা তা ছিল ভাষার জন্য যুদ্ধ।’

প্রামাণ্যচিত্রের পর আবার গানের পালা। এ পর্যায়ে ওপার বাংলার ভাদু গানের সুর ওঠে- ‘যখন একা থাকি দিশেহারা বড় অসহায় লাগে/সবার সাথে থাকি যখন গো বুকের ভিতর ঢেউ জাগে/ একা পথ হাঁটি যখন গো পথ ফুরতো চাই না যে/ আবার সবার সাথে হাঁটি যখন পায়ে চলার সুর বাজে’। গানে গানে শেষ হয় আয়োজনের প্রথম পর্ব। এ পর্বে দর্শকরাই গানে গানে কণ্ঠ মিলিয়ে বুঝিয়ে দেন সঙ্গীতের প্রতি তাদের অনুরাগ-ভালোবাসার কথা।

এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন কৃষ্টি ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বুলবুল মহলানবীশ ও সাধারণ সম্পাদক এনায়েত কবির।

উত্তরা নিউজ-