উত্তরা নিউজ উত্তরা নিউজ
অনলাইন রিপোর্ট


প্রশাসনের আশ্বাসে উত্তরায় সড়ক অবরোধ স্থগিত করলো শিক্ষার্থীরা






মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান: গত ১৯ মার্চ এর রাজধানীর প্রগতি সরণিতে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস চাপায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালের ছাত্র আবরার নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আজ উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেছে উত্তরার শিক্ষার্থীরা। সকাল সাড়ে দশটা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা হাউজ বিল্ডিংয়ের মূল সড়কের মাঝে অবস্থান নেয় এবং যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এ সময় ছাত্ররা- “আমার মায়ের কান্না-আর না আর না, আমার ভাই মরলো কেন?-জবাব চাই জবাব চাই, ওভারটেকিং ওভারটেকিং- চলবে না চলবে না, নিরাপদ সড়ক চাই-বাঁচার মত বাঁচতে চাই, ছাত্র পুলিশ ভাই ভাই-নিরাপদ সড়ক চাই, নেতা হতে আসি নাই- নিরাপদ সড়ক চাই, সিটিং বাসে চিটিং ভাড়া-বন্ধ করো বন্ধ করো” ইত্যাদি স্লোগানে চারপাশ প্রকম্পিত করে তোলে।
ছাত্র নিহতের প্রতিবাদে আট দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানায়, আমরা আবরার হত্যার বিচার চাই। আমাদের একটাই চাওয়া যাতে করে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আর যেন একটি প্রাণও না ঝড়ে যায়। আমরা চাই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজে নিয়েজিত প্রশাসন যেন নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে। প্রশাসনের লোকেরা যদি ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় না নামতে দেয়, লাইসেন্সবিহীন চালককে গাড়ি চালাতে না দেয়, যেসব চালক প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালায় সে সব চালকদের তাৎক্ষণিকভাবে আইনের আওতায় শাস্তি প্রদান করা হয়, তাহলেই দেশের সড়কে পরিপূর্ণভাবে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। আজকে শুধুমাত্র প্রশাসনের অবহেলার কারণেই আমাদের ছাত্র ভাইদেরকে মরতে হচ্ছে। বেপরোয়া বাস চালকদের দৌরাত্ম্যের শিকার হয়ে, আগামীকাল আমাকেও যদি বাসের চাপায় পিষে মরতে হয়, তবে এর দায়ভার কে নিবে?
উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা ছাত্র নিহতের প্রতিবাদে আন্দোলন চালাতে লাগলে দুপাশের সড়কে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। ফলে যাত্রীদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। আন্দোলনের প্রভাবে বন্ধ হয়ে যায় উত্তরা এলাকার অন্যান্য প্রধান প্রধান সড়কগুলোও। ফলে পুরো উত্তরাতে যান চলাচলে বিঘœ ঘটে।
এরকম পরিস্থিতিতে বেলা ২টা ৩০মিনিটে আন্দোলন স্থানে ছুটে আসেন ডিএমপি উত্তরা জোনের অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ কমিশনার কামরুজ্জামান সরদার, ট্রাফিক বিভাগ উত্তরা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার জুলফিকার আলী ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। উপস্থিত ছিলেন ডিএনসিসি ১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আফসার উদ্দিন খান ও ৫১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শরিফুল ইসলাম। এ সময় অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ কমিশনার কামরুজ্জামান সরদার আন্দোলনরত শিক্ষার্থী উদ্দেশ্যে বলেন, “আজকে আপনারা যারা ছাত্র সমাজ আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছেন আমরাও আপনাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছি। আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন এতে কোনো বাধা প্রদান করা হবে না। তিনি বলেন, একসময় আমরাও ছাত্র ছিলাম আমরাও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলনে শরিক হয়েছিলাম। গতকাল যে ছাত্র ভাইটি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে তা সত্যিই আমাদের জন্য চরম দুঃখজনক। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সড়কে যেন আর একটিও দুর্ঘটনা না ঘটে সেদিকে আমরা বিশেষ লক্ষ্য রাখব। কারণ আগামীকাল আমার ভাই, আমার ছেলে অথবা আমার পরিবারের কেউ না কেউ এভাবে সড়কে বাস বা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যাবে এটি কখনোই হতে পারে না। আর তাই আমরাও আপনাদের সাথে আজকের এই যৌক্তিক আন্দোলনে একমত পোষণ করছি।
এ সময় শিক্ষার্থীরা অগ্নিকন্ঠে প্রশাসনের কাছে জানতে চায়, রমিজ উদ্দিন এর দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পরও কেন সড়কে আবারও জাবালে নূর পরিবহন চলছে কেন? গতকালকে সুপ্রভাত বাস চাপা দিয়ে আবরারকে হত্যা করার পরও আজ আবার সুপ্রভাত বাস চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে! আসলে আপনারা আমাদেরকে গতবারও আশ্বাস দিয়েছেন আর এবারও এসেছেন আশ্বাসের ফুলঝুড়ি নিয়ে, কিন্তু এবার আমরা ¯পষ্ট করে বলতে চাই আমরা কোন কথার ফুলঝুড়িতে বিশ্বাসী নয়। আমরা বাস্তব প্রমাণ চাই। শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, আমাদের পিতা-মাতার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপার্জন করে আর সেই অর্থ দিয়ে পড়াশোনা করতে আমাদেরকে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে পাঠায়। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে অথবা ফেরার পথে যদি আমাদের লাশ হয়ে ফিরতে হয়, তাহলে এত বড় কষ্ট আমাদের পিতা-মাতারা কোথায় রাখবে? আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর জবাব চাই?
পরে শিক্ষার্থীদেরকে শান্ত করতে উপস্থিত বক্তব্য প্রদান করেন উত্তরা ইউনিভার্সিটি স্কুল অব বিজনেস বিভাগের প্রফেসর মাহমুদুল হাসান। এসময় তিনি বলেন, “আজকে যারা ছাত্ররা এখানে উপস্থিত আছো, তোমাদের সাথে আমরা শিক্ষকরাও একমত পোষণ করছি এবং সেইসাথে প্রশাসনকে একটি কথাই বলবো আপনারা আপনাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করুন। তাহলেই আমরা মনে করি সড়কে মৃত্যুর আহাজারি আমাদেরকে আর দেখতে হবে না। মাহমুদুল হাসান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, তোমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছো এটি খুব ভালো। কিন্তু দীর্ঘক্ষন যান চলাচল বন্ধ থাকলে দেশের সাধারণ মানুষেরা কিন্তু চরম বিপাকে পড়বে। তাই তোমাদের উচিত তোমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনকে সময় দেয়া। আর তাই প্রশাসনকে সহযোগিতার মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজে তোমাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে।
পরে শিক্ষার্থীদেরকে আজকের মত সড়ক থেকে সরে যেতে বললে, শিক্ষার্থীরা কিছুতেই সরবে না বলে ডঊ ডঅঘঞ ঔটঝঞওঈঊ শ্লোগান তুলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ কমিশনার কামরুজ্জামান সরদারের অনুরোধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে আজকের মতো স্থগিত করার সিদ্ধান্ত জানায়, তবে এক্ষেত্রে আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে মর্মে সড়ক ছাড়তে রাজি হন শিক্ষার্থীরা। উপস্থিত প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আশ্বাসের একপর্যায়ে শান্ত হলেও আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থ হলে আবারও রাস্তায় নামবে বলে হুংকার ছাড়ে শিক্ষার্থীরা। বেলা ৩ টা ৪০ মিনিটে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক থেকে শিক্ষার্থীরা সরে দাঁড়ালে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।