বিশ্বব্যাংকের শর্ত পূরণ: গঠন হচ্ছে কাস্টমস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অধিদফতর

বন্দরে পণ্য দ্রুত খালাস ও বাণিজ্য ব্যয় কমবে

» শিপার মাহমুদ (জুম্মান) | স্টাফ রিপোর্টার, উত্তরা নিউজ | সর্বশেষ আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০১৯ - ০৪:৫৯:৩৭ অপরাহ্ন

সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সহজীকরণ করতে ‘কাস্টমস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অধিদফতর’ গঠন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের শর্ত পূরণে সরকার এ অধিদফতর গঠন করছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে ২৪ ঘণ্টা এ অধিদফতর চালু থাকবে। সরকারের প্রস্তাবিত নতুন এ প্রতিষ্ঠান থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে দেশীয় ব্যবসায়ী, শিল্পগোষ্ঠী ও উদ্যোক্তাদের আধুনিকমানের সেবা দেয়া হবে।

সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে এ ধরনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য একটি সারসংক্ষেপ অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

নতুন অধিদফতরের সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে- পণ্যের চালান দ্রুত খালাস, বিদেশের বন্দরে দেশীয় উদ্যোক্তাদের পণ্য চালানের গড় অবস্থানকাল কমিয়ে আনা ও বাণিজ্য ব্যয় হ্রাস করা।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এছাড়া পদ্ধতিগত যাত্রী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বহির্বিশ্বের বন্দরগুলোয় যাত্রীদের দ্রুত আসা-যাওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে কর্মসংস্থান ব্যবস্থা বাড়াতে ‘জব প্রোগামেন্ট ডেভেলপমেন্ট পলিসি ক্রেডিট’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘কাস্টমস ব্যবস্থাপনা ঝুঁকি অধিদফতর’ সৃজনের শর্ত জুড়ে দেয় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। ফলে মার্চে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এ অধিদফতর গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রেড ফ্যাসিলেশন অ্যাগ্রিমেন্টে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। ফলে এ চুক্তির আলোকে বাণিজ্য সহজীকরণ কৌশল হিসেবে কাস্টমস স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করতে হবে। নানাদিক থেকে এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলায় ‘কাস্টমস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অধিদফতর’ গঠনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে এনবিআর।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের পৃথক অধিদফতর তখনই ভালো হবে, যখন এর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো যাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচও কমানো যায়। তিনি বলেন, এ উদ্দেশ্যে কাস্টমস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অধিদফতর গঠনের উদ্যোগ ভালো। কারণ এতে রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, অর্থবছরে (২০১৮-১৯) আমদানি-রফতানি মিলে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৮ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় ওঠেছে। এর মধ্যে রফতানি ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা এবং আমদানি ৪ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিবছর বাণিজ্যের হার বাড়ছে। ফলে জাতীয় ও বহির্বিশ্ব পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কাস্টমস বিভাগের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এছাড়া বাণিজ্য সহজীকরণ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী কাস্টমস পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় উত্তম চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে কমপ্লাইন্সের ভিত্তিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে কাস্টমস নিয়ন্ত্রণ কৌশল প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। আর এসব পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশে পৃথক কাস্টমস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো সারসংক্ষেপে ‘কাস্টমস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অধিদফতর’ সৃজনের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বাণিজ্য পদ্ধতিতে জটিলতা ও প্রতিযোগিতা।

এছাড়া জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নিরাপত্তার ঝুঁকি আশঙ্কাজনক বেড়েছে।

এ কারণে বাংলাদেশের কাস্টমসের কাজের আওতা ও চ্যালেঞ্জ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় জনবল স্বল্পতা ও কারিগরি সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ফলপ্রসূ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সারসংক্ষেপে আরও বলা হয়, আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা গেলে আইন মান্যকারী অংশীজনের পণ্য চালান সহজ পদ্ধতিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে খালাস করা সম্ভব হবে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য চালান ও সন্দেহভাজন যাত্রী শনাক্ত করা সহজ হবে। আর পণ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ বিনিয়োগ সম্ভব হবে। এতে আইন লঙ্ঘনকারীদের পণ্যের চালান ও সন্দেহভাজন যাত্রী শনাক্তকরণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আরও ফলপ্রসূ হবে।

জানা গেছে, বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কাস্টমস চলছে। আমদানি-রফতানি হচ্ছে বিপুল অঙ্কের। চলতি অর্থবছরে ১০ লাখ কোটি টাকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি থাকলেও ব্যবস্থাপনা সীমিত। এতে মিথ্যা ঘোষণা ও কূটকৌশলের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে কাস্টমস ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অধিদফতর চালু হলে ২৪ ঘণ্টা খোলা রেখে তিন শিফটে সেবা দেয়া হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। শিগগিরই এ বিষয়ে একটি পদক্ষেপ নেয়া হবে।