‘পাবজি’ গেইম এ আপনার সন্তান কি আসক্ত?


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১৫ মে ২০২০ - ১১:৪৫:৫৮ পূর্বাহ্ন

আপনার সন্তান সারাদিন কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কতক্ষণ ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকছে- তার কতটুকু খেয়াল রাখেন?। আপনার আদরের সন্তানটি প্রযুক্তির ব্যবহারের নামে কোনো বিশেষকিছুর প্রতি আসক্ত নয় তো?। নিকট অতীতে এমনই একটি আলোচিত বিষয় প্লেয়ার আননোওন’স ব্যাটলগ্রাউন্ড (পিইউবিজি বা পাবজি) গেম। এ গেম এমনই এক আসক্তি, যা আপানার সন্তানকে পরিবার-পড়াশোনা বা সামাজ ব্যবস্থা থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যে সব তরুণ-তরুণী বা শিক্ষার্থীরা এ ধরনের গেমে আসক্ত থাকে, তারা যে কোনো ধরনের অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা এ গেম খেলতে খেলতে তার মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

তাসমিয়া রহমান (ছদ্মনাম) ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ তৃতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। এইচএসসিতে পড়ার সময় বন্ধুদের মাধ্যমে প্রথম ‘পাবজি’ গেমটির সঙ্গে পরিচয়। একটু একটু করে খেলতে খেলতে এখন সে পুরোপুরি আসক্ত। যার ফলে পরিবার ও স্বজনদের থেকে অনেকটা নিজেকে আলাদা করে রাখে এবং মোবাইল ফোন নিয়ে পড়ে থাকে। বিষয়টি দেরিতে হলে পরিবারের নজরে আসে এবং তাকে এক পর্যায়ে মানসিকভাবে অসুস্থ ভাবতে শুরু করে। এজন্য চিকিৎসকের পরামর্শে তার মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়। পরে শর্তসাপেক্ষ সেটি ফিরে পেলেও ছাড়তে পারেননি পাবজি আসক্তি। এজন্য সে পরিবারের চোখকে ফাঁকি দিতে নতুন কৌশল হিসেবে সপ্তাহে একদিন গ্রুপ স্টাডির নাম করে বান্ধবীর বাসায় থাকে এবং দুজন মিলে পাবজি খেলে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস শেষ হলেও চলে যায় বান্ধবীর বাসায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাসমিয়া বলেন, এ গেম একা ও গ্রুপে খেলা যায়। মাঠে অনেকগুলো টিম ছাড়া হয়। সবাইকে মেরে যে বেঁচে থাকবে সেই জয়ী হয়। বেশিরভাগই গ্রুপে খেলতে পছন্দ করে। শুরুর দিকে আমি একা খেললেও এখন টিম বানিয়ে খেলি। গ্রুপ করে খেলতে গেলে ওভার ফোনে ইনস্ট্রাকশন দিতে হয়। মানে একা বসে বসে কথা বলার মতো। আবার খেলার সময় যেন কেউ বিরক্ত না করে সেজন্য একা থাকতে হয়। মানে অন্য কোথাও মনোযোগ দেওয়া যাবে না। এসব কারণে আমার পরিবার আমাকে মানসিকভাবে অসুস্থ মনে করে চিকিৎসাও করায়। পরে তারা মোবাইল কেড়ে নেয়। গেম না খেলার শর্তে মোবাইল ফিরিয়ে দিয়েছে। তবে এখন বাসায় খেলি না। সপ্তাহে একদিন বান্ধবীর বাসায় গিয়ে থাকি, আর পাবজি খেলি। বাসা থেকে কোথায় আছি জানতে চাইলে জানাই, ক্লাস আছে, অথবা লাইব্রেরিতে আছি।

এ ধরনের আসক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব গেমে আসক্তির কারণে কিশোররা পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। খেলার এক পর্যায়ে এসে তারা ভায়োলেন্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি এটি আলোচিত আরেক ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি করবে কী না তা খোঁজ রাখতে অভিভাবক ও রাষ্ট্রকে আহ্বান জানান তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারজানা রহমান বলেন, এ জাতীয় গেইমিংয়ে ভাইয়োল্যান্সের আশঙ্কা থাকে। যেটি মারাত্মক ক্ষতিকর। বাবা-মাকে সেদিকটি গুরুত্ব দিয়ে খেয়াল রাখতে হবে, তার সন্তান কি করছে, কিসে আসক্ত হচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে সবকিছু।

মনোবিদ অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান বলেন, এসব ভায়োলেন্ট গেম সাইকোলজিক্যালি মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এসব আকর্ষণীয় গেমের প্রতি আসক্ত হতে হতে কখন অপরাধপ্রবণতা দিকে ধাবিত হয় সেটা সে বুঝতে পারে না।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান জানান, বাচ্চাদের রিক্রিয়েশনের জন্য অভিভাবকরা গেইমিংয়ের আশ্রয় নেন। কিন্তু এসব অ্যাক্টিভিটিগুলোর আসক্তি যে একটা বাচ্চাকে ধারাবাহিকভাবে চরম প্রভাব ফেলতে পারে সেটা বুঝতে পারে না। তারা বেশি ঝুঁকে যাওয়ার মাধ্যমে পারিবার ও সামাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। নিজের ন্যাচারাল লাইফস্টাইল ভুলে যায়। যেটা মারাত্মক ক্ষতির দিকে ধাবিত করে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হতে পারে এমন কোনো বিষয় রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না। যদি কোনো অভিভাবক এ বিষয় নিয়ে আদালতের দারস্থ হন তাহলে অবশ্যই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেবেন। যেহেতু এ ধরনের বিষয়সমূহ পর্যবেক্ষণ করা তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাই সেখানেও অভিভাবকরা অভিযোগ জানাতে পারেন। এর আগেও আমরা ব্লু হোয়েল গেমে আসক্ত হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও আত্মহননের মতো বিষয়গুলো সংবাদ মাধ্যম থেকে জেনেছি। তাই, খেলার আড়ালে যেন অন্যকিছু ঘটতে না পারে তা নিয়ে অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

 

সূত্র: রাইজিংবিডি