মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান
উত্তরা নিউজ, স্টাফ রিপোর্টার


বাংলাদেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ করতে সক্রিয় পাশ্ববর্তী দেশগুলো






পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ প্রতিনিয়তই এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, আন্তর্জাতিক উন্নয়নসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশ যখন একের পর এক স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনই বাংলাদেশের এই উন্নয়নকে দমিয়ে দিতে তৎপর পাশ্ববর্তী দেশগুলো। ২০১৩ সালে পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমার সেদেশের আরাকান রাজ্যের নাগরিকদের ‘বাঙালি’ অভিহিত করে তাদের অধিকার কেড়ে নিয়ে অকথ্য নির্যাতনের স্ট্রিম রোলার চালানোর মধ্য দিয়ে বাধ্য করে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। ফলে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে জাতীয় উন্নয়ন কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্থ হয়েছে এবং সেই সাথে দেশকে দীর্ঘদিন ধরেই বিশাল শরণার্থীর চাপ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে বেড়ে উঠতে থাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার কূটনৈতিকভাবে রোহিঙ্গাদের আরাকান রাজ্যে ফেরত পাঠানোর এক সমঝোতা হলেও রোহিঙ্গারা নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ থেকে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। এ নিয়ে গত সপ্তাহের শুরুর দিকে মিয়ানমারে থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার দুইবছরের মাথায় কক্সবাজারের ক্যাম্পে ক্যাম্পে সমাবেশ করেছে। সমাবেশের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা জানান দেয় আরাকানে নিজেদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত, ভিটেবাড়ি পুনরুদ্ধার, আন্তজার্তিক নিরাপত্তা জোরদার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে তারা ফিরে যাবে না বলে জানিয়েছে। এমন অবস্থায় কিছুতেই শঙ্কামুক্ত নয় বাংলাদেশ।

যদিও এসবের মূলে রয়েছে স্বার্থলোভী দেশি-বিদেশি এনজিও চক্র। তবে সরকার এ পর্যন্ত ৪১টি এনজিও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে সেখানে বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। সবমিলিয়ে হঠাৎ করে রোহিঙ্গাদের এমন কা- নিয়ে যখন ব্যস্ত বাংলাদেশ ঠিক তখন দুঃশ্চিন্তার আরেক কারণ আসাম। ২৬২ কি.মি জুড়ে বাংলাদেশের সাথে ভারতের আসাম রাজ্যের সীমান্ত রয়েছে। এরই মধ্যে চলতি সপ্তাহের ৩১ আগস্টে (শনিবার) ভারতের আসামে চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষী ১৯ লাখের বেশি মানুষকে রাষ্ট্রহীন করা হয়েছে। অবশ্য এ ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য বলেছে, যাঁদের নাম চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় স্থান পায়নি, তাঁদের সব আইনি বিকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদেশি ঘোষণা করা যাবে না। এনআরসির বাইরে থাকা প্রতিটি ব্যক্তি বিদেশি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারেন এবং আবেদন করার সময়সীমা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে। কিন্তু, ভারতের বর্তমান বিজেপি শাসিত সরকার যত কিছুই বলুক না কেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের ভোটাভোটিতে বাংলাদেশের পাশে অবস্থান নেয়ার ব্যাপারে মোদি সরকারের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। আর তাই নিজ দেশের বেলায় বাংলাদেশকে ছাড় দিবে ভারত এমন ধারণা করাটাও বোকামি আর কিছুই নয়।

তবে, এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন ঐদিনই রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তাঁরা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের ঢাকা সফরের সময় ২০ আগস্টের বৈঠকে আগেভাগেই বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। ‘আপনারা শুনেছিলেন…তিনি (জয়শংকর) ¯পষ্ট বলেছিলেন যে এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং (বাংলাদেশের জন্য) কোনো সমস্যা হবে না,’ বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন আরও বলেন, ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ যে সমস্যা মোকাবিলা করছে, সে বিষয়টি তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে আছে। দেশে শ্রমিকসহ গরিব ও সাধারণ মানুষ, এমনকি যাদের কোনো শিক্ষা নেই, তাদেরও কাজের অভাব নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তাই, আমি বিশ্বাস করি না যে আমাদের দেশের মানুষ এ মুহূর্তে প্রতিবেশী দেশে যাবে। যদি তাঁরা সেখানে গিয়েও থাকেন, তাহলে সেটি ছিল ১৯৭১ ও ১৯৪৭ সালের আগে।’

এমন পরিস্থিতিতে, আসামের নাগরিকপঞ্জি একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলা হলেও ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির পক্ষ থেকে বারবার তালিকায় বাদ পড়াদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী বলে আখ্যা দেয়ায় এ নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির অবস্থানের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো উচিত বাংলাদেশের। আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় বাদ পড়া অধিবাসীর সংখ্যা ৪১ লাখ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৬ হাজারে তবে বাদ পড়ারাও ১২০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ পাবেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ভারতের বিজেপি সরকার না বললেও দল হিসেবে বিজেপি এদের বাংলাদেশের নাগরিক বলে আসছে অনেক দিন ধরেই। ডয়েচে ভেলে জানায়, এবারের তালিকা থেকে বাদ পড়াদের ধর্মীয় পরিচয় বিশ্লেষণ এখনো ¯পষ্ট না হলেও আগের তালিকা থেকে ¯পষ্ট যে আসামের মুসলমানরাই এর প্রধান টর্গেট। এই ইস্যুতে আসামে বিজেপি হাতে নিয়েছে ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট, যা থ্রিডি ফর্মুলা নামে পরিচিত। কিন্তু এর প্রভাব কি বাংলাদেশে পড়বে? পড়লে বাংলাদেশের কী করা উচিত?

আসামের এই নাগরিক তালিকাকে বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক চাল বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. শান্তনু মজুমদার। নাগরিকত্বের এই ইস্যুটিকে ঝুলিয়ে রেখে বিজেপি আসামে তার অবস্থান শক্ত করতে চায়। পাশাপাশি আসামের প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের মমতা ব্যানার্জির সঙ্গেও এ নিয়ে ইস্যু তৈরি করে বিজেপি ফায়দা লুটতে চায় বলে মনে করেন তিনি। শান্তনু মজুমদারের মতে, ‘বিজেপি সরকার এটাকে দীর্ঘকাল ঝুলিয়ে রেখে রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করবে। কারণ যাদের নাগরিক তালিকার বাইরে রাখা হচ্ছে, তারা যুগ যুগ ধরে সেখানে আছেন। যে তালিকা করা হয়েছে, ওই তালিকার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন আছে।”
তবে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় এতবড় ঘটনা ঘটছে, তার ওপর আমাদের তো নজর রাখতেই হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আসামে মুসলমানদের টার্গেট করা হয়েছে। সেটাও দেখার বিষয় আছে।
বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এম তৌহিদ হোসেনও মনে করেন, নাগরিক তালিকা থেকে বাদ দেয়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি হবে। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘ট্রাইবুন্যালে আপিল করা যাবে। হাইকোর্টে যাওয়া যাবে। তবে কতজনের সেটা করার আর্থিক সক্ষমতা আছে তা দেখার বিষয়। ভারত বলছে এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশে সরকারও এটাতে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখছে। যতদিন এটা বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি না করছে ততদিন এটা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই’

তবে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে বলে মনে করেন বাংলাদেশের সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, ‘বিজেপি ভারতের ক্ষমতায় দলটির ক্ষমতাবান নেতা এবং এখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলেছেন তা উদ্বেগের বিষয়। আমাদের আগেই উচিত ছিল বিজেপির বক্তব্যের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া, প্রতিবাদ জানানো। এখনো সময় আছে। সরকার নয়, দল হিসেবে বিজেপি’র বক্তব্যের প্রতিবাদ করা দরকার। কারণ দলটি ভারতের ক্ষমতায় আছে। অমিত শাহ যখন বলেন এরা বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারী। উইপোকার মত তাদের বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেয়া হবে। বন্ধু রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন দলের সভাপতির মুখ থেকে যখন এই কথা আসে তখন বাংলাদেশের একদম চুপ থাকা আমি সমীচীন মনে করি না।”

এদিকে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা, বিশেষ করে সিলেট সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ- বিজেবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। আসামে যাদের নাগরিক তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে, তাদের যাতে ভারত কোনোভাবে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিতে না পারে সেজন্য সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বিজিবি’র ১৯ ব্যাটালিয়নের পরিচালক লেফট্যানেন্ট কর্নেল সাঈদ হোসেন গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তারা তিন ধাপে নাম প্রকাশ করলো। প্রথম ধাপে যখন তারা নাম প্রকাশ করে তখন থেকেই বিজিবি সতর্ক অবস্থায় আছে। শুধু বিজিবি নয়, সীমান্তের সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন সবাইকে নিয়েই বিজিবি কাজ করছে। আমরা যেকোনো ধরনের পুশ-ইন প্রতিহত করতে প্রস্তুত আছি।”

গত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের বাসিন্দারা শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছে। এরই মধ্যে ভারতের আসাম রাজ্যে এনআরসি প্রকাশের মাধ্যমে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষকে নাগরিকত্ব থেকে বাদ দেয়ায় অনেকটা হুমকির রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করতেই এমন অপ-তৎপরতা চালাচ্ছে পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো।