ভাঙ্গা স্বপ্ন | নুর আহমেদ সিদ্দিকী


» উত্তরা নিউজ টোয়েন্টিফর, ডেস্ক রিপোর্ট | | সর্বশেষ আপডেট: ০১ জুন ২০২০ - ০৭:৫৯:৫৯ অপরাহ্ন

হাঁটতে হাঁটতে চিন্তারাজ্যে হারিয়ে গেল নাফিজা।বয়স একুশ পেরিয়ে যাচ্ছে তবুও বিয়ের কোন নাম গন্ধ তার নেই।শৈশব থেকে, কৈশোর, কৈশোর থেকে ভরা যৌবনে এসে দাঁড়িয়েছে।অনার্স শেষ করে বিয়ের কথা ভেবেছিল মা আয়েশা বেগম।নাফিজা মাকে একা ফেলে বিয়ের কথা ভাবতেই পারে না।

নাফিজা অাকাশ ছুঁয়ার স্বপ্নে বিভোর।ছোট বেলা থেকে ছটপটে, ঝটপটে নাফিজার ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকত হাসির ঝিলিক।মনেই হয়না তার মনে কোন দুঃখ আছে।স্কুল জীবন শেষ করে কলেজে পড়াবে সেই সামর্থ তার মায়ের ছিল না। পড়ালেখার ইতি টানতে হবে ভাবতেই হৃদয়টা হু হু করে কেঁদে উঠে।মাথার উপর যেন সাত আসমান ভেঙ্গে পড়েছে।দু’দিন সে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।মহাল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে নাফিজা টাকার অভাবে কলেজে পড়তে পারছেনা।

কথাটি রহিম মোল্লার কানে যায়।পর দিন সকালে রহিম মোল্লা নাফিজাদের বাড়িতে যান।নাফিজার কথা শুনে তিনি ব্যথিত হন। অাশ্বাস দেন, তিনি নাফিজার পড়ালেখার খরচ চালাবেন।দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে রহিম মোল্লা বলেন,আজ আমার মেয়ে নাদিয়া থাকলে তার জন্যে পড়ালেখার খরচ দিতে হত।সেই খরচ না হয় তুকে দেব।এই কথা বলতে দেরি কিন্তু তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে দেরি নেই। নাফিজা উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল,চাচা আপনি কাঁদছেন? রহমি মোল্লা মিছামিছি অশ্রু লুকাতে গিয়েও ব্যর্থ হয়।নাদিয়া,নাফিজার বান্ধবী ছিল।

সেই শিশু শ্রেণি থেকে তারা একই সাথে এবং একই স্কুলে পড়ালেখা করে আসছে।অষ্টম শ্রেণি তথা জে এস সি পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ হওয়ার আগের দিন ডেঙ্গুজ্বরে অাক্রান্ত হয়ে মারা যায়।রহিম মোল্লা,তাঁর একমাত্র মেয়ে নাদিয়াকে হারিয়ে কেমন যেন নির্বাক হয়ে

ঝে মাঝে তাবলীগে যায়।যেসব জায়গায় মাহফিল হয় তিনি সেখানে চলে যান।মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু তাকে পাল্টে দিয়েছে। যা হোক,নাফিজা তাঁর সহযোগিতায় কলেজ জীবন শেষ করেছে।পড়ালেখাে পাশাপাশি ইন্টামিডিয়েটে সে তিনটা টিউশন করাত।তা দিয়ে মায়ের ঔষুধ আর ঘর সংসারের খরচ হয়ে যেত।নাফিজার বয়স যখন তিন বছর তখন তার বাবা গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যান।তাঁর বাবা দুই বিয়ে করেছে।আগের স্ত্রী মারা যাওয়ায়,নাফিজার মাকে বিয়ে করেন। নাফিজার তিন সৎ ভাই রয়েছে।তাদের বিষয় সম্পত্তির অভাব নেই।কারণ ছলে বলে কৌশলে তারা সব সম্পত্তি তাদের নামে করে নিয়েছে।বাবার স্মৃতি হিসেবে একটি কক্ষ আর একটি জীর্ণশীর্ণ রান্না ঘর আছে।এটাই তাদের সম্পদ।

সৎ ভাইরা পাকা বাড়িতে রাজার হালতে বসাবস করলেও নাফিজা ও মা অনাহারে- অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে।বাবার সকল সম্পত্তি থেকে নাফিজাকে মাহরুম করেছে তারা।মা আয়েশা বেগম তাদের পাকা বাড়ির দিকে তাকিয়ে অশ্রুবিসর্জন দেয়। কষ্টের সাগরে যে ডুবে আছে তার কাছে কষ্ট কিছুই না।উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ পেয়ে পুরো ঢাকা বিভাগে নাফিজা প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করে।পড়ালেখার প্রতি তার স্পৃহা অারো বেড়ে গেল।প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক স্বর্ণপদক অর্জন করে পুরো এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেন সে।বিশ কেজি মিষ্টি নিজের টাকায় কিনে নাফিজাকে সাথে নিয়ে বিতরণ করেন রহিম মোল্লা।এই যেন,নিজের মেয়ের খুশিতে তিনি আত্মহারা।

নাফিজাও তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করে।নাফিজার এমন ফলাফল আর খ্যাতি তাঁর সৎ ভাই ও বউরা সহ্য করতে পারেনি।তাই সুযোগ খুঁজে নাফিজার চরিত্রে কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে অঙ্কুরে বিনষ্ট করার। একদিন বড় ভাই নাহিয়ানের স্ত্রী এলাকার কিছু গুন্ডা বদমাইশদের ভাড়া করে রাখে।তাদের শিখিয়ে দেয রাতে নাফিজার ঘরে ঢুকে তার ইজ্জত নষ্ট করতে।যেমন কথা তেমন কাজ।রাত তখন দু’টা ছুঁই ছুঁই।

প্রথমে তারা দরজায় ধাক্কা দেয়।নাফিজা ভেতর থেকে কে কে বলে চিৎকার করেও কোন সাড়া পায়নি।এভাবে তিন চার দরজা ধাক্কানোর পর নাফিজা দরজা খুলে।দরজা খুলতেই নাফিজার মুখ চেপে ধরে টেনে হেঁছড়ে রাস্তায় নিয়ে আসে।নাফিজা তার মনোবল হারায়নি। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে যাতে নিজের ইজ্জত রক্ষা করতে পারে।হঠাৎ পাশে মেয়েকে না দেখে চিৎকার করতে করতে ঘরের বাইরে আসে তার মা।কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেয়ে ডাকছে শুনে অাশ পাশের লোকজন ঘর থেকে বের হয়।এদিকে নাফিজা তিন বদমাইশের সাথে একাই লড়ছে।

হঠাৎ পুরুষের চিৎকার শুনে সবাই বাড়ির সামনের রাস্তায় আসে।দেখে,দুই জন লোক নাফিজাকে টানাটানি করছে আরেকজন মাটিতে গড়াগড়ি করছে।সবাই সেই তিন বদমাইশকে ঘিরে ফেলে।জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে আসল রহস্য।বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সেই ঘৃণিত কাজের জন্য গ্রামবাসী তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে গেছে।

চারদিকে জানাজানি হলে বিভিন্ন জায়গা থেকে সাংবাদিকরা এসে নাফিজার বাড়িতে ভীড় করর।নাফিজা সাংবাদিকদের সত্যটা তুলে ধরেন।তাদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করাসহ সব সত্য প্রকাশ করে দেন।পরদিন দেশের প্রথম সারির জাতীয় পত্রিকায় শিরোনাম হয়”নাফিজাকে ঠেকাতে সৎ ভাইয়ের স্ত্রীর পাতানে ফাঁদ।কয়েকটি পত্রিকার শিরোনাম হলে”সৎ মায়ের সম্পত্তির জবরদখল।অবশেষে নাফিজা তার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি পুনরায় ফিরে পায়।সম্পত্তি অার্তসাৎ এর দায়ে তিন ভাইকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।সোনার সংসার ভেঙ্গে তনছন হয়ে যায়।অতি লোভ আজ তাদের জন্য যেন শনিরদশা।

নাফিজার মাস্টার্স শেষ হয়েছে।সংসারে যেন সুখের পায়রার আগমন ঘটেছে।মা মেয়ের সুখের সংসার। ঠিকমত নাওয়া খাওয়া আর কিছুটা টেনশনমুক্ত হওয়ায় অায়েশা বেগমের মেজাজ এখন ফুরফুরে। নাফিজা বাড়ির পাশের মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করছে।সারা দিন কাটে ব্যস্ততার মাঝে।পূর্ণ যৌবনে এসেও বিয়ের কথা ভাবতে পারছেনা।সে বিয়ে করলে মায়ের কি হবে এ কথা ভেবে অনেক প্রস্তাব সে নাকছ করে দিয়েছে।মা কত করে বুঝায় তাতে সে বুঝেনা।মায়ের কোন চিন্তা নেই।মেয়েকে সুপাত্রের হাতে সোপর্দ করতে পারলেই যেন মরেও সুখ।নাফিজার মন আজ বেশ ফুরফুরে।কোন সুসংবাদ আসার আগে তার এমন অনুভূতি হয়।

কত যাতনা সয়ে আজ স্বপ্ন জয়ের পথে সে কথা ভাবতেই দু’চোখ বেয়ে অশ্রুঝরে ঝরনাধারার ন্যায়।বাবার আদর বঞ্চিত মেয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছে।লোকে বলে অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর।ইতোমধ্যে রহিম মোল্লাও মারা গেছে।গত বছর বরিশালে চরমোনাই হুজুরের মাহফিল থেকে অাসার পর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শেষে উচ্চস্বরে জিকির করত।এলাকার সবাইকে জড়ো করে একত্র জিকির শুরু করে দিত।গেল রমজানে রোজা রেখে জোহর নামাজে সিজদারত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। এশার নামাজ পড়ে মোনাজাত করছে নাফিজা।হঠাৎ মোবাইলে অজানা নম্বর থেকে ফোন আসলে রিসিভ করতেই অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসল, কংগ্রেজুলেশন নাফিজা!” তুমি বিসিএস ভাইবা পরীক্ষায় টপ অপ দ্যা কান্ট্রি।

নাফিজা বিশ্বাসই করতে পারছিলনা সে বিসিএসে প্রথম হবে।মা কে জড়িয়ে ধরে সেই কি খুশি।মা কে বললো,আজকে তুমি যা চাইবে তা দিব ইনশাঅাল্লাহ।মা, মেয়ের আনন্দ দেখে অশ্রু ধরে রাখতে পারেনি।মা বললো,আমি চাই তোর বিয়ে দিতে।নাফিজা,ঈসৎ বিচলিত হয়ে বললো বিয়ে করব,তবে শর্ত আছে।ছেলেকে আমাদের বাড়িতে থাকতে হবে।আমার প্রাণ গেলেও তোমাকে একা রেখে শ্বাশুর বাড়িতে যাবনা।ঠিক আছে সেটাই হোক।সে রাতে মা ও মেয়ে সফলতার জন্য শুকরিয়া স্বরূপ দুই রাকাত করে শুকরিয়ার নামাজ আদায় করেন।গল্প গল্প করতে মা ঘুমিয়ে পড়ে।নাফিজার চোখে ঘুম নেই।সে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গেছে।

তার বিয়ে কেমন ছেলের সাথে হবে,তাকে ভালোবাসবে কিনা,মাকে শ্রদ্ধা করবে কিনা আরো কত কি।প্রিয় মানুষের সংস্পর্শে কেমন অনুভব হবে,তার চেহারাটা কেমন হবে ভেবেই ব্যাকুল। তার মাঝে কৌতুহল কাজ করছে।কিছুক্ষণপর নিজেকে, পাগলী বলে তিরস্কার করে ঘুমিয়ে পড়ে।ফজরের আজান হলে ঘুম থেকে উঠে যায়।উঠে দেখে মা নামাজ পড়ছে।সেও অযু করে নামাজে দাঁড়ায়।

নামাজ শেষ হয়েছে কিন্তু মাকর এখনো সিজদায় দেখে মা মা বলে ডাকে। মাকে ধরতেই লুটিয়ে পড়ে ।বুঝতে পারে মা আর দুনিয়াতে নেই।মনকে বোঝানোর জন্য ডাক্তার এনেছে।ডাক্তার বলল,তিনি আরো চার ঘন্টা আগে তথা রাত তিনটা নাগাদ মারা গেছেন।তার মানে তাহাজ্জুদের নামাজরত অবস্থায় মারা গেছে।নাফিজার চোখে এখন নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে।

লেখকঃনুর আহমেদ সিদ্দিকী