ভোটের লড়াই: দুই দলে নির্বাচনের হাওয়া


» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০১৯ - ১১:২৮:৩১ পূর্বাহ্ন

ফের ভোটের লড়াইয়ে মাঠে নামছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি। নতুন বছরের শুরুতেই ঢাকার দুই সিটিতে প্রধান এই দুই দলসহ অন্য দলগুলো ভোটযুদ্ধে মাঠে নামবে। গতকাল নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী জানুয়ারিতে ঢাকার দুই সিটি ভোট করার ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী লীগে দুই সিটিতে পুরনো দুই প্রার্থীই আলোচনায় রয়েছেন। আবার নতুন করে কেউ কেউ সিটি মেয়র প্রার্থী হতে তৎপরতা চালাচ্ছেন। বিএনপি এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, সিটিসহ সব নির্বাচনেই তারা অংশ নেবে। এর অংশ হিসেবে ঢাকার দুই সিটিতে তাদের প্রার্থীও চূড়ান্ত প্রায়। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডেও চলছে ভোট প্রস্তুতি। আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাড়াও বিভিন্ন দলের কাউন্সিলর প্রার্থীরা এরই মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজেদের প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন। কারও কারও পক্ষে সমর্থকরা পোস্টারও সাঁটাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও চলছে প্রার্থীদের পক্ষে নানামুখী প্রচারণা।

গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে কমিশন সভা হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিটি ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের বৈঠক হয়। ওইদিন কমিশন সভা মুলতবি করা হয়। গতকাল সকালে ওই মুলতবি সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব  মো. আলমগীর জানান, জানুয়ারির মাঝামাঝি বা শেষের দিকে একই দিনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ভোট করা হবে।

জয়ের ধারাবাহিকতা চায় আওয়ামী লীগ : আওয়ামী লীগ সূত্রমতে, দুই সিটিতে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। এ জন্য দলের নিবেদিত, নিজ এলাকায় সামাজিক কর্মকান্ডে  সম্পৃক্ত ও অধিকতর জনপ্রিয় এমন যোগ্য নেতা খুঁজছেন তারা। এ নিয়ে আওয়ামী লীগে বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা চলছে। মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী মোটামুটি চূড়ান্ত করে রেখেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন চলছে কাউন্সিলর প্রার্থীর বাছাই। এবার কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী মাঠে রাখবে ক্ষমতাসীন দলটি। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বর্তমান মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ছাড়াও অর্ধডজন নেতা মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন চান। এর মধ্যে সরকার দলীয় দুজন এমপি ছাড়াও কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতা রয়েছেন। একই অবস্থা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও। বর্তমান মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ছাড়াও অর্ধডজন নেতা নৌকা প্রতীক পেতে চান। এখানেও দুজন এমপি ছাড়াও একজন কেন্দ্রীয় নেতা আলোচনায় আছেন। গত সপ্তাহে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জের। এবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মাঠে থাকবে। মেয়র পদে কে প্রার্থী হবেন- সে সিদ্ধান্ত দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেবেন। কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী রাখতে হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বাছাইয়ের জরিপ শুরু করেছে। কে কোথায় জনপ্রিয়, দলের জন্য নিবেদিত তা খতিয়ে দেখছি। দায়িত্ব পালনে যারা যোগ্য ও সবার থেকে এগিয়ে থাকবে তারাই মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাবেন। কাউন্সিলরদের বিষয়েও জরিপ চলছে।’ তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলেই আমরা যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করব।’

প্রতিকূল পরিবেশেও সিটি ভোটে লড়বে বিএনপি : বিএনপি সূত্রে জানা যায়, প্রতিকূল পরিবেশেও আসন্ন ঢাকার দুই সিটি ভোটে লড়বে বিএনপি। দুই সিটির জন্য দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত পর্যায়ে। উত্তর সিটিতে বিএনপির আগের প্রার্থী তাবিথ আউয়ালকে এরই মধ্যে সংকেত দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণেও ‘সবুজ সংকেত’ দেওয়া হয়েছে নিউইয়র্কে অসুস্থ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনকে। সংকেত পেয়ে তারা এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৈঠক শুরু করেছেন। তবে সাদেক হোসেন খোকা গুরুতর অসুস্থ থাকায় বর্তমানে নিউইয়র্ক অবস্থান করছেন ইসরাক হোসেন।

জানা যায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে টেলিফোনে দুই সিটিতে তাবিথ ও ইশরাককে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। দুই সিটির সমস্যা ও এলাকার মানুষের সঙ্গে গণসংযোগ বাড়াতে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। বিএনপির তরুণ এই দুই নেতা নির্দেশিত হয়ে ডেঙ্গুসহ রাজধানীর চলমান সমস্যা নিয়ে কাজও শুরু করেছেন। তারা নেতা-কর্মীদের নিয়ে জনগণের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর শাখা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন এই দুই নেতা। এ ছাড়া সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গেও কথাবার্তা বলছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দুই সিটি ভোটের এখনো তফসিল হয়নি। আমরা এখন দল গোছানোর কাজ করছি। বিএনপি একটি উদারপন্থি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে সিটি নির্বাচনেও যেতে চায়। নানা প্রতিকূল পরিবেশেও নির্বাচন ও গণতন্ত্রের পক্ষে আমরা অবস্থান নিয়েছি। কিন্তু সরকার যেভাবে ভোট ডাকাতি করে জনমত ছিনিয়ে নিচ্ছে তাতে  ভোটের প্রতি সাধারণ মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।’

১৮ নভেম্বরের পর দুই সিটির তফসিল : ইসি সচিব আলমগীর বলেন, নভেম্বরের ১৮ তারিখের পর যে কোনো দিন এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। চলতি ভোটার তালিকা দিয়ে ইভিএমের মাধ্যমে এই দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ করা হবে। যেহেতু এখনো সময় হয়নি তাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মার্চের শেষ বা তার পরে নতুন ভোটার নিয়ে হালনাগাদ তালিকার মাধ্যমে এ সিটিতে ভোট হবে।

সিটি নির্বাচনে কোনো আইনি জটিলতা আছে কিনা এমন প্রশ্নে ইসি সচিব মো. আলমগীর বলেন, কোনো আইনি জটিলতা আমরা এখনো দেখছি না। ইভিএমের মাধ্যমে দুই সিটি ভোট চ্যালেঞ্জ মনে করছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ তো বটেই। তবে আমরা এ নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম। এ নির্বাচন আয়োজনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়েছেন বলেও জানান সচিব। ভোটের সময় ও ইভিএম নিয়ে কোনো দল আপত্তি জানালে তখন কী করবেন জানতে চাইলে সচিব বলেন, এ বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।

ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৬, ১৯, ২৩, ২৬ ও ৩০ জানুয়ারি ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ ধরে নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৪৫ দিন হাতে রেখে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে কমিশন। তফসিলের সম্ভাব্য তারিখ বিষয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৬ বা ১৯ জানুয়ারি ভোট হলে তফসিল হবে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে। আর ২৩ বা ২৬ জানুয়ারি ভোট হলে ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে তফসিল; ৩০ জানুয়ারি ভোট হলে ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণার চিন্তা রয়েছে কমিশনের। বিদ্যমান ভোটার তালিকা দিয়েই ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটিতে ভোট করা হবে। ভোট কেন্দ্রের তালিকা তৈরির কাজও চলছে। তবে আগামী ৭ নভেম্বর কমিশনের বৈঠকে ভোটের দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল একসঙ্গে ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়। নির্বাচনের পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয় ওই বছরের ১৪ মে, দক্ষিণ সিটিতে ১৭ মে ও চট্টগ্রাম সিটিতে প্রথম সভা হয় একই বছরের ৬ আগস্ট। সে হিসাবে আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকা উত্তর, ১৮ নভেম্বর ঢাকা দক্ষিণ এবং আগামী বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হচ্ছে। আর ঢাকা উত্তরের মেয়াদ শেষ হবে ২০২০ সালের ১৩ মে, দক্ষিণে একই বছরের ১৬ মে। আর চট্টগ্রাম সিটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২০ সালের জুলাইয়ে।

সূত্র: বিডি প্রতিদিন।