পরিবেশের রক্ষাকবচ হলো বন -উম্মে ফারুয়া


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২০ - ০৮:১৬:৪০ অপরাহ্ন

মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের পাশাপাশি প্রয়োজন সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ। পরিবেশ সুরক্ষায় বনের গুরুত্ব অপরিসীম। অবারিত ফসলের মাঠ আর বৈচিত্র্যময় বনাঞ্চল মিলে সবুজ শ্যামলীমায় পূর্ণ আমাদের বাংলাদেশ। পাহাড়ী চিরসবুজ ও মিশ্র চিরসবুজ বন, উপকূলীয় সুন্দরবন এবং শালবন নিয়ে এদেশের বনাঞ্চলের বিস্তৃতি। বনের বৃক্ষ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে। ছায়া দেয়, ফল দেয় ও ফুল দেয়। বন্যপ্রাণীদের খাবার ও আশ্রয় দেয়। বৃক্ষ ভূমিক্ষয় রোধ করে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বা দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক। একদিকে বন যেমন মনুষ্য সভ্যতার জন্য জরুরি অপরদিকে তা বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল। অথচ সারা পৃথিবীতে মানুষ আজ বিভিন্নভাবে বনভূমি ধ্বংসের যজ্ঞে মেতেছে। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে পৃথিবীর বনভূমি রক্ষা করা ছাড়া কোনো গতি নেই। এ সত্যকে সামনে রেখে ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টের ২৩তম সাধারণ সভায় জাতিসংঘের মহাসচিব ২১ মার্চকে ‘বিশ্ব বন দিবস’ ঘোষণা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ২১ মার্চ ‘বিশ্ব বন দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। এবারের ২০২০ সালের বিশ্ব বন দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- “Forests and Biodiversity-Too precious to lose” “বন ও জীববৈচিত্র্য-মূল্যবান অতি হারালে অপূরণীয় ক্ষতি”। বাংলাদেশও এ দিবসটি সাড়ম্বরে পালন করে থাকে।

বিশ্ব বন দিবসের মূল তাৎপর্য হলো পৃথিবীব্যাপী মানুষের মধ্যে বনের সংরক্ষণ উৎপাদন ও বনের মাঝে বিনোদন সম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

বনকে ইংরেজিতে Forest বলা হয়। মিডল ইংলিশ Forest থেকে Forest শব্দের উৎপত্তি। প্রাচীন সরল ভাষাতেও Forest (Fores) বিশাল জায়গা জুড়ে বৃক্ষরাজির সমাহার বোঝাতো। যেখানে বিশাল এলাকায় প্রচুর সংখ্যক ঘন গাছ-পালা রয়েছে সেই জঙ্গলকে বন বলা হয়। শহরেও গাছপালা রয়েছে সেটাকে বন বলা হয় না। পৃথিবীর মূল ভূ-খণ্ডের শতকরা ৯.৪ ভাগে অর্থাৎ পৃথিবীর মোট ভূমির ৩০ শতাংশে বন রয়েছে। তবে এক সময় পৃথিবীর নানা অংশে মোট ভূমির প্রায় ৫০ শতাংশে বন ছিল এবং তা উদ্ভিদের আবাস হিসেবে কাজ করতো। বন হলো একটি জীবমণ্ডল যেখানে তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র বৃক্ষ, ছত্রাক ও প্রাণীবাসের দরুন তা বাস্তুতন্ত্রে পরিণত হয়। এই বাস্তুতন্ত্রে ভৌতিক ও রাসায়নিক কর্মকাণ্ড যেমন শক্তি প্রবাহ ও পুষ্টিচক্র সংঘটিত হয়।

একটি আদর্শ বন উঁচু বৃক্ষস্তর, গুল্মস্তর ও ওষুধিস্তর, শেওলাস্তর ও মাটির অণু প্রাণী নিয়ে গঠিত। জটিল বনে অধিকতর নিচু বৃক্ষস্তরও থাকে। মানুষের জীবন বনের উপর নির্ভরশীল। বন মানুষকে বহুসম্পদ উপহার দেয়। এরা এদের দেহে কার্বন জমা করে ও উদ্ভিদ সংক্রান্ত আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এরা পানিকে বিশুদ্ধ করে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ-সৃষ্ট বন্যা ঠেকায়। বন পৃথিবীর প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ জীবনবৈচিত্র্য রক্ষা করে।

পৃথিবীর মানুষেরা ক্ষুদ্র স্বার্থে বনভূমি ধ্বংস করে নিজেরাই নিজেদের কবর রচনা করছে। নরকে রূপান্তর করছে ইট পাথরের তপ্ত নগরগুলিকে। যেখানে বিশুদ্ধ বাতাস, সুপেয় পানি, সবুজ ছায়া, পাখিডাকা ভোর, নদীর কলকল ধ্বনি খাল-বিলের স্বচ্ছ জলের প্রবাহ এমনকি জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ নেই। পৃথিবীতে প্রতি বছর গড়ে এক শতাংশ ক্রান্তীয় বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে মানুষের নিষ্ঠুর নগ্ন হাতে। বিগত ৭০ বছরে পৃথিবীর মোট ক্রান্তীয় বনভূমির প্রায় ৫০ শতাংশ উজাড় হয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে বিরান হয়ে যাওয়া বনভূমির যে চিত্র পাওয়া যায়, তা বিশ্লেষণ করে বলা হচ্ছে যে, প্রতি বছর পৃথিবী থেকে পৌনে দুই থেকে দুই কোটি হেক্টর বনভূমি মানুষের অবিবেচনা প্রসূত কর্মকাণ্ডে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে শুধু বনভূমিই নয়, এর সঙ্গে বনে বসবাসকারী হাজার প্রজাতির কোটি কোটি জীব-জন্তুর জীবনও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। বাসস্থান হারিয়ে এদের অনেকেই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বে শিল্পায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আইলা, সিডর ও মহাসেনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে মানুষ। অন্যদিকে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে বাড়ছে সমুদ্রের পানির উচ্চতা, যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লোনাপানিতে ডুবে গিয়ে সৃষ্ট হচ্ছে নানা রকমের সমস্যা। মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ফসলের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে অমানবিক জীবনযাপন করছে শহরের বস্তিতে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে বনভূমি সুরক্ষা, নতুন বন সৃজন, বসতবাড়ির আশপাশে, রাস্তার ধারে, বাঁধের দু’ধারে, কলকারখানা, স্কুল, কলেজ, অফিস আদালতের অব্যবহৃত জায়গা, শহরাঞ্চলের বাড়ির ছাদ, বারান্দা ও ব্যালকোনিতে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ রোপনের কোনো বিকল্প নেই। বিকল্প নেই বনায়নের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধির।

বাংলাদেশে সরকারি হিসেবে শতকরা ১৭ ভাগ জমিতে বনভূমি রয়েছে। আর বেসরকারি হিসেবে বনভূমির পরিমাণ আরও অনেক কম। বাংলাদেশের প্রধান বনভূমি সুন্দরবন দেশের মোট বনভূমির ৪৪ শতাংশ। এছাড়া আছে চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চল এবং মধুপুর, গাজীপুর, শ্রীপুর, ভালুকা ও দিনাজপুরের শালবনসহ কিছু বনাঞ্চল, যার সবই সরকারি বনবিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন।

বনভূমি উজাড় হওয়ার কারণে বাঘসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিপুল সংখ্যক প্রাণী আজ বিলুপ্তি ও হুমকির মুখে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে র‌য়্যাল বেঙ্গল টাইগার, মায়া হরিণ, সজারু, মেছো বাঘ, বন বিড়াল, গুঁই সাপ, বাগডাসা, ইরাবতি ডলফিন, লবণ পানির কুমির, সজারু, লাল মাছ রাঙ্গা, খয়েরি মাছ রাঙ্গা, কচ্ছপ, অজগর, শঙ্খচূর সাপ ও শুঁশুক।

সরকার বনভূমি সংরক্ষণের জন্য রক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বন ও বনজসম্পদ সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরো গতিশীল এবং যুগোপযোগী করতে যুক্ত হয়েছে সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। সহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন বনের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বন ও বনের সম্পদ সংরক্ষিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টির ফলে স্থানীয় দরিদ্র জনগণ স্বাবলম্বী হতে পারছে। এছাড়াও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যা বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে।

বন রক্ষার জন্য আমাদের দেশে রয়েছে ‘বন আইন ১৯২৭’ ও ‘বন আইন ২০১৯’ এবং বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২। বন আইন অনুযায়ী একটি গাছ কাটতে হলে তার বিপরীতে ১০টি গাছ লাগানো এবং প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া গাছের যত্ন নেওয়া এ আইন যথাযথভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে কিনা, তা দায়িত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটলে তার প্রতিকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বাংলাদেশের বনভূমি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় জনগণকে সচেতন হতে হবে। বন রক্ষায় বন বিভাগ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সক্রিয় করে তুলতে হবে। দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে নতুন করে বন সৃজন করতে হবে। ‍বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণী হত্যা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বন সুরক্ষাকে একটি জাতীয় আন্দোলন হিসেবে পরিণত করতে হবে। বনের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা ও ভালোবাসার মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে। কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার নামে বনভূমি ধ্বংস করা যাবে না। বনভূমির আশপাশে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো শিল্প কারখানা বা ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ বিষয়গুলি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা না হলে বনভূমি রক্ষা তথা দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব থেকে দেশের মানুষের জীবনজীবিকা রক্ষা করা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব হবে না। বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং গৃহীত কর্মসূচির মাধ্যমে এই প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করেই আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। সর্বোপরি বর্তমান সরকারের স্বচ্ছ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আমাদের বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে লক্ষ্য অর্জন করবে এটাই হোক এবারের বন দিবসের সকলের প্রত্যাশা।