পরকাল বা মৃত্যু-পরবর্তী সময়


» উত্তরা নিউজ | অনলাইন রিপোর্ট | সর্বশেষ আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২০ - ০১:০৭:৫৮ অপরাহ্ন

পরকাল বা মৃত্যু-পরবর্তী সময় ও জীবন নিয়ে মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহলের শেষ নেই। মৃত্যু-পরবর্তী জীবন নিয়ে ইসলামসহ প্রায় সব ধর্মের বেশির ভাগ বক্তব্য রহস্যময় ও ব্যাখ্যাতীত। কোরআন ও হাদিসে পরকালীন জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হলেও এই ব্যাপারে চূড়ান্ত বক্তব্য হলো ‘এর জ্ঞান শুধু আল্লাহরই আছে। তা আপনি কী করে জানবেন? সম্ভবত কিয়ামত খুব শিগগিরই হবে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৬৩)

পরকালে কি সময় থাকবে?

গবেষক আলেমরা বলেন, পরকালেও সময় থাকবে। সময়ের গণনাও থাকবে। তবে তা পৃথিবীর সময়ের মতো নয়। সেই সময় ও তার প্রকৃতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহান আল্লাহ যেমন পৃথিবীসহ প্রত্যেক গ্রহ-নক্ষত্রের জন্য সময়ের ভিন্ন ভিন্ন সীমা নির্ধারণ করেছেন, তেমনি পরকালের জন্য স্বতন্ত্র সময়কাল সৃষ্টি করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বলেছেন, মানুষ সময়কে গালি দিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়। অথচ আমিই সময় (সময়ের স্রষ্টা), সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে, আমি রাত-দিনের পরিবর্তন করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪৯১)।

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ দিন-রাতের একটির অংশ কেটে অন্যদিকে দীর্ঘ করেন, ফলে তাতে সমতা আসে। আবার দীর্ঘটা (দিন বা রাতের) ছোট করেন এবং ছোটটিকে বড় করেন। তিনি তাতে যথেচ্ছা পরিবর্তন করেন তাঁর নির্দেশ, ক্রোধ, ক্ষমতা ও জ্ঞানের মাধ্যমে।’ (দেখুন : সুরা নুরের ৪৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা)

পৃথিবীতে সময় পরিমাপের মূল ভিত্তি পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের এই কাঠামোই আল্লাহ পরিবর্তন করে দেবেন। তাই পরকালে সময় ও তার গণনা ভিন্নভাবে করা হবে। আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তন হয়ে অন্য পৃথিবীতে পরিণত হবে এবং আকাশমণ্ডলীও; মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সম্মুখে যিনি এক ও পরাক্রমশালী।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪৮)

পরকালে যেভাবে সময় গণনা করা হবে

পরকালের সময় বোঝাতে কোরআন ও হাদিসে একাধিক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যা পৃথিবীর সময় ‘পরিমাপক শব্দে’র অনুরূপ। যেমন—

ক.   আস-সাআ : আরবি আস-সাআর শাব্দিক অর্থ কিছু সময়। আর ব্যাবহারিক অর্থ ‘ঘণ্টা’। কোরআনে শব্দটি কিয়ামত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা হতাশ হয়ে যাবে।’ (সুরা রোম, আয়াত : ১২)

খ.   সকাল ও সন্ধ্যা : জান্নাতবাসীর অবস্থা বর্ণনায় পবিত্র কোরআনে ‘সকাল ও সন্ধ্যা’ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “সেখানে তারা ‘শান্তি’ ছাড়া কোনো অসার কথা শুনবে এবং সকাল-সন্ধ্যা তাদের জন্য থাকবে জীবনোপকরণ।’ (সুরা মারিয়াম, আয়াত : ৬২)

গ.   ইয়াউম : ইয়াউম অর্থ দিন। কিয়ামত ও পরকালের অন্যান্য মুহূর্ত বোঝাতে কোরআন ও হাদিসে ইয়াউম বা দিন শব্দ ব্যবহূত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যেদিন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দলে বের হবে, যেন তাদের কৃতকর্ম দেখানো যায়।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত : ৬)

ঘ.   সপ্তাহ : আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে বোঝা যায় পরকালে সময় গণনায় ‘সপ্তাহের’ হিসাব থাকবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই জান্নাতে একটি বাজার থাকবে। যাতে তারা প্রতি শুক্রবার একত্র হবে। তখন উত্তরের বাতাস প্রবাহিত হয়ে সেখানের ধুলাবালি তাদের মুখমণ্ডল ও কাপড়ে লাগবে। এতে তাদের রূপ ও সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি পাবে। …’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৮৮৩)

ঙ.   বছর : বিভিন্ন আমলের পরকালীন শাস্তি ও পুরস্কারের বর্ণনায় একাধিক হাদিসে ‘সানাহ’ বা বছর শব্দের ব্যবহার হয়েছে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে দরিদ্র অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখো, দরিদ্র থাকা অবস্থায় মৃত্যু দিয়ো এবং কিয়ামত দিবসে দরিদ্রদের দলভুক্ত করে হাশর কোরো। (এ কথা শুনে) আয়েশা (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কেন এরূপ বলছেন? তিনি বলেন, হে আয়েশা! তারা তো তাদের সম্পদশালীদের চেয়ে ৪০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। …’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৫২)

পরকালের সময়কাল ভিন্ন যেখানে

পরকালের সময় ও তার সীমা বোঝাতে দিন, সপ্তাহ ও বছরের মতো শব্দগুলো ব্যবহৃত হলেও কোরআন ও হাদিসের ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, পার্থিব জীবনের সময়ের সঙ্গে পরকালীন সময়ের মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। মৃত্যু-পরবর্তী সময়ের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অন্তহীন। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে পার্থিব সময়ের যাত্রা শুরু হয়েছে। আর কিয়ামতের মাধ্যমে তার সমাপ্তি হবে। কিন্তু পরকালের সময় অনন্ত, কখনো শেষ হওয়ার নয়। অন্তহীন এই সময় বোঝাতে কোরআন ও হাদিসে ‘আবাদুন’ ও ‘খালিদুন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে এবং ভালো কাজ করেছে অতিসত্বর আমি তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাব; যার নিচ দিয়ে ঝরনা প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরদিন বাস করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৭)

অন্যদিকে পরকালের সকাল-সন্ধ্যা, দিন ও বছরের ব্যাপ্তি, প্রকৃতি ও ধরন পৃথিবীর সময় থেকে ভিন্ন হবে। যেমন আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) কোরআনের আয়াত ‘সকাল-সন্ধ্যা তাদের জন্য থাকবে জীবনোপকরণ’-এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘সকাল ও সন্ধ্যার সাদৃশ্য সময়ে। প্রকৃতপক্ষে সেখানে রাত ও দিন থাকবে না। তবে সময়ের পরিবর্তন থাকবে। যা ‘দ্যুতি’ (তেজস্কর) ও ‘জ্যোতি’ (কোমল)-এর মাধ্যমে বোঝা যাবে। (দেখুন : সুরা মারিয়ামের ৬২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা)

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যেদিনের পরিমাপ হবে তোমাদের হিসাবে সহস্র বছর।’ (সুরা সিজদা, আয়াত : ৫)