ফিলিস্তিনিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশা ও উম্মাহর নিদারুণ যন্ত্রনা


» মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান | উত্তরা নিউজ, স্টাফ রিপোর্টার | সর্বশেষ আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০১৯ - ০৯:১৩:৪০ অপরাহ্ন

১৯১৭ সাল। তাৎকালীন আরবদের তথাকথিত স্বাধীনতার লোভই যে কাল হলো আজকের মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান ফিলিস্তিনের। কেননা এই ভূখণ্ডটি জুড়েই রয়েছে ইসলামের নানা নিদর্শন ও স্থাপত্য। ইসলামের প্রথম কিবলা আল-আকসা তথা বাইতুল মুকাদ্দাস এই ফিলিস্তিনেই অবস্থিত। যুগে যুগে নানা নবী-রাসূলদের জন্মস্থান ও পুণ্যভূমির প্রধান কেন্দ্র ফিলিস্তিনের এই ভূখন্ড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফো তথাকথিত ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতা এনে দেয়ার ঘোষণা দেন। অথচ এই ভূখন্ডটি তখন উসমানীয় খেলাফতের অধীন পরিচালিত হত। কিন্তু, তাৎকালীন আরবদের মাঝে স্বার্থান্বেষী মহল যারা নিজেদের ক্ষমতার গদি পাকাপোক্ত করতে খ্রিস্টান লর্ড বেলফোর ঘোষণায় আশ্বস্ত হন এবং খেলাফতের বিরুদ্ধে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়। সেই সাথে খেলাফত শাসন ব্যবস্থা উৎখাত করতে খ্রিস্টানদের সাথে একযোগে উঠে পড়ে লাগে।

কিন্তু বেলফো’র ঘোষণায় যে চরম ধোকা ও দূরভিসন্ধী লুকিয়ে আছে, সেটি ঐসব মুসলিম নামধারীরা কল্পনাও করতে পারেনি। কেননা ইহুদি বিজ্ঞানী ড. ডেইস বাইজম্যানের তৈরি বোমা তৈরির উপাদান কৃত্রিম ফসফরাস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটিশদের অভাবনীয় উপকারে আসায় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ড. ডেইস বাইজম্যাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তুমি কি চাও? জবাবে বেইজম্যান বলেছিল, অর্থ নয় আমার স্বজাতির জন্য এক টুকরো ভূমি আর তা হবে ফিলিস্তিন। ফলে ফিলিস্তিন ভূখ-টি ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয় বৃটেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন জয়লাভ করার পর ১৯১৮ সাল থেকে পরবর্তী ৩০ বছর ফিলিস্তিনকে নিজেদের অধীন করে রাখে খ্রিস্টানরা। আর এই সময়টাতেই ফিলিস্তিন থেকে মুসলিমরা বিভিন্ন প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোতে চলে যায়। এই সুযোগে ইহুদিরা ফিলিস্তিন এবং আশপাশের এলাকাগুলোতে একে একে বসতি গড়ে তুলতে থাকে। সর্বশেষ ১৯৪৮ সালে ইহুদিরা আজকের ফিলিস্তিনের বিশাল এলাকার ভূমি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। এর আগে ইহুদিরা হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ণ গ্যাং নামের ভিন্ন ভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে তুলে মুসলিমদের বিশাল ভূখ-ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ, লুণ্ঠনসহ ভয়ানক সব অপরাধ কর্মকা- পরিচালনা করত। ফলে বর্বর ইহুদিদের অপকর্ম হতে নিজেদের জান-মাল রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে আরবের অন্যান্য স্থানগুলো (জর্দান, সিরিয়া, মিশর, লেবানন)তে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় ফিলিস্তিন ছাড়তে বাধ্য হয় মুসলিম জাতি। কেননা ঐ সময় মুসলমানগণ নিজেদের নিরাপত্তার নিমিত্তে শক্তিশালী কোন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে তুলতে পারেনি। এর কারণ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মুসলিম নামধারী যেসব স্বার্থলোভীরা খ্রিস্টানদের কাছ থেকে তথাকথিত স্বাধীনতা লাভ করতে চেয়েছিল, তারাও খ্রিস্টানদের তালে পরে কোন সু-উদ্যোগ গ্রহণ করেনি বরং চোখ বুজে নিজেদের স্বজাতির উপর ইহুদি-খ্রিস্টানদের ঐক্যবদ্ধ আক্রমন চেয়ে চেয়ে দেখেছিল। ফলে প্রতিকূল এক পরিবেশে মুসলমানরা নিজেদের ভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগায় ইহুদি-খ্রিস্টান শক্তি।

এসময় ইহুদিরা বিশ্ব থেকে জনমত লাভ করতে চরম ঘৃণিত কাজ স্বরূপ নিজেদের জাতিকেই হত্যা করে মুসলিমদের উপর দায় চাপাতে চেষ্টা করে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ১৯৪০ সালে এসএস প্যাটৃয়া নামক একটি জাহাজে বোমাবর্ষণ করে ১৭৬জন ইহুদিকে হত্যা করে এবং দুই বছর পর আবারও অর্থাৎ ১৯৪২ সালে আরও একটি ইহুদি বোঝাই জাহাজকে উড়িয়ে দিয়ে ৭৬৯জন ইহুদিকে হত্যা করে। বিপরীতে এসব হত্যার দায় মুসলিমদের উপর আরোপ করে ফিলিস্তিন থেকে মুসলিমদের খুব দ্রুত উচ্ছেদ করতে থাকে। একই সাথে ভূখ-জুড়ে ইহুদিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে ইহুদিরা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে ফিলিস্তিনে আসতে শুরু করে। এক পর্যায়ে প্রায় ২০ লাখ ইহুদি ফিলিস্তিনে এসে মুসলমানদের ভূমিগুলো দখল করতে থাকে।

ইহুদিরা যখন গোটা ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলে অঞ্চলে জায়গা দখল করে নিল, ঠিক তখন আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য খ্রিস্টান রাষ্ট্র একত্রিত হয়ে জাতিসংঘে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করে। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘে ভোটাভোটির আয়োজন করা হয়। উক্ত তথাকথিত ভোটে বৃটেন-আমেরিকাসহ মোট ৩৩টি খ্রিস্টান রাষ্ট্র ইহুদিবাদী ইসরায়েলকে প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে ১৩টি রাষ্ট্র ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে ভোট দেয় এবং বাকী ১০টি দেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে। ফলে মুসলমানদের ভূখ-কে একটি ভেল্কি দেখিয়ে নিজেদের ভূখ- করে করে নেয় ইহুদিবাদী ইসরায়েল। মূলত ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পেছনে কড়া নেড়েছিল বৃটিশ-আমেরিকা ও ইউরোপীয় খ্রিস্টান দেশগুলো। চরম ন্যক্করজনক হলে সত্য যে, সে সময় ফিলিস্তিনের খ্রিস্টানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র চার ভাগের এক ভাগ হলেও জাতিসংঘের খ্রিস্টান নেতৃবৃন্দ ইহুদিদেরকে ৫৭% ভূমি ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার জন্য দেয়। অপরদিকে ফিলিস্তিনিদের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য বাকী ৪৩% জায়গা নির্ধারণ করে।

এই ভোটাভোটির কয়েক মাস পর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ১২ মে রাত ১২টা এক মিনিটে ইসরায়েল নামক রাষ্ট্র ঘোষণা দিল ইহুদিরা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ইহুদিরা ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা দেয়ার ১০ মিনিট অতিবাহিত হতে না হতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বাধীনত রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত দেয়। এর পর পরই শুরু হয় অন্যান্য খ্রিস্টান রাষ্ট্র ও সংগঠনগুলোর স্বীকৃতি দেয়ার প্রতিযোগিতা। এভাবেই ফিলিস্তিনিদের ভূমি কেড়ে নেয় ভূমিহীন ও লাঞ্চিত ইহুদি জাতি।

বর্তমান সময়গুলোতে ইহুদিবাদী ইসরায়েল ফিলিস্তিনি মুসলিমদের অবশিষ্ট ভূমিগুলোও একে একে দখল করে নিচ্ছে। সেখানকার মুসলমানদের শত বর্ষের ঘর-বাড়িগুলো ড্রোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনি নারী, শিশু, বৃদ্ধা ও তরুণ-তরুণী ও যুবকদের নানারকম নির্যাতন করছে। ফিলিস্তিনিদের পাখির মত গুলি করে হত্যা করছে। পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিফোন ইত্যাদি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফিলিস্তিনবাসীদের বেঁচে থাকার সব পথ বন্ধ করে দিচ্ছে ইসরায়েলের ইহুদিরা। যখন তখন ফিলিস্তিনি তরুণ ও যুবকদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলের ইহুদি হায়েনাগুলো।

অসহায় ফিলিস্তিনবাসী আজ অবরুদ্ধ। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তারা আজ বাধাগ্রস্থ। কেননা ইসরাইলের ইহুদিরা তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। বেঁচে থাকার জন্য আজ ফিলিস্তিনের মা-বোনেরা পাথর ভেঙ্গে জীবিকা অর্জন করে। অথচ একদিন তারাই ছিল এই ভূখন্ডের বৈধ উত্তরাধিকারী।

আজকের বিশ্বে জাতীয়তাবাদের কবলে পড়ে মুসলমান জাতি তার অপর বিপদে পড়া ভাই-বোনদেরকে সাহায্যে এগিয়ে যেতে পারছে না। বিশেষ করে ইসরাইলের গুটি কয়েক ইহুদিরা যখন ফিলিস্তিনবাসীদের উপর অকথ্য নির্যাতন ও খুন-খারাবি করে থাকে তখন কাটাতাঁরের বেড়ায় পড়ে নিজেদের জাতির বিপদে এগিয়ে যেতে আমরা পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ। কেননা কাটাতাঁরের শৃঙ্খলে আমাদেরকে বন্দী করে ইহুদি-খ্রিস্টান জাতি মুসলিম হত্যায় কূটকৌশলী, উশৃঙ্খল ও সভ্যতার বর্বর হয়ে উঠেছে। যার ফলে মুসলমান জাতি একে একে মার খাচ্ছে চীনে, মিয়ানমারে, কাশ্মীরে, সিরিয়া ও ইরাকসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে!