ভারতীয় চোরাই চা-পাতায় সয়লাব সীমান্ত উপজেলা চুনারুঘাট

চোরাকারবারীরা বরাবরই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে

» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০১৯ - ০৯:২৩:১৩ অপরাহ্ন

নিম্নমানের ভারতীয় চোরাই চা-পাতায় সয়লাব সীমান্ত উপজেলা চুনারুঘাট। সীমান্তের  বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই আসছে বড় বড় চালান। মাঝে মাঝে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র  অভিযানে কিছু চোরাই চা-পাতা জব্দ হলেও চোরাকারবারীরা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ফলে ভারতীয় এসব নিম্নমানের চা-পাতার কবলে দেশীয় চা-শিল্প এখন হুমকির মুখে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চুনারুঘাট সীমান্তের ৪ টি পয়েন্ট দিয়ে প্রায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার কেজি চা-পাতা দেশে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে আসামপাড়ার গুইবিল সীমান্তের প্রহরমোড়া, চিমটিবিল সীমান্তের টেংরাবাড়ি ও সাতছড়ি সীমান্তের গহীন বনাঞ্চল দিয়ে বড় বড় চালান দেশে প্রবেশ করছে। বিজিবি’র হিসেবেই গত দেড় মাসে জব্দ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কেজি চা-পাতা। এর মধ্যে গত ৮ সেপ্টেম্বর ৪ হাজার কেজি, ২৮ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার কেজি ও ১৭ অক্টোবর ১২০ কেজি ভারতীয় চা-পাতা জব্দ করা হয়। তবে এ পরিসংখান নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।

আসামপাড়া সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ফরিদ মিয়া জানান, বিজিবি’র দেয়া এ পরিসংখান সঠিক নয়। বাস্তবে জব্দের পরিমান দ্বিগুনও হতে পারে। এ অবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জব্দকৃত চা-পাতা তাহলে যায় কোথায়? অভিযোগ রয়েছে, চোরাকারবারীদের নেতৃত্বে আছে স্থানীয় কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছে উপজেলার আমতলি এলাকার কামাল ও লিটন এবং কালিশিরি গ্রামের মিলন ও সুমন। এরা চিমটিবিল ও সাতছড়ি সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত নিয়ে আসছে বড় বড় চালান। এছাড়াও গুইবিল সীমান্তে বাবলু মিয়া, নালুয়া চা-বাগান সীমান্তে উত্তম, আশিক, রহিম এবং আহম্মদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাখন মিয়া অপর দুটি সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস নেই কারো। চোরাই এ পেশার সাথে কমপক্ষে ২ শতাধিক স্থানীয় লোক জড়িত। শুধু তাই নয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নামে স্থানীয় একাধিক  জনপ্রতিনিধি চোরাকারবারীদের কাছে থেকে নির্দিষ্ট হারে বখরা আদায় করে থাকেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চোরাই চা-পাতার মধ্যে রয়েছে দুর্গাবাড়ি গোল্ড, সিটি-১, সিটি ডাস্ট, আর ডি-১ ও পি-ই ব্রান্ড। ভারতীয় কোম্পানির বস্তা ভর্তি চা-পাতা এনে প্রথমে চিমটিবিল ও গুইবিল এলাকার গোপন আড়তে মজুত করা হয়। এরপর স্থানীয় বখরাখোরদের নির্দিষ্ট হারে টোল প্রদান করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও টমটম করে সেই চা-পাতা চলে যায় চুনারুঘাট সদরে। সেখান থেকে ট্রাকযোগে চালান করা হয় চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

সূত্র জানায়, চোরাই পথে ভারত থেকে আসা চা-পাতা গুলো খুবই নিম্নমানের। এসব চা-পাতার অধিকাংশই পানের অযোগ্য। যে কারনে বেশিরভাগই কাপড়ের রং এর কাজে ব্যবহৃত হয়। চোরাকারবারীরা নিরাপদ রোড হিসেবে প্রধানত ‘চিমটিবিল-টু-আমু চা-বাগান সড়ক’, ‘আমু চা-বাগান-টু-কালিশিরি সড়ক’ এবং ‘আমু চা-বাগান-টু-আমুরোড সড়ক’কে ব্যবহার করে থাকে।

এ ব্যাপারে তেলিয়াপাড়া চা-বাগান ম্যানেজার এমদাদুল হোসেন জানান, ভারত থেকে চোরাই পথে যে চা-পাতা আসে তা একেবারেই নিম্নমানের। এসব চা-পাতার চা-পান করলে পাতলা পায়খানাসহ মানবদেহে সাময়িক ও দীর্ঘ মেয়াদী নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। তিনি আরো জানান, চোরাই চা-পাতার কারণে তাদের কারখানায় উৎপাদিত চা-পাতার দামও কমে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে দেশীয় চা-শিল্প। পাশাপাশি সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমান রাজস্ব। বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো তৎপরতাই তারা দেখতে পাচ্ছেন না। যদিও বিষয়টি নিয়ে ইতিপূর্বে চুনারুঘাট উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

চন্ডিছড়া চা-বাগান ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম জানান, চোরাই পথে আসা ভারতীয় নিম্নমানের চা-পাতার কারনে কমে গেছে দেশীয় চা-পাতার চাহিদা। আগে যে চা-পাতা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হত, তা এখন বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় দেশীয় বাগান গুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

জানতে চাইলে গুইবিল সীমান্তের দায়িত্বে থাকা বিজিবি’র বি.ও.পি কমান্ডার মাহবুবুর রহমান জানান, তাদের নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর অভিযানে ১২০ কেজি চা-পাতা জব্দ করা হয়। তিনি আরো জানান, সীমিত জনবল দিয়ে দূর্গম পাহাড় ঘেরা বিশাল অঞ্চল পাহাড়া দিতে হয়। যেকারনে মাঝে মাঝে চোরাকারবারীরা সুযোগ বুঝে তৎপর হয়ে উঠে।

বিজিবি ৫৫ ব্যটালিয়নের লেঃ কর্নেল জাহিদুর রশীদ জানান, সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় কাজ করছে বিজিবি। শুধু চা-পাতা নয়, সব ধরণের চোরাচালান বন্ধে তিল পরিমানও ছাড় দেয়া হচ্ছে না। তবে এ কাজে স্থানীয় জনগণের সহযোগীতা প্রয়োজন।

উত্তরা নিউজ/এস,এম,জেড