ফলাফলের হার বৃদ্ধি নাকি মান উন্নয়নে দৃঢ় প্রত্যয়?

গত ৬ এ মে ২০১৯,প্রকাশিত হলো মাধ্যমিক পরীক্ষা অর্থাৎ সেকেন্ডারি  স্কুল সার্টিফিকেট (এস এস সি) পরীক্ষার ফলাফল। 2019 সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল-২১,২৭,৮১৫ জন ছাত্র ছাত্রী। পাশকৃত ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা-১৭,৪৯,১৬৫ জন। গড় পাসের হার ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ। শুধুমাত্র জি পি এ ফাইভ অর্থাৎ সর্বোচ্চ ফলাফল ধারী ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা এক লক্ষ ৫৫৯৪ জন। যদিও গতবারের তুলনায় একটু কম তার পরেও অবিস্মরনীয় ফলাফল! বরাবরের মতো এবারও জিপিএ ৫ এর সংখ্যা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সবচেয়ে বেশি। যে বিপুল সংখ্যক ছাত্র ছাত্রী এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছে তারমধ্যে লক্ষাধিক ছাত্র ছাত্রী জিপিএ ফাইভ অর্জন করেছে নিঃসন্দেহে ফলাফল জাতির কাছে গর্ব ও অহংকারে।

আমরা দুই ধরনের ফলাফল দেখি একটি অফিশিয়াল খাতা কলমে কতটুকু জি পি এ অর্জন করেছে, আরেকটি অর্জিত ফলের মান কতটা বাস্তবসম্মত; আমি আমার উক্তির মধ্যে দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছি, যাহারা  জিপিএ ফাইভ পাচ্ছে তারা কতটুক মানসম্মত শিক্ষা অর্জুন এর মাধ্যমে জিপিএ ফাইভ কিংবা জি পি এ গোল্ডেন ফাইভ অর্জন করেছে। গত বৎসর যারা জিপিএ ৫ অর্জন করেছিল তাদেরকে সাংবাদিকরা কিছু প্রশ্ন করেছিল। যেমন- তুমি ইংরেজিতে বলতো আমি জিপিএ ৫ পেয়েছি। জিপিএ 5 অর্থ কি? এস এস সি অর্থ কি? অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রী উত্তর দিতে পারেনি, যে কয়েকজন ছাত্র ছাত্রী উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছিল উত্তর ছিল হাস্যকর।

ভালো ফলাফলের সাথে সাথে মানসম্মত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে না তার অনেক বাস্তব উদাহরণ আছে, গত বছরগুলোতে দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ ধারী ছাত্র-ছাত্রীদের একটি বিরাট অংশ ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হওয়া তো দূরের কথা ন্যূনতম পাশ করতে পারেনি। জিপিএ ৫ কি লজ্জায় ফেলে দিয়েছে আমাদের! অথচ বিগত সময় আমরা দেখেছি যারা পরীক্ষাতে মোটামুটি ভালো ফলাফল করেছে তারা বড় বড় মঞ্চে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অসাধারণ সফলতা দেখিয়েছে। যারা স্টার, স্টান করেছে তারা তো হয়েছে সেরা মানুষের মধ্যে সেরা।

বর্তমান সময়ে শিক্ষা সম্পর্কিত গবেষণা, তথ্য আদান প্রদান, প্রযুক্তির ব্যবহার সব এখন হাতের মুঠোয় ও পকেটে। তার পরেও কেন শিক্ষার মানের এ বেহাল দশা। এখন দেখা যায় প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীর কাছে স্মার্টফোন উন্মুক্ত ইন্টারনেট কানেকশন, এটাকে তো শিক্ষার জন্য আশীর্বাদ বলতে হবে, তাহলে কেন এই দুর্দশা। ভালো রেজাল্ট  হচ্ছে আগের তুলনায় অনেক বেশি।  তাহলে কেন কোয়ালিটি এডুকেশন হচ্ছে না। কতৃপক্ষকে কোয়ালিটি এডুকেশন এর অন্তরায়গুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আই এল ও) তাদের প্রতিবেদনে বলেছে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা তিন কোটির অধিক তার মধ্যে শুধু শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এক কোটির কাছাকাছি। এক কোটির কাছাকাছি যদি শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী হয়, তাহলে আমাদের  গতানুগতিক চলমান পরীক্ষা  জিপিএ ৫ নির্ভর শিক্ষা  ব্যবস্থার বৃত্ত থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন! অনার্স মাস্টার্স ডিগ্রী ধারী শিক্ষিত আজ বাংলার জমিনে নিষ্ক্রিয় কর্মবিমুখ। বিপুল সংখ্যক বেকারের কর্মসংস্থান যদি না হয়, তাহলে আগামী দিনে যারা ডিগ্রিধারী শিক্ষিত বেকার হবে তাদের কথা আমরা চিন্তা করছি না কেন?

যুগোপযোগী প্রযুক্তি নির্ভর কর্মমুখী, বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করার সময় এসেছে। শুধুমাত্র জিপিএ ৫ আর সার্টিফিকেট লাভ করলেই  বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া জটিল ও কঠিন হবে। জনবহুল চায়না, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইউরোপের দেশগুলোর টেকনিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করা যেতে পারে। চায়নাতে উচ্চশিক্ষা চেয়ে বাস্তব মুখী কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে সামনের দিকে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। আমাদেরকে গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থার বদলে বিজ্ঞান বেইজ, কারিগরি ও আধুনিক শিক্ষাই শিক্ষিত হয়ে বেকারত্বের লাগাম টেনে ধরতে হবে, তবেই জাতি হিসেবে আমরা উন্নয়নের সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হতে পারব।

 

মোঃ সবুর মিয়া।               

 E-mail: sabur2050@gmail.com.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: