উত্তরা নিউজ উত্তরা নিউজ
অনলাইন রিপোর্ট


বান্ধবীর সাথে ছবি তোলার জেরে টঙ্গীতে শুভ হত্যা

টঙ্গী-উত্তরায় সক্রিয় গ্যাংস্টার !




১১ জুলাই ২০১৯ ইং তারিখ র‌্যাব-১ এর অভিযানে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীতে চাঞ্চল্যকর নবম শ্রেণীর ছাত্র শুভ আহমেদ (১৬) হত্যার প্রধান আসামী মৃদুল হাসান পাপ্পু (১৭)’সহ মোট ০৪ জন কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্য গ্রেফতার ॥ হত্যার কাজে ব্যবহৃত ধারালো সুইচ গিয়ার চাকু উদ্ধার।

গত ০৭ জুলাই ২০১৯ তারিখ গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পূর্ব থানাধীন বিসিক ফকির মার্কেট পাগার মদিনা পাড়া এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব শত্রুতার জের ধরে শুভ আহমেদ (১৬) নামক একজন স্কুল ছাত্রকে বুকে, পিঠে ও মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করা হয়। নিহত শুভ আহমেদ পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। সে স্থানীয় পাগাড় ফিউচার ম্যাপ স্কুলে ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। বর্ণিত হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহতের পিতা রাজু আহম্মেদ বাদী হয়ে টঙ্গী পূর্ব থানায় মৃদুল হাসান পাপ্পু (১৭) এবং অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা রুজু করে, যার নম্বর-20 তারিখ ০৮/০৭/২০১৯ ইং, ধারা ৩০২/৩৪ দঃ বিঃ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায় যে, টঙ্গী ও পাশ্ববর্তী উত্তরা এলাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ বেশ কিছু কিশোর গ্যাং গ্রুপ বিদ্যমান। এসব গ্যাং গ্রুপ তাদের দেওয়া বিভিন্ন নামে পরিচিত। সাধারণত উঠতি বয়সের কিশোররা এসব গ্যাং কালচারের সাথে জড়িত। অভিভাবকের অবহেলা ও পশ্চিমা কালচারের অনুকরণে এসব গ্যাং গ্রুপ গড়ে উঠেছে। এসব গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা স্থানীয় বিভিন্ন স্কুলে নাম মাত্র পড়াশোনা করে, অধিকন্তু তারা দিনের বেশিরভাগ সময় দল বেধে হইহুল্লা করে বেড়ায়। তাদের বেশভূশা, চালচলন ও আচার-আচরনে সর্বদা একটি অশালীনভাব দেখা যায়। এসব গ্যাং গ্রুপের মধ্যে মাঝে মধ্যেই ছোট খাটো বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। হত্যার এক দিন পূর্বে ভিকটিমের সাথে স্থানীয় নবগঠিত একটি গ্যাং গ্রুপের সদস্যদের সাথে ঝগড়া ও হাতাহাতি হয় বলে জানা যায়।

নিহতের পরিবারের নিকট হতে জানা যায় যে, ভিকটিমের পিতা-মাতা উভয়ে স্থানীয় দুটি গার্মেন্টেসে চাকুরী করে। শুভ তাদের একমাত্র সন্তান। ঘটনার দিন আনুমানিক ২১:০০ ঘটিকার দিকে ভিকটিম শুভ তার মায়ের নিকট হতে চুল কাটার জন্য টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। চুল কাটার পর আনুমানিক ২৩০০ ঘটিকায় বর্ণিত নবগঠিত গ্যাং গ্রুপের বেশ কয়েকজন সদস্য ভিকটিমকে ডেকে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করে পালিয়ে যায়। এদিকে অনেক রাত হওয়ার পরেও সে বাসায় ফিরে না আসায় ভিকটিমের মা তার মোবাইলে কল দিলে মোবাইল বন্ধ পায়। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজন পাগার মদিনা পাড়াস্থ জনৈক স্বপনের বাড়ির সামনে পাঁকা রাস্তার পাশে ঝোপের মধ্যে লাশ দেখে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশকে খবর দেয়। টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ হত্যার সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থল হতে লাশ ময়না তদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দিন আহম্মেদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, টঙ্গী মর্গে প্রেরণ করে। লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে ভিকটিমের পরিবার মর্গে গিয়ে লাশ সনাক্ত করে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে ভিকটিমের পরিবার শোকে বিহ্বল হয়ে পরে।

উক্ত হত্যাকান্ডের ঘটনাটি সারাদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়। এই নির্মম হত্যাকান্ডের প্রেক্ষিতে র‌্যাব-১ তাৎক্ষনিকভাবে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে দ্রুততার সাথে ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ জুলাই ২০১৯ তারিখ আনুমানিক ১৭৩০ ঘটিকায় র‌্যাব-১, উত্তরা, ঢাকা এর একটি আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গাজীপুর মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা হতে বর্ণিত হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ১) মৃদুল হাসান পাপ্পু @ পাপ্পু খাঁন (১৭), পিতা- মোঃ মহিউদ্দিন, মাতা- মোছাঃ রোকছানা বেগম, সাং- পাঠাকাটা, থানা- মঠবাড়িয়া, জেলা- পিরোজপুর, বর্তমানে সাং- পাগার, হাজি মার্কেট সংলগ্ন (কামাল পাঠান এর বাড়ির ভাড়াটিয়া), থানা- টঙ্গী পূর্ব, জিএমপি, গাজীপুর, ২) সাব্বির আহমেদ (১৬), পিতা- মোঃ হাবিবুর রহমান, মাতা- মোছাঃ পারুল বেগম, ৩) রাব্বু হোসেন রিয়াদ (১৬), পিতা- মোঃ নুরুল ইসলাম খোকন, মাতা- মনোয়ারা বেগম এবং ৪) নূর মোহাম্মদ রনি (১৬), পিতা- আলতাফ উদ্দিন, মাতা- রুনা আক্তার, সর্ব সাং- পাগার ফকির মার্কেট, থানা- টঙ্গী পূর্ব, জিএমপি, গাজীপুর’দেরকে গ্রেফতার করে। এসময় ধৃত আসামীদের নিকট হতে হত্যার কাজে ব্যবহৃত ০১ টি ধারালো সুইস গিয়ার চাকু উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামীরা বর্ণিত হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

গ্রেফতারকৃত আসামী মৃদুল হাসান পাপ্পু’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় যে, সে স্থানীয় ফিউচার ম্যাপ স্কুলে ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। তার পিতা ওমান প্রবাসী এবং মাতা গৃহিনী। সে তিন ভাই-বোনে মধ্যে দ্বিতীয়। সে তাদের এলাকার নবগঠিত একটি গ্যাং গ্রুপের সদস্য। বিগত ০৬ মাস পূর্বে ভিকটিম শুভ একই স্কুলের নবম শ্রেণীতে ভর্তি হলে তার সাথে পাপ্পুর পরিচয় হয়। সে জানায় যে, মূলতঃ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব শত্রুতাকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পূর্বের দিন তারা শিক্ষা সফরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় গ্রন্থাগার ও জাতীয় জাদুঘরে যায়। শিক্ষা সফর শেষে ফেরার পথে পাপ্পু ও তার বান্ধবী একই সিটে বসলে শুভ মুঠোফোনে তাদের ছবি তোলে এবং অন্য সবাইকে দেখিয়ে ঠাট্টা করতে থাকে। আকষ্মিক ছবি তোলাতে পাপ্পু ভিকটিমের উপর ক্ষুদ্ধ হয় এবং তাদের মধ্যে ঝগড়া ও হাতাহাতি হয়। এরই জের ধরে পাপ্পু, সাব্বির, রাব্বু ও রনি তাদের গ্রুপের সদস্যকে নিয়ে ঠাট্টা-অপমানের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক রাত ১০টার পর কৌশলে নির্জন স্থানে ডেকে নেয়। ভিকটিমকে ঘটনাস্থনে ডেকে নিয়ে তাকে মারধর করার সময় সাব্বির ও রাব্বু’র নিকটে থাকা সুইস গিয়ার চাকু দিয়ে ভিকটিমের বুকে ও পিঠে আঘাত করে এবং রনি সাব্বিরের নিকট হতে চাকু নিয়ে ভিকটিমের মাথায় আঘাত করে। এসময় ভিকটিম দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাইলে পাপ্পু তাকে পিছন থেকে ধাওয়া করে পিঠে আঘাত করলে সে মাটিতে পড়ে যায়।

গ্রেফতারকৃত আসামী সাব্বির আহমেদ’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় যে, সে স্থানীয় হাজী সাইদ ল্যাবঃ স্কুলে ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। তার পিতা পেশায় একজন রড, বালি, সিমেন্ট এর কন্ট্রাক্টর এবং মাতা গৃহিনী। সে চার ভাই-বোনে মধ্যে সবার ছোট। সে তাদের নবগঠিত গ্যাং গ্রুপের একজন অন্যতম সদস্য। সে মূলতঃ তাদের গ্রুপের সদস্যের অপমানের প্রতিশোধ নিতেই এই হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ করেছিল। হত্যাকান্ডের দিন দুপুর বেলা টিফিন পিরিয়ডে তারা এই পরিকল্পনা করেছিল বলে জানায়।

গ্রেফতারকৃত আসামী রাব্বু হোসেন রিয়াদ’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় যে, সে স্থানীয় ফিউচার ম্যাপ স্কুলে ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। তার পিতা পেশায় একজন কাপড় ব্যবসায়ী এবং মাতা গৃহিনী। সে তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। গ্যাং গ্রুপের প্রতি আসক্তির কারণে সেও নবগঠিত এই গ্যাং গ্রুপের সাথে জড়িত হয়। ভিকটিমের সাথে ইতিপূর্বে তার টাকা লেনদেনের বিষয়ে বিরোধ হয়েছিল। এছাড়াও একটি মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে তাদের মধ্যে ঝগড়া চলছিল বলে ধৃত আসামী জানায়।

গ্রেফতারকৃত আসামী নূর মোহাম্মদ রনি’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় যে, সে ফিউচার ম্যাপ স্কুলে ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। তার পিতা একজন লিবিয়া প্রবাসী এবং মাতা গৃহিনী। সে দুই ভাই-বোনে মধ্যে বড়। সে গ্যাং কালচারের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে আকৃষ্ট হওয়ায় নবগঠিত এই গ্যাং গ্রুপের সাথে জড়িত হয়। সে তাদের গ্রুপের পাপ্পুর কথামতো এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ করেছিল বলে জানায়।

উত্তরা নিউজ/গাজী