ভারতীয় মুসলিমদের সামনে মহা দুর্দিন

এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ - ০২:৪৮:২৮ অপরাহ্ন

দিল্লিতে নাগরিকত্ব সংশোধন বিরোধী আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছে। বেছে বেছে মুসলিমদের মসজিদ, দোকান-পাট ও বাড়িঘরের ওপর হামলা ও লুটপাট চালানো হচ্ছে। আক্রান্ত এলাকার মুসলিমরা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেছেন, সোমবার শুরু হওয়া এই সংঘাতে বেছে বেছে মুসলিমদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

মসজিদ বা অন্য কোন ধর্মের উপাসনালয় ধ্বংস করা কোন কালেই এবং কোন দেশেই সভ্যকর্ম রূপে বিবেচিত হয়নি। সভ্যকর্ম রূপে বিবেচিত হয়নি কোন একটি ধর্মের অনুসারিদের হত্যা করা, তাদের মহিলাদের ধর্ষণ করা এবং শিশুদের আগুণে ফেলে উল্লাস করা। এটিও কোন সভ্য কর্ম নয় যে, কে গরুর মাংস খেলো বা কে শুকর বা শাপ খেলো তার ভিত্তিতে রাস্তায় পিটিয়ে কাউকে হত্যা করা। এরূপ হত্যাকান্ড চিরকালই বিবেচিত হয়েছে অতিশয় বর্বর ও অসভ্য কর্ম রূপে। অথচ এরূপ অসভ্য ও বর্বর কর্মগুলি ভারতে নিয়মিত উৎসবভরে হচ্ছে।

এরূপ অসভ্যতা ভারতে যে কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তারই প্রমাণ হলো, এ বর্বরতা নিছক কোন দলের দুর্বৃত্ত নেতাকর্মীদের মাঝে সীমিত নেই। বরং সেটি ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠির মাঝে। ফলে মসজিদ ভাঙ্গার ন্যায় বর্বর কর্মটি কোথাও শুরু হলে সে অসভ্যতাটিও লাখ লাখ মানুষের উৎসবে পরিণত হয়। ১৯৯২ সালে সেরূপ একটি উৎসব দেখা গেছে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসকালে। লক্ষ্যণীয় হলো, মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুদের হত্যা এবং মহিলাদের ধর্ষণের লক্ষ্যে কোন শহরে মুসলিম জনবসতির উপর হামলা শুরু হলে সেখানেও লাখ লাখ হিন্দুর ঢল নামে। যেন সেটিও একটি পবিত্র কর্ম।

১৮৮৩ সালে আসামের নেলীতে, ১৯৯২ সালে মুম্বাইয়ে, ২০০২ সালে গুজরাতে এবং ২০১৩ সালে উত্তর প্রদেশের মুজাফ্ফর নগরে তো সেটিই হয়েছে। সে অসভ্য বর্বরতায় অপরাধীদের পূর্ণ সুযোগ দিতে পুলিশ, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সেনবাহিনীও সচরাচর ঘটনাস্থল থেকে পরিকল্পিত ভাবেই অদৃশ্য থেকেছে। যেন তারা কিছু দেখেনি এবং শুনেনি।

মূল সমস্যাটি তাই শুধু অসভ্য অপরাধ কর্মগুলিতে বিপুল সংখ্যক হিন্দুর অংশ গ্রহণ নয়, বরং সে বর্বর কর্মগুলিকে ঘৃণা না করে সর্বমহলে সেগুলিকে পবিত্র জ্ঞান করা।
ভারতীয় মুসলিমদের দুশ্চিন্তা এতটাই বেড়েছে যে, মায়েরা তাদের সন্তানদের মাথায় টুপি দিয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করে এ ভয়ে যে, বজরং দল, বিজিপি, আর.এস.এস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের গুন্ডারা পথে তাদের পিটিয়ে লাশ বানিয়ে ফেলবে। কিছু দিন আগে কলকাতার মুসলিম মেয়র ফিরহাদ হাকিম এমন একটি পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন তার এক বক্তৃতাতে। মুসলিম ব্যবসায়ীগণ হাটে গরু বেঁচতে যেতেও ভয় পায়, না জানি গো-রক্ষক ভলেন্টেয়ারেরা পথে তাদের হত্যা করে ফেলে। কারণ, এগুলিই তো অহরহ হচ্ছে। লক্ষণীয় হলো, যে নৃশংস অসভ্যতার শিকার হচ্ছে মুসলিম নর-নারী ও শিশুগণ, তা থেকে এখন বাদ পড়ছে না ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদগুলিও।

২০১৪ এবং ২০১৯ সালে নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপি)র বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার কারণটি এ নয় যে, দলটি ক্ষমতায় এসে ভারত থেকে দারিদ্র্য দূর করেছে। বরং বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ভারতে দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিজিপির জনপ্রিয়তার মূল কারণটি অন্যত্র। সেটি ভারতীয় হিন্দুদের মাঝে চরম মুসলিম বিদ্বেষ সৃষ্টিতে দলটির সফলতা। যে রাজনৈতিক দলটি মুসলিম নির্মূল ও মসজিদ নির্মূলে অধীকতর নৃশংস হওয়ার দৃষ্টান্ত রাখছে -ভারতীয় হিন্দুগণ সে দলকেই বিপুল ভোটে বিজয়ী করছে।

সমগ্র ভারত জুড়ে হিন্দুদের মাঝে এরূপ মুসলিম বিদ্বেষের কারণেই গুজরাতের মুসলিম গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদি আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনে বিজিপির পক্ষে জোয়ার সৃষ্টির আরো কারণ, এ দলটিই নেতৃত্ব দিয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর প্রায় ৫ শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদটিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার কাজে। এবং ১৯৯২ সালে ও ২০০২ সালে নেতৃত্ব দিয়েছিল যথাক্রমে মুম্বাই ও গুজরাতে মুসলিম গণহত্যায়।

ভারতীয় মুসলিমদের জন্য ভয়ানক বিপদ এজন্যও যে, মুসলিম নির্মূল এবং মসজিদ নির্মূলের নৃশংস চেতনাটি শুধু বিজিপি,আর.এস.এস, শিব সেনা, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দলের গুন্ডাদের মাঝে সীমিত নয়। ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের মাঝেও। এবং সেটিরই সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া যায় সুপ্রিম কোর্টের গত ৯ নভেম্বরের রায়ে। ২৭ বছর আগে যে অপরাধকর্মটি অপরাধ রূপে গণ্য হয়েছিল এখন সেটি আর অপরাধ থাকছে না।

ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস প্রায় ৭ শত বছরের। দীর্ঘকালীন এ মুসলিম শাসনের পরও ভারতে যত মসজিদ তার চেয়ে বহুগুণ হলো মন্দিরের সংখ্যা। মন্দির ভাঙ্গা লক্ষ্য হলে বহু আধা ভাঙ্গা, আংশিক ভাঙ্গা ও ক্ষতবিক্ষত মন্দিরও দেখা যেত। প্রশ্ন হলো, সারা ভারত জুড়ে যে অসংখ্য বিশাল মাপের পুরোন মন্দির এখনো বিদ্যমান -তার কোন একটিও কি আধা বা আংশিক ভাঙ্গা? কোন একটি মন্দিরের গায়েও দেখা যায় কি মুসলিমদের পক্ষ থেকে নিক্ষিপ্ত গোলা বা কামানের দাগ?

মুসলিমগণ ভারত শাসন করেছে হিন্দুদের সহযোগিতা নিয়ে। মানসিংয়ের ন্যায় মুসলিম শাসকদের দরবারে বহু হিন্দু যেমন জেনারেল হয়েছে, তেমনি মন্ত্রী এবং উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক অফিসারও হয়েছে। মুসলিম রাজপুত্রদের সাথে তারা নিজেদের কন্যাদেরও বিয়ে দিয়েছে। তাদের সে সহযোগিতার কারণেই মুসলিম শাসন দীর্ঘকাল স্থায়ী হতে পেরেছে। আরো লক্ষ্যণীয় হলো, ভারতের সম্পদ পূর্ব-পুরুষদের দেশে নিয়ে সেখানে তারা তাজমহল বা প্রাসাদ গড়েনি। যা কিছু করার তারা ভারতেই করেছে। ইংরেজদের ন্যায় ভারতকে তারা ঔপনিবেশিক কলোনী মনে করেনি, বরং নিজের দেশ মনে করেছে। এদেশের প্রতিরক্ষায় তারা প্রাণ দিয়েছে।

ভারতীয় হিন্দুগণ অতীতে যেমন বৌদ্ধদের নির্মূল করেছে, এখন নির্মূল করতে চায় মুসলিমদের। ফলে তাদের লক্ষ্য শুধু মসজিদ নির্মূল নয়, মুসলিম নারী, পুরুষ এবং শিশু নির্মূলও। মুসলিম নির্মূলের লক্ষ্যে যে প্রকল্পগুলি ভারতে চলছে তা হলো : এক). দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিম নির্মূল, দুই). ন্যাশনাল রেকর্ড অব সিটিজেন (এন, আর.সি) প্রকল্পের নামে মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া।

ইতিমধ্যে আসামে ১৯ লাখ লোককে নাগরিকত্বহীন করা হয়েছে। একই প্রকল্প বাস্তবায়ীত করতে চায় সারা ভারত জুড়ে। পশ্চিম বাংলা বিজিপি’র সভাপতি দিলিপ ঘোষের দাবী, পশ্চিম বাংলার ২ কোটি মানুষ ভারতীয় নাগরিকের তালিকা থেকে বাদ পড়বে। এর অর্থ হলো, তাদের পাঠানো হবে বাংলাদেশে। তিন). মুসলিমদের হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা। এটিকে তারা বলছে “ঘর ওয়াপসি” -যার অর্থ হলো হিন্দুধর্ম থেকে মুসলিম হওয়া মুসলিমদের আবার হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে নেওয়া। চার). কালচারাল কনভার্শন। এ প্রকল্পের অর্থ হলো হিন্দু ছেলে বা হিন্দু মেয়েদের সাথে বিবাহের মধ্য দিয়ে করে হিন্দু সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়া।

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন করতে চাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মজলিশ-ই-ইত্তেহাদুল-মুসলেমিন’ (মিম) প্রধান ব্যারিস্টার আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এমপি। তিনি এক টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের পরে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি এনআরসি আসবে, এরমধ্যে ‘যারা মুসলিম নয়’ তাঁরা সকলেই নাগরিকত্ব পাবে। এবং মুসলিমদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নয় বরং রাষ্ট্রহীন করতে চাচ্ছে।

২০ কোটি ভারতীয় মুসলিমদের সামনে আজ তাই মহা দুর্দিন। তবে এ দুর্দিনের মোকাবেলা তাদের নিজেদেরই সচেষ্ট হতে হবে। আর সে জন্য অপরিহার্য হৃদয়ে পবিত্র কোর’আনের শিক্ষা অর্জন করে নির্ভেজাল মুসলিম পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠতে হবে। মুসলিমদের মনে রাখতে ভারত তাদের দেশ। আর নিজ দেশে বসবাসের অধিকার সবার রয়েছে। এটা ভারতীয় সরকারকে বুঝাতে হবে। আর বিশ্ব মুসলিমের উচিত, ভারতীয় মুসলিম পাশে দাড়ানো। ভারতীয় হিন্দুদের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করা। সর্বপরি ভারতীয় মুসলিম ভাইদের জন্য দু‘আ করা। আল্লাহ তা‘আলা বিশ্বের সকল মুসলিমদের হিফযাত করুন।