প্রবীণদের সুরক্ষা- বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট


» উত্তরা নিউজ টোয়েন্টিফর, ডেস্ক রিপোর্ট | | সর্বশেষ আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০১৯ - ১১:০৫:৫১ পূর্বাহ্ন

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও গুরুত্ব সহকারে ১ লা অক্টোবর পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারিত ছিল ‘The Journey to Age Equality’ তথা ‘বয়সের সমতার পথে যাত্রা’। সব বয়সীদের জন্য সমান উপযোগী সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতিসংঘের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, প্রধান কার্যালয়, আগারগাও ও দেশ জুড়ে এই সংস্থার শাখা সমুহ দিবসটি উদযাপন করল যথাযোগ্য মর্যাদায়।

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ উত্তরা শাখার উদ্যোগে দিবসের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হয়েছে বর্ণাঢ্য র‍্যালি। অপরাহ্ণে সফল আলোচনা অনুষ্ঠান করে দিবসটি উদযাপন করা হয়। এডভোকেট সাহারা খাতুন এম পি (সাবেক মন্ত্রী), প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা সিটি করপরেশনের কাউন্সিলর আলহাজ্জ আফছার উদ্দিন খান, ওয়ার্ড নং ১, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নাসির উদ্দিন, ওয়ার্ড ৫৩ এবং মোহাম্মাদ শরীফুর রহমান, ওয়ার্ড নং ৫১ এর অংশ গ্রহণ ও প্রবীণ কল্যাণে গঠনমূলক বক্তব্য রাখেন যা উপস্থিত সবাইকে অনুপ্রাণিত করেন।

১ লা অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসকে উৎসর্গ করেই নিম্নের এই উপস্থাপনা।  

বার্ধক্যে উপনীত ব্যক্তিদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বর্তমানে এদের সংখ্যা প্রায় ১৫০ লাখ। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা – ২০১৩ অনুযায়ী ২০৫০ সালে তা মোট জনসংখার ২০% হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে অর্থাৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হবে প্রায় ৪৫০ লাখ। প্রবীণ ব্যক্তির সংজ্ঞা নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে, তবে বয়সের মাপকাঠিতে প্রবীণত্ব নির্ণীত হয়ে থাকে। শিল্পোন্নত দেশে এ বয়স সীমা ৬৫ বৎসর হলেও আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ও জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে এ বয়স ৬০ বৎসর এবং এরা দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিক। প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ, দারিদ্রমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রবীণ বান্ধব সরকার প্রণয়ন করেছে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা – ২০১৩ এবং বিভিন্ন জাতীয় নীতিমালায় এই নীতিমালায় বিধৃত লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করে বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটির মাধ্যমে এর যথাযথ বাস্তবায়নের তাগিদ দিচ্ছে।

১৯৮২ সালে বয়স্কদের সমস্যা নিরসনে আন্তর্জাতিক কর্মপরিকল্পনা এবং প্রবীণ কল্যাণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ লা অক্টোবরকে বিশ্বব্যপি আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসচ্ছে।

শুরু থেকে প্রবীণদের কল্যাণে বিভিন্ন স্লোগান/ প্রতিপাদ্য বিষয় সামনে রেখে আন্তর্জাতিক ভাবে প্রবীণ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এপর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে – ‘বয়স্কদের অধিকার’,‘বিশ্ব সমাজ হবে সকল প্রজন্মের’,‘বয়স্কদের জীবন মান উন্নয়ন’,‘বয়স বৈষম্য দূরকরণ’,‘প্রবীণদের সম্ভাবনা ও অন্তরায়’,‘আগামীর পথে প্রবীণদের সাথে’,‘থাকবনা কেউ পেছনেঃ গড়ব সমাজ একসনে’।‘বিশ্ব সমাজ হবে সকল প্রজন্মের’ এ লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালকে প্রবীণবর্ষ ঘোষণা ও করা হয়েছিল।

প্রবীণ দরদী সরকার ইতিমধ্যেই ৪০ লক্ষ দুঃস্থ অসহায়, (৬৫ বৎসর বয়সের পুরুষ এবং  ৬২ বৎসরের মহিলা) প্রবীণ বয়স্কভাতা পান এবং প্রায় ৫ লক্ষ প্রবীণ পেনশন পান। প্রায় ২৫০ হাজার মুক্তি যোদ্ধা নির্ধারিত ভাতা পান যাদের সবাই এখন প্রবীণ। এর বাইরে থেকে যায় অনেক প্রবীণ যারা অবহেলিত। তাই প্রবীণ দরদী বর্তমান সরকার ইতিমধ্যেই দেশের ৮৫ টি শিশু পরিবারের প্রত্যেক টি তে ১০ টি করে মোট ৮৫০ আসন প্রবীণদের জন্য সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করেছেন। প্রতিটি হাসপাতালে জেরিয়েট্রিক বিভাগ চালু করা এবং জেরিয়েট্রিক মেডিসিন এ প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তোলার তাগিদ দেয়া হচ্ছে।

প্রবীণদের জন্য প্রয়োজনঃ-

  • তাঁদের কল্যাণে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও তা বাস্তবায়ন
  • আর্থিক নিরাপত্তা সহ তাঁদের সার্বিক সুরক্ষা
  • দীর্ঘমেয়াদী যত্ন ও যাতনা প্রশমন সেবা / প্যালিয়েটিভ কেয়ার
  • বার্ধক্য বীমা / স্বাস্থ্য বীমা এবং সার্বজনীন সামাজিক পেনশন / ভাতা ব্যবস্থা
  • সব ধরণের সুযোগ সুবিধা সহ পর্যাপ্ত প্রবীণ নিবাস স্থাপন
  • সব ধরণের সুযোগ সুবিধা সহ নিরাপদ আবাসন / বয়স্কদের জন্য আনন্দ নিবাস
  • প্রবীণ কল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর গঠন
  • প্রবীণ নির্যাতন প্রতিকারের জন্য প্রয়োজন আলাদা ট্রাইইবুনাল যেমনটি রয়েছে নারী ও শিশুদের জন্য
  • প্রবীণ উন্নয়ন ফাউনডেশন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন
  • প্রচার মাধ্যমে প্রবীণদের অবস্থা তুলে ধরে জনগণকে সচেতন ও সক্রিয় করা

সেবা প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহীতাদের ভিড়ের কারনে এবং প্রবীণ বান্ধব সেবা ব্যবস্থা না থাকার কারনে প্রবীণদের সেবা গ্রহণ কষ্টকর। আমাদের অবকাঠমো কি প্রবীণ বান্ধব? রাস্তা ঘাট, ফুট পথ, ফুট ওভার ব্রিজ পরিকল্পনায় আমরা কি প্রবীণদের কথা স্মরণে রাখি? বয়স্কদের জন্য শান্তি ও স্বস্তিময় ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবী এবং এটা করার দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের এবং তা করা না গেলে প্রবীণ জনগোষ্ঠী এক সময় বোঝা হবেই। এই মানুষগুলো বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত ও বার্ধক্যের বিড়ম্বনার শিকার। তাঁরা সমাজ-সংসার থেকে এখনও প্রায় বিচ্ছিন্ন। এরা হতাশাগ্রস্থ, এদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

জাপান, সুইডেন, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার, চীন, মালয়েসিয়াতে রয়েছে সামাজিক পেনশন ব্যবস্থা। উন্নত দেশের কথা বাদ দিলেও ভারত ও নেপালেও সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। ভারতে সিনিয়র সিটিজেনদের জীবন ও সম্পদ সংরক্ষণ, জীবন যাপনের মূল চাহিদা পূরণ, সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার অবহেলায় শাস্তির বিধান, গণপরিবহনে আসন সংরক্ষণ ও হ্রাসকৃত মূল্যে সেবা প্রদান, বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ও হ্রাস কৃত মূল্যে সেবা প্রদান নিশ্চিত করা হয়েছে। রয়েছে প্রবীণদের জন্য পৃথক হাসপাতাল, দিবা যত্ন সেবা কেন্দ্র ও পুলিশি সেবা।

আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, প্রবীণদেরও থাকতে পারে যুক্তিসঙ্গত চাহিদা, প্রয়োজন ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তা। বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রবীণরা আজ অনেকটাই অবহেলিত, এরা পরমুখাপেক্ষী, নিগৃহীত। বার্ধক্য অবধারিত আর প্রত্যেক মানুষই চায় তাঁর বার্ধক্য হোক স্বস্থিময় ও আনন্দময়; অথচ সার্বিক সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে তাঁদের জীবন অতিবাহিত করতে হয়।

নারীশিক্ষার প্রসার, কর্ম সংস্থানের সুযোগ, অপরিসর বাসস্থান এবং বয়স্কদের ভিন্নভাবে বসবাসের আয়োজন না থাকার ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্রিয়াশীল নয় এবং শারীরিকভাবে পরনির্ভরশীল এমন বয়স্ক মানুষগুলোকে সার্বিক নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা। বি বি এস’র তথ্যমতে প্রবীণ জনসংখ্যার প্রায় ৬৮% কোন আয়ের সাথে যুক্ত নন এবং ৭৫ বৎসর বয়সের বেশি মানুষগুলোর প্রায় ৬৫%  অর্থনৈতিকভাবে ক্রিয়াশীল নয়।

প্রবীণ দরদী সরকার প্রণীত জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা – ২০১৩ তে  প্রবীণদের জন্য (১) সামাজিক সুযোগ- সুবিধা (২) জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা (৩) দারিদ্র দূরীকরণ (৪) আর্থিক নিরাপত্তা (৫) স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও পুষ্টি এবং (৬) বিশেষ প্রতিকূল অবস্থায় বিশেষ সেবাযত্ন ও বিশেষ কল্যাণ কার্যক্রম নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে, কিন্তু তা জানেনা  প্রবীণ নিজেও। এসব এখনও অনেকখানি সহানুভুতি ও সান্তনার বানী। তাই আসুন, প্রবীণদের কল্যাণে প্রবীণ দরদী সরকার প্রণীত ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা – ২০১৩’ বাস্তবায়নে আমরা সকলে সক্রিয় ভূমিকা পালন করি।

 

লেখক- ডাঃ মোঃ ইমাম হোসেন ( অবসর প্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ), সাধারণ সম্পাদক

বাংলদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, উত্তরা শাখা