প্রতিষ্ঠার ৪২ বছরে বিএনপি লক্ষে যাওয়ার লক্ষন নেই


» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ০৬:১৮:০১ অপরাহ্ন

বদরুল আলম মজুমদার: ক্ষমতামুখী রাজনৈতিক দল বিএনপি ৪২ বছরে পা দিল। দলটি তিনবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলেও গত প্রায় ১৩ বছর থেকে ক্ষমতার বাইরে। নতুন করে ক্ষমতায় আসতে অনেক কর্মকান্ড করতে দেখা গেলেও কার্যত ফল হয়েছে শূন্য। উপরন্ত দূর্নীতির দুটি মামলায় দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গত প্রায় দেড় বছর থেকে জেল খানায়। দলের অপর বড় নেতা তারেক রহমান ফেরারী হয়ে আছেন লন্ডনে। এ অবস্থায় দলটির নেতাকর্মীরা হতাশা ছাড়া আর কিছুই চোখে দেখছেন না। এ হতাশা মূলে নেতাদের ভুল সিন্ধান্তও অনেকাংশে দায়ী। আবার এ দলটির নেতারা সবাই প্রায় ক্ষমতা কেন্দ্রীক। ক্ষমতা কেন্দ্রীক রাজনৈতিক চিন্তা বা লাভালাভের বিষয় থাকায় বিএনপি নামক দলটি একটি সমিতিতে রুপান্তর হতে চলেছে। আর কতৃত্ব ধরে রাখতে গিয়ে ক্রমেই সিন্ডকেট বন্দ্বী হচ্ছে বৃহৎ এ দলটি। অথ্যাৎ কয়েজন নেতা বা একটির গোষ্টির বাইরে দলকে বের করে আনা যাচ্ছে না। আর শীর্ষ নেতৃত্বও অনেকটা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত। এই সিন্ডিকেট বন্দ্বীত্ব কি স্বইচ্ছায় আছেন না এর থেকে বের হতে পারছেন না তা জানার উপায় আমাদের নেই।
প্রতিষ্ঠার পর গত ১ যুগ ধরে কঠিন সময় পার করছে বিএনপি। ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করেও কোন কূল পাচ্ছে না দলটি। দলের সাংগঠনিক অবস্থাও তেমন সুবিধার নয়। আবার সংগঠন ঘোছানোর কথা বলে যা করা হচ্ছে তাও আশাপ্রদ হচ্ছে না বলে মনে করা হচ্ছে। এ অবস্থায় দলটির সামনে কি করণীয় তাও নির্ধারণ করতে পারছেন না কান্ডারীরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্দোলন ছাড়া দলের সামনে কোন পথ নেই। কিন্তু সেই আন্দোলন কিভাবে হবে তার কোন উত্তরও নাই নেতাদের মুখে। ২০১৫ সালে সরকার বিরোধী আন্দোলনের ব্যর্থতার পর দল ঘোছানোর কথা বলেই ৫ বছর পার করেছে দলটি। তারপরও একটি কার্যকর আন্দোলনমুখী দল দাড় করাতে পারেননি দলটি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সমালোচকরা বলছেন, মহাসিচব হিসেবে মির্জা ফখরুল কখনোই দলকে আন্দোলনের জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন না। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, মহাসচিব নিজে একজন ভিতু প্রকৃতির লোক। প্রেসার সহ্য করার মতো ‘ক্যপাভিলিটি’ তার নেই। তাছাড়া বোরখা পড়ে যেইদিন তিনি পল্টন অফিসে গেছেন, সেই দিনই বিএনপির রাজনীতি শেষ হয়ে গেছে। দলটি এখন বেছে আছে শুধু তৃর্ন্যমূল নেতা-কর্মীদের ভালোবাসায়। এনিয়ে দলের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশও নাখোশ মহাসিচবের উপর। তারপরও কিছু করার নেই বলে মনে করছেন তারা। কারণ এই মূহুর্তে মহাসচিব বদল করার মতো অবস্থায় নেই বিএনপি। সামনের কাউন্সিলে এ বিষয়টিতে বড় একটি পয়সালা হতে পারে বলে মনে করছেন দলের অধিকাংশ নেতা।
তবে নেতারা বরাবরই বলে আসছেন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন জোরদার করতে হবে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংগঠন গোছানো, ৪২তম বছরেই কাউন্সিল করা এবং নির্বাচন আদায়সহ বৃহত্তর ঐক্য গড়ার লক্ষ্যকেই দলটি এখন প্রাধান্য দিতে চাইছে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের কোনো কোনো নেতা মনে করেন, নতুন বছরে যে প্রত্যাশা নিয়ে তাঁরা এগোতে চান, তা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে তাঁদের মধ্যেও সংশয় আছে।

কাল ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রয়াত জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় দুই বছর ধরে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে ছাড়াই বিএনপিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্দোলনের কোনো উপায় নেই জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমাদের এখন খুব কেয়ারফুলি এগোতে হবে। রাজনীতি করতে গিয়ে দলকে ধ্বংস করে দেওয়া যাবে না। কিছু করতে গেলেই ধরে নিয়ে যাবে, মামলা দেবে। যতক্ষণ না কোনো সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে আন্দোলনের ততক্ষণ পর্যন্ত কিছু করা সম্ভব না।’
দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে খালেদা জিয়া ১৮ মাস ধরে কারাগারে আছেন। বিএনপি অভিযোগ করে আসছে, সরকার মিথ্যা মামলায় তাঁকে আটকে রেখেছে। তবে তাঁর মুক্তির জন্য বিএনপি সভা, সমাবেশ বা অনশনের বাইরে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। স্থানীয় পর্যায়ে দলের নতুন করে কার্যকরী কমিটি করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বকে শক্তিশালী করে দল গোছাতে শুরু করেছে বিএনপি। এ ছাড়া অঙ্গসংগঠনগুলোতেও নতুন করে কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের কাউন্সিল। সেখানে ২৭ বছর পর বিএনপির এই অঙ্গসংগঠন নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে। ঈদুল আজহার আগ দিয়ে দলের শীর্ষ নেতারা কয়েকটি বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করেছিল। বাকি শহরগুলোতেও করার কথা রয়েছে।

বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিল হয় ২০১৬ সালের মার্চে। তিনবছর পর পর তাদের কাউন্সিল হওয়ার কথা। সে হিসেবে এ বছরের মার্চে কাউন্সিলের সময় ছিল। দলীয় প্রধানকে কারাগারে রেখে কাউন্সিল করবে কিনা তা নিয়ে নেতাদের মধ্যে সংশয় ছিল। তবে দলটি এখন কাউন্সিল করার ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থানে এসেছে। দলীয় সংগঠনগুলো গুছিয়ে এনে ৪২তম বছরেই তারা কাউন্সিল করার কথা ভাবছে। দলের এক সূত্র জানায়, এ বছরের ডিসেম্বরে দলীয় কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দশম জাতীয় সংসদে নির্বাচনে দলটি অংশ নেয়নি। এবার নির্বাচনের আগ দিয়ে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে আহ্বায়ক করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে জোট গঠন করে বিএনপি। নাগরিক ঐক্য, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নিয়ে গঠিত এ জোট বেশ আলোচিত ছিল। একই ব্যানারে নির্বাচনও করে তারা। তবে নির্বাচনের পরপরই জোটের নেতাদের অসন্তোষ প্রকাশ্য হতে থাকে। গত পাঁচ মাস ধরে জোটটি নিষ্ক্রিয়। এর মধ্যে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ জোট ছেড়ে দিয়েছে। বিএনপির আরেক পুরোনো জোট ২০ দলেও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে। সে জোটের সঙ্গী বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থও জোট ছেড়ে দিয়েছেন। এ জোটেরও কার্যক্রম নেই।

বেশ কয়েক মাস থেকেই বিএনপি আবার বৃহত্তর ঐক্য গড়ার কথা বলছে। দলের এক সূত্র জানায়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দলসহ সরকার বিরোধী অন্যান্য দলগুলোকে নিয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে চায়। দৃশ্যমান কোনো বৈঠক বা সভা না হলেও নিজেদের মধ্যে নেতারা এ ব্যাপারে আলোচনা করছেন। পুনরায় নির্বাচন আদায়ের দাবিতে বিএনপি আরেকটি ‘বড়’ জোট গড়তে চায়।

বিএনপির রাজনীতির বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, এখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর, অনেকটা অনুপস্থিত। গণতন্ত্র উদ্ধার আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গঠনের লক্ষ্য এখনো আমাদের মধ্যে জাগ্রত। সেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার সংগ্রামেই আছি আমরা। বিএনপি দুরবস্থা বা কঠিন সময় পার করছে কিনা, এ প্রসঙ্গে গয়েশ্বর বলেন, বিএনপি যতটুকু কঠিন সময় পার করছে তার চেয়ে বেশি কঠিন সময় পার করছে জনগণ। জনগণের অবস্থা ভালো থাকলে বিএনপির অবস্থা খারাপ থাকার কথা নয়। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার চক্রান্তের একটি অংশ হিসেবে হচ্ছে খালেদা জিয়া কারাগারে। গণতন্ত্রের মুক্তি আর খালেদা জিয়ার মুক্তি এক ও অভিন্ন।