ভালোবাসা আল্লাহর করুণা -এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ - ০৯:২০:৪৬ অপরাহ্ন

ভালোবাসা মানবীয় গুণাবলির অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ গুণ। মানবীয় গুণাবলি বিকাশে ও উত্তম মনুষ্য চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন বা সুকুমারবৃত্তি অর্জনের মূলেও রয়েছে ভালোবাসা। মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসা মজ্জাগত ও স্বভাবজাত। এক্ষেত্রেও যদি আমরা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে পারি অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং নবীজির সুন্নত পালন উদ্দেশ্য হয়, তবে এ ভালোবাসাতেও আমরা আল্লাহর তরফ থেকে পাব অফুরন্ত পুরস্কার।

আমাদের সৃষ্টি করেছেন একমাত্র আল্লাহ। আমাদের রিজিক থেকে শুরু করে সব কিছুর মালিক আল্লাহ। তাই সবকিছুতে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে এটাই স্বাভাবিক। আর প্রত্যেক কাজ করতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। আল্লাহ তা‘আলা যখন বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে তখন আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করাও সম্ভব হবে। তাই একজন মুমিন বান্দার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা।

সর্বোত্তম আমল
আবু যর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “সর্বোত্তম আমল হচ্ছে, আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে অপছন্দ করা।” [সুনানে আবু দাউদ : ৪৫৯৯]

আল্লাহর ভালোবাসা
আল্লাহকে ভালোবাসার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতে হবে। ‘‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন।’’ [আলে ইমরান : ৩১]

রাসূলের ভালোবাসা
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান, পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ ও সব মানুষের অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত্র হই।” [সহীহ বুখারী : ১৫]

ঈমানের স্বাদ লাভ
হযরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যার মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকবে সে ঐ বৈশিষ্ট্যের কারণে ঈমানের স্বাদ লাভ করবে। সেগুলো হলো :

১. যার নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অন্য কিছুর চাইতে সবচেয়ে প্রিয় হবে।
২. যে ব্যক্তি কাউকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই ভালোবাসবে।
৩. যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগ্রহে কুফর থেকে মুক্তি লাভের পর পুরনায় কুফুরীতে ফিরে যাওয়াকে এভাবে অপছন্দ করবে, যেভাবে অগ্নিকু-ে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।” [সহীহ  বুখারী :অধ্যায়:  ঈমান  ১/১৪  হা: ১৬,  ১/১৬    হা:  ২১,৬০৪১,৬৯৪১]

আল্লাহর আরশের ছায়া দান
আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা সাত ব্যক্তিকে সেই দিনে তাঁর (আরশের) ছায়া দান করবেন যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না; (তারা হল,) ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ (রাষ্ট্রনেতা), সেই যুবক যার যৌবন আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে অতিবাহিত হয়, সেই ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদসমূহের সাথে লটকে থাকে (মসজিদের প্রতি তার মন সদা আকৃষ্ট থাকে।)

সেই দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা স্থাপন করে; যারা এই ভালোবাসার উপর মিলিত হয় এবং এই ভালোবাসার উপরেই চিরবিচ্ছিন্ন (তাদের মৃত্যু) হয়। সেই ব্যক্তি যাকে কোন কুলকামিনী সুন্দরী (অবৈধ যৌন-মিলনের উদ্দেশ্যে) আহ্বান করে, কিন্তু সে বলে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি।’ সেই ব্যক্তি যে দান করে গোপন করে; এমনকি তার ডান হাত যা প্রদান করে, তা তার বাম হাত পর্যন্তও জানতে পারে না। আর সেই ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে; ফলে তার উভয় চোখে অশ্রু বয়ে যায়।’’ [সহীহুল বুখারী: ৬৬০,১৪২৩, ৬৪৭৯, ৬৮০৬]

ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার না হবে, তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য স্থাপন করবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হবে? সাহাবী রাদিআল্লাহু তা‘আলা আনহুমগণ বললেন, নিশ্চয় রাসূলাল্লাহ। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের মধ্যে বহুল পরিমাণে সালামের প্রচলন কর।’’ [ইবনু মাজাহ : ৬৮,৩৬৯২]

নূরের মিম্বর
মু‘আয রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘আমার মর্যাদার ওয়াস্তে যারা আপোসে ভালবাসা স্থাপন করবে, তাদের (বসার) জন্য হবে নূরের মিম্বর; যা দেখে নবী ও শহীদগণ ঈর্ষা করবেন।’’ [তিরমিযী : ২৩৯০]

অবৈধ ভালোবাসা
সব জিনিসের বৈধ-অবৈধ ক্ষেত্র রয়েছে। ভালোবাসার বিষয়টি এর ব্যতিক্রম নয়। বিবাহপূর্ব ছেলেমেয়ের ভালোবাসা ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ ও অন্যায়। এতে চারিত্রিক পবিত্রতা বিনষ্ট হয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে অশান্তি ও বহুমুখী সংকট তৈরি হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘কোনো পুরুষ যখন পরনারীর সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ করে, তখন সেখানে তৃতীয়জন হিসেবে শয়তান উপস্থিত থাকে।’’ [তিরমিযী : ১১৭১]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘চোখের জেনা দেখা। মুখের জেনা কথা বলা। হাতের জেনা স্পর্শ করা। পায়ের জেনা তার দিকে চলা।’’ [বুখারী : ৬২৪৩]

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস
অনেকের ধারণা প্রাচীন রোমে ১৪ ফেব্রুারিকে রোমান দেব-দেবীর রানী জুনোর সম্মানে ছুটির দিন। জুনোকে নারী ও প্রেমের দেবী বলে লোকে বিশ্বাস করত। অনেকের মতে এটাই ছিল ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে একটি বার্ষিক উৎসবের দিন যা ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা এবং অনুরাগের মধ্যে উদযাপিত হয়। দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হয়ে থাকে।

২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স নামে একজন খ্রিস্টান পাদ্রি ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচার-অভিযোগে তৎকালীন রোমান স¤্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দি করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দি অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন।

এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদ- দেন। সেই দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল। বর্তমানে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালনের যে অপসংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা যুবসমাজকে অন্যায়ের পথে ঠেলে দিচ্ছে। দিবসটির কুপ্রভাব দিন দিন এতই বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, সমাজ থেকে বিদায় নিচ্ছে লজ্জা-শরম, শালীনতা ও নীতিবোধ। মূলত মুসলমানদের চরিত্র বিনষ্ট করার অসৎ উদ্দেশ্যেই দিবসটি আমদানি করা হয়েছে। তাই আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য এ অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

ভালবাসা কোন পর্বীয় বিষয় নয়। এটি মানব জীবনের সুখ-শান্তির জন্য একটি জরুরি সার্বক্ষণিক মানবিক উপাদান। সুতরাং আমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দ বৃদ্ধির জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক