বিশ্ব বন দিবস ও আমাদের করণীয় -পাশা মোস্তফা কামাল


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২০ - ০৪:২১:১৮ অপরাহ্ন

আমাদের চলমান জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বন ও বৃক্ষের সাথে সম্পর্কিত। আমরা কখনো অবচেতন মনে সেই সম্পর্কের কথা ভাবি না অথবা অনুভব করি না। অথচ আমাদের জীবন ধারণের প্রধান নিয়ামক অক্সিজেন থেকে শুরু করে যাপিত জীবনের বহুবিধ বিষয় বনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জনের সাথেও বন এবং বৃক্ষের অনিবার্য সংযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক ও সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে ধরিত্রীকে রক্ষা করার একমাত্র বর্ম হচ্ছে বৃক্ষ ও বন। পৃথিবীর স্থলভাগের এক তৃতীয়াংশ জুড়ে বনভূমির বিস্তৃতি।

বিশ্বের প্রায় ২ হাজারের বেশি  উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ১৬০ কোটি মানুষের সংস্কৃতি, জীবন, জীবিকা, ওষুধ, জ্বালানি ও খাদ্যের জন্য বনভূমির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। জীববৈচিত্র্য প্রাণী এবং উদ্ভিদ ও পোকামাকড়ের ৪০ শতাংশই বন কেন্দ্রিক। আর্থিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও বন এবং বৃক্ষের প্রতি আমরা প্রতিনিয়ত কেমন যেন অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করি প্রতিনিয়ত। আমরা নির্বিঘ্নে ধ্বংস করে যাচ্ছি আমাদের বন ও বনজ সম্পদ।

বনভূমি রক্ষা করার জন্য জনসচেতনতা তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় বিশ্বব্যাপী। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১২ সালের ২১ মার্চ আন্তর্জাতিক বন দিবস ঘোষণা করে। সারা বিশ্বে সব ধরনের বনাঞ্চলের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি, সদস্য দেশসমূহকে বৃক্ষরোপন অভিযান পরিচালনা এবং বন সম্পৃক্ত সকল কাজে সরকার সমূহকে উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশ্যে এ দিবসটি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি বছর সদস্য দেশ সমূহের প্রস্তাব অনুযায়ী একটি প্রতিপাদ্য বেছে নেয়া হয় বিশ্বব্যাপী। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক বন দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বন এবং জীববৈচিত্র্য’। (Forest and Biodiversity-Too preecious to lose) (বন ও জীববৈচিত্র্য মূল্যবান অতি-হারালে অপূরণীয় ক্ষতি)।

বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বনভূমির পরিমাণ কমে আসছে। কমে আসছে জীবজন্তু ও জীববৈচিত্র্য। যার কারণে বিশ্বব্যাপী পড়ছে এর বিরূপ প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভয়াবহ ব্যাপার ঘটছে সারা পৃথিবী জুড়ে। প্রকৃতি আমাদের ওপর রুষ্ট হচ্ছে দিনদিন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে ঋতুবৈচিত্র। এর অসহায় শিকার হচ্ছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশসমূহ। এমন একটি অবস্থায় বাংলাদেশের নিজস্ব বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে, যা ইতিমধ্যে বিশ্বসভায় প্রশংসিত হয়েছে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করে বন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে বন সম্প্রসারণ, সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে জনগণকে বন সম্প্রসারণে সম্পৃক্ত করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ, দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচির মাধ্যমে বনায়ন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য সরকারের এ উদ্যোগসমূহ যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার।

২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে ১২.৮ শতাংশ এলাকাতে বন রয়েছে। অপরদিকে বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ ২২.৪ শতাংশ। ২০৩০ সাল নাগাদ এ পরিমাণ ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

অবশ্য এ কাজের সফল বাস্তবায়নের জন্য কিছু প্রতিবন্ধকতা তো আছেই। সেই প্রতবিন্ধকতাসমূহ মোকাবিলা করেই আমাদের অভিষ্ট্য লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এই প্রতিবন্ধকতাসমূহ হচ্ছে বনভূমিকে কৃষি জমি কিংবা শিল্পস্থাপনের জন্য ব্যবহার, বন থেকে অপরিকল্পিতভাবে জ্বালানি সংগ্রহ, পাহাড় কাটা, অবৈধভাবে বনজ দ্রব্য পাচার, বনভূমি জবর দখল, বন্যপ্রাণী পাচার, বন রক্ষায় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অভাব, বন ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব।

বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং গৃহীত কর্মসূচির মাধ্যমে এই প্রতিবন্ধকতাসমূহ জয় করে অভিষ্ট্য লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সর্বপ্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা। বন ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল বাড়াতে হবে। বন ও বনজ সম্পদ রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। বনায়ন সম্পর্কিত বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে বর্তমান বন রক্ষা ও পুনঃবনায়ন কার্যক্রম অব্যাহত রেখে এগিয়ে যেতে হবে। বনভূমির জবর দখল প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। বন্যপ্রাণী পাচার রোধে আইনের কঠিন প্রয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি বর্তমান সরকারের স্বচ্ছ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আমাদের বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে লক্ষ্য অর্জন করবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।