মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি আবদুল হাকিমের সাহিত্যচর্চা ও জীবনদর্শন


» উত্তরা নিউজ ডেস্ক জি.এম.টি | | সর্বশেষ আপডেট: ১৫ মে ২০২০ - ০৬:০২:৪০ অপরাহ্ন

মধ্যযুগে মুসলিম কবিদের মধ্যে শ্রেষ্টত্বের আসনে ছিলেন কবি আবদুল হাকিম।বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে যুগ যুগ ধরে।আবদুল হাকিম সপ্তদশ শতকের একজন স্বনামধন্য কবি।বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর সাহিত্য বিশেষ স্থান দখল করে আছে।সেকালে আরবি ও ফারসি ভাষার প্রাধান্য ছিল। এমনকি উৎকৃষ্ট সাহিত্যচর্চা হত ঐ দু’ভাষায়।বাংলা ভাষার প্রতি মানুষের ছিল চরম অবজ্ঞা। বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানি ভাষা বলে চরম অবহেলা করা হত। এ প্রবণতা মুসলিম সমাজে বেশি দেখা দিলে কবি আবদুল হাকিম ব্যথিত হৃদয়ে তা অনুভব করেন।তিনি মনে করতেন সকল ভাষা আল্লাহ প্রদত্ত।সুতরাং যার যার মাতৃভাষা তার তার কাছে দামি।

কবি আবদুল হাকিম আনুমানিক ১৬২০ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের অন্তর্গত সুধারাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতার নাম শাহ্ আবদুর রাজ্জাক।তাঁর পিতা তখনকার যুগে বড় আলেম ছিল বলে অনেক ঐতিহাসিকরা ধারণা করেছেন।কবির লেখা কখন থেকে শুরু তা কোন গ্রন্থেই পাওয়া যায়নি।কুমিল্লা থেকে বাখরগঞ্জ অঞ্চল পর্যন্ত কবির বিভিন্ন পুস্তকের পান্ডুলিপি পাওয়া গেছে।কিন্তু এগুলোর কোনটিতেই কবির জন্ম তারিখের সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই।

কবি ধর্ম দর্শনঃ কবি আব্দুল হাকিম ছিলেন একজন খোদাভীরু ও ধর্মপ্রাণ লোক।ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ইসলামের সঠিক দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন।ইসলামের সকল বিধি বিধান মেনে চলার চেষ্টা করতেন।আরবি,ফারসি ও বাংলা ভাষায় তার ছিল অগাধ জ্ঞান।তিনি যে ইসলাম প্রেমি ছিলেন তা তাঁর রচিত গ্রন্থে প্রকাশ পায়।তিনি সেই যুগে সুফি সাধক ও পীর সাহেব সাহাবুদ্দীন মুহাম্মদ এর অনুসারী ছিলেন।তাঁর কাছ থেকে ধর্মের দীক্ষা নিতেন।বাবা আলেম হওয়ার কারণে তিনিও ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।তাঁর চিন্তা, চেতনা মননে মিশে ছিল ইসলাম।তিনি ধর্মপ্রাণ ছিলেন তবে কুসংস্কারাপন্ন হননি।

সাহিত্যে আবদুল হাকিমের অবদানঃ তিনি আরবি, ফারসি,উর্দু ও বাংলা ভাষার পন্ডিত ছিলেন।যে যুগে বাংলা সাহিত্য রচনা এক প্রকার দোষের ছিল তখন তিনি বাংলা সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ।মাতৃভাষা বাংলার প্রতি কবির অপরিসীম দরদ ও ভালোবাসা কবিকে এদেশের বাংলাভাষী মানুষের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। মধ্যযুগে অনেকে মনে করত বাংলা “হিন্দুয়ানি” ভাষা। এই ভাষা মুসলমানদের নয় বলেও মনে করা হত।এ ভাষায় ইসলাম ধর্মের কথা লেখা,শোনা বা শোনানো মহাপাপ বলে পরিগণিত ছিল।এমনকি বাংলা ভাষায় গ্রন্থ রচনাকে হেয় দৃষ্টিতে দেখা হত।কবি ছিলেন এই মতবাদের ঘোরবিরধী। এরূপ চেতনা ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার ফলেই বাংলা ভাষার প্রতি মমত্ববোধ যেমন তাঁর কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে,তেমনি বাংলা ভাষা বিরোধীদের প্রতি আপসহীন মনোভাব ও চরম ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে।যারা বঙদেশে থাকার পরও বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করত,কবি তাদের জন্ম পরিচয় সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেছে। বাংলা ভাষার প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী এই কবির সর্বোৎকৃষ্ট রচনা” নূরনামা” কাব্যগ্রন্থে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জয়গান গেয়েছেন।

সে কবিতার একটি কালজয়ী কবিতা হলো ” বঙ্গবাণী। কবির ভাষায়– “যেই দেশে যেই বাক্যে কহে নরগণ। সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।। সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানি। বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।। আরবি,ফারসি ভাষার প্রতি কবির কোন বিদ্বেষ নেই।তিনি সেসব ভাষায়ও পারদর্শী ছিলেন।তাছাড়া আরবি ভাষায় কোরআন নাযিল হয়েছে, মহানবীর প্রশংসা করা হয়েছে বলে ঐ ভাষার প্রতি সবাই শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু যে ভাষা সাধারণ মানুষ বুঝে না,মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না,সেসব লোকদের জন্য মাতৃভাষাই প্রধান অবলম্বন হওয়া উচিত বলে কবি মনে করেন।কবি তাই তাদের জন্যে এ ভাষাতেই পুস্তক রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছেন। যারা বঙ্গদেশে জন্মগ্রহষ করে বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করে কবি তাদের জন্ম পরিচয় নিয়েও সন্দিহান।তাদেরকে দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

মাতাপিতামহের ভাষাকেই তিনি অত্যন্ত হিতকর বলে উল্লেখ করেছেন। কবির ভাষায়— “যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী। সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।” কবি আবদুর হাকিম মনে করতেন যে ভাষায় জনগণ কথা বলে,যে ভাষা তাদের বোঝার জন্য উপযুক্ত সে ভাষায় সাহিত্য রচনা করা প্রয়োজন।তিনি বলেন— ” আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ। দেশী ভাষে বুঝিত ললাটে পুরে ভাগ। কবি আবদুল হাকিম মধ্যযুগের কবি হলেও তাঁর কবিতার ভাষা ছিল অনেকটা সহজ, সরল,প্রাঞ্জল এবং ছন্দ লালিত্যময় কবি আবদুল হাকিম বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন।

তবে এই পর্যন্ত তাঁর নয়টি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে।সেগুলো হলো– নূরনামা,ইউসুফ জুলেখা লালমতী, নসীহতনামা, শিহাবুদ্দীননামা,চারি মাকাম ভেদ,কারবালা,শহরনামা,সয়ফুল মুলুক।মধ্যযুগে তিনি বাংলা সাহিত্য রচনায় আগ্রহী হওয়ার কারণে পরবর্তীতে মুসলমানরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কে আপন করে নিয়েছে।পরবর্তী মুসলিম কবিদের অবদানে বাংলা ভাষা যুগে যুগে সমৃদ্ধ হয়ে উঠে।মুসলিম রেঁনাসার কবি ফররুখ আহমদ এর মানসিকতার সাথে কবি আবদুল হাকিমের মানসিকতার মিল পাওয়া যায়।

আজকের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আবদুল হাকিমদের মত দেশপ্রেমিক কবিদের কারণে সমৃদ্ধি লাভ করেছে।অথচ আধুনিক যুগে এসে কবি অাবদুল হাকমিরে কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি।কবি আবদুল হাকিমের সাহিত্য চর্চা নিয়ে গবেষণা করা,অধ্যয়ন করা সময়ের দাবি।এই মহান কবি আনুমানিক ১৬৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

লেখকঃনুর আহমদ সিদ্দিকী