বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সফল লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন !


» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০১৯ - ০৩:০৮:১১ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) প্রথমবারের মতো লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি বিভাগে বিনামূল্যে সিরাজুল ইসলাম নামের ২০ বছর বয়সী এক যুবকের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন হয়। জটিল এ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে একটানা ১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হয় চিকিৎসকদের। বর্তমানে রোগী এবং দাতা দু’জনেই সুস্থ আছেন।

মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিল্টন হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. জুলফিকার রহমান খানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যবিশিষ্ট একটি মেডিকেল টিম ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন করে। ইতঃপূর্বে দেশে বেসরকারি হাসপাতালে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হলেও সরকারি পর্যায়ে হয়নি।

জুলফিকার রহমান খান বলেন, রোগীকে প্রথমে অ্যানেসথেসিওলজিস্টদের সাহায্যে অজ্ঞান করা হয়। এরপর লিভার অপসারণের মধ্য দিয়ে ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রম শুরু হয়। ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া লিভার ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রম সম্পন্ন হয় রাত ১২টায়। অর্থাৎ একটানা ১৮ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন হয়। লিভারদাতা রোগীর মা এবং রোগী ২০ বছরের যুবক আশানুরূপ সুস্থ আছেন। চিকিৎসা-পরবর্তী প্রথম সাত দিন নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন। আশা করি, রোগী ও তার মা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারবেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, লিভারের বিভিন্ন রোগের সমস্যা একটি দুশ্চিন্তার বিষয়। যদি কোনো রোগীর লিভার সিরোসিস হয়ে যায়, তাহলে তার একমাত্র চিকিৎসা লিভার ট্রান্সপ্লান্ট। এই চিকিৎসা বাংলাদেশে করতে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। আর দেশের বাইরে এ চিকিৎসা পেতে কম করে হলেও একজন রোগীকে কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। দেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের উল্লেখযোগ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক রোগী বিদেশে গিয়ে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করিয়ে থাকেন। তবে দরিদ্র লোকদের অর্থিক সঙ্গতি না থাকায় তারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য হন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় এটি একটি নতুন মাইলফলক স্থাপিত হল। এর আগে এদেশে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে। একসময় হার্টের চিকিৎসা করতেও দেশের বাইরে যেতে হতো। এখন তা অনেক কমেছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ট্রান্সপ্লান্টের ব্যবস্থার কথা বলা ছিল, এই প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে এসবের খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাত উন্নত হওয়ায় আমাদের গড় আয়ু ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়ার সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব জিএম সালেহ উদ্দিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সিকদার, প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আতিকুর রহমান, ভারতের লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ডা. পি বালাচন্দ্র মেনন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

তারা জানান, এই ট্রান্সপ্লান্ট পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমবার করা হল। এখন পর্যন্ত এটি সফল এবং কোনো সমস্যা চিহ্নিত হয়নি। এর আগে দেশে চারটি লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন হয়। যার দুটি ল্যাবএইড হাসপাতালে। বাকি দুইি বারডেম জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে সফলতা ছিল ৫০ ভাগ। দেশে বেসরকারি হাসপাতালে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করতে যে খরচ হয়, তার অর্ধেক খরচে বিএসএমএমইউতে ট্রান্সপ্লান্ট করা সম্ভব।

অধ্যাপক ডা. জুলফিকার রহমান খানের নেতৃত্বে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট টিমে যারা ছিলেন তারা হলেন- অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মোহছেন চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র দাস, সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফউদ্দিন, সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. নূর-ই-এলাহী, ডা. ওমর সিদ্দিকী, ডা. মোহাম্মদ ইমরুল হাসান খান, ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান, ডা. রাসেল মাহমুদ, ডা. আবদুল্লাহ মো. আবু আইউব আনসারি, ডা. সারওয়ার আহমেদ সোবহান, ডা. মো. নাজমুল হক, ডা. এসএম মোর্তজা আহসান, ডা. জাবিউল ইসলাম, ডা. মো. আবদুল কাইউম, ডা. মো. আরিফুজ্জামান, ডা. মো. আসাদুজ্জামান নূর, ডা. মোস্তফা মামুন ওয়ারিদ, ডা. একে আজাদ, ডা. সবিতা রানী, ডা. আজফার বিন আনিস, ডা. মো. ইমরান আলী।

অপারেশন সম্পন্ন করতে রোগীকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অজ্ঞান করার কাজ করেন অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া ও ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি টিম। ওই টিমে ছিলেন অধ্যাপক মো. আবদুল হাই, ডা. ইকবাল হোসেন চৌধুরী, ডা. সাবিনা ইয়াসমিন, ডা. মন্তোষ কুমার মণ্ডল, ডা. আবদুল আলীম, ডা. সঞ্জয় কুমার সাহা ও ডা. মো. মোস্তফা কামাল। অপারেশন চলাকালে ইমেজিং সংক্রান্ত কাজে সার্বিক সহযোগিত করেছেন রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এমএইচ মোস্তফা কামাল ও রেসিডেন্ট দীপক ভার্মা। এছাড়া জটিল এ অস্ত্রোপচারে সার্বিক সহায়তা করেন ভারতের প্রথিতযশা লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ডা. পিবালাচন্দ্র মেনন।