নির্বাচনী ব্যবস্থায় জনমনে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে : মেনন


» মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান | উত্তরা নিউজ, স্টাফ রিপোর্টার | সর্বশেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০১৯ - ০৮:৫৯:৩২ অপরাহ্ন

সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, নির্বাচনে কমিশন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যোগসাজশের ফলে সামগ্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনে ভোট দেয়ার ব্যাপারে জনগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এটা নির্বাচনের জন্য কেবল নয়, গণতন্ত্রের জন্য বিপদজনক। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ যদি নির্বাচনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে তাহলে রাজনৈতিক দল কেবল নির্বাচন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলবে। এটা সবার জন্য যেমন আওয়ামী লীগের জন্যও প্রযোজ্য।

বুধবার বিকেলে একাদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে রাশেদ খান মেনন বলেন, বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে এলেও নির্বাচন ভন্ডুল করতে সব কৌশলই প্রয়োগ করেছিল। তাতে ব্যর্থ হয়ে নির্বাচন ও সংসদের অবৈধতার কথা বলছে। নির্বাচনে অতি উৎসাহী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বাড়াবাড়ি নির্বাচনকে অশুদ্ধ ও অবৈধ করে না। আর করে না বলেই বিএনপি-গণফোরামের বন্ধুরা আজ জল ঘোলা করে হলেও সংসদে এসেছে। কিন্তু তাতে আত্মতৃপ্তির অবকাশ নেই। বরং নির্বাচনকে যথাযথ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার কাজটি আমাদের করতে হবে। কারণ, রোগ এখন উপজেলা নির্বাচন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। পাঁচ দফা উপজেলা নির্বাচনে আমাদের দলের অভিজ্ঞতা, এমনকি আওয়ামী লীগ নিজ দলের প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা করুণ।

সরকার গঠন প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বলেন, ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ রুখতে ২৩ দফা দাবি দিয়ে ১৪ দলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম। ১৪ দলের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার কারণে আজও আমরা ১৪ দলে ঐক্যবদ্ধ আছি। প্রধানমন্ত্রী ১৪ দলের শরিকদের নিজ পায়ে দাঁড়াতে বলেছেন। কিন্তু যদি গণতান্ত্রিক স্পেস না থাকে তাহলে কেউ সংগঠন নিয়ে, আন্দোলন নিয়ে, ভোট নিয়ে এগুতে পারে না। জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও আওয়ামী লীগ এই সরকারকে আওয়ামী লীগ সরকার বলছে। এর জন্য দুঃখবোধ নাই, কোন প্রত্যাশাও নাই, যে ইঙ্গিত মাঝে মাঝেই করা হয়। একটিই প্রত্যাশা- যাতে স্বাধীনতা ঘোষণার সাম্য, মানবিক মর্যাদাবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত দেখতে পাই। দেখতে পাই একটি সত্যিকার অর্থেই ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ।

রাশেদ খান মেনন বলেন, শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়ন করতে পারলে শিক্ষাখাত অনেক দূর এগিয়ে যেত। হেফাজতে ইসলামসহ কিছু ধর্মবাদী দল শিক্ষানীতির বিরোধিতা করেছে, জানি না এখানেও আপস হয়েছে কিনা। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষায় যেমন পরিবর্তন আনতে হবে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে স্বীকৃতি দেয়া হলেও তারা নিচের দিকে কোন পরিবর্তন আনতে রাজি নয়।

সম্প্রতি হেফাজত সম্পর্কে মন্তব্য করায় সাবেক এই মন্ত্রীকে মুরতাদ ঘোষণাসহ ফাঁসির দাবি করা হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে তুলে রাশেদ খান মেনন বলেন, গত অধিবেশনে এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আমি যে মন্তব্য করেছিলাম তা নিয়ে এক সংসদ সদস্য আমাকে ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার কথা বলেছিলেন। আর বলেছিলেন ওই সব শিক্ষায়তনের শিক্ষার্থীদের রক্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্তের চেয়ে পরিশুদ্ধ। আমি নুসরাত হত্যা, ওই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন, বালকদের বলাৎকারের যেসব খবর প্রকাশ হয় প্রতিদিন— সে কথা বলব না। কারণ, এটা কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নয়, এখন এক চরম সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। কিন্তু এইসব ব্যক্তিরা যারা আমার কথার জন্য ফাঁসি চেয়ে বিক্ষোভ করেছে, আমাকে মুরতাদ ঘোষণা করেছে, তারা প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কী ধরনের উক্তি করেন ইউটিউব খুলে তা শোনার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জিডিপির আকারে ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় আট বছরের ব্যবধানে ৯২৮ ডলার থেকে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১৯০৯ ডলারে পৌঁছে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিএনপি-জামায়াত আমলের ৩.৫ বিলিয়ন থেকে ৩৩ বিলিয়নে উন্নীত হওয়া এবং প্রবাসীদের আয় ৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ বিলিয়ন হওয়া; সমৃদ্ধির পথে আমাদের এই অগ্রযাত্রা স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু আর্থিক খাতের দুর্গতি এই পথে কাঁটা হয়ে রয়েছে। ব্যাংক খাতে লুটপাট, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা কারও অবিদিত নয়। ঋণখেলাপির দায়ে ব্যাংকগুলো ন্যুব্জ, চলছে তারল্য সংকট। করের টাকা দিয়ে ব্যাংকের ঘাটতি মূলধন পূরণ করার জন্য বরাদ্দ এবারেও রাখা হয়েছে বাজেটে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন ভূমিকা দূরে থাক, ব্যাংকগুলোকে কার্যকর নজরদারি করতেও অক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। নিজের অর্থই তারা সামাল দিতে পারেনি এবং তার কোন জবাবদিহিতা দেশবাসী পায়নি।

বাজেটে কালো টাকা সাদার সুযোগ প্রসঙ্গে রাশেদ খান মেনন বলেন, অপ্রদর্শিত আয় দিয়ে অর্থাৎ কালো টাকা দিয়ে জমি ফ্ল্যাট কেনার বিশেষ সুবিধা দান, বিপুল পরিমাণ পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার কোন প্রক্রিয়া না থাকা— এসবই যাদের জন্য তারা হচ্ছে এ দেশের ধনীরা। আর দেশের বিকাশমান মধ্যবিত্ত এ ক্ষেত্রে বিশেষ চাপের মধ্যে থাকবে। জিয়া-এরশাদ প্রবর্তিত কালো টাকা সাদা করার বিধান ’৯০ পরবর্তীতে কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকলেও পরে আবার তা চালু হয় শাসকশ্রেণির প্রয়োজনেই। খালেদা জিয়া, সাইফুর রহমানের কালো টাকা সাদা করার কথা তো আমরা সবাই জানি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন টাকা যাতে পাচার না হয় তার জন্য বিনিয়োগে স্ট্রিমিং করতে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু এ যাবত এ ধরনের ব্যবস্থা থেকে বিশেষ সাফল্য পাওয়া যায়নি। এতে ফ্ল্যাট-জমির দাম মধ্যবিত্তের আওতার বাইরে চলে যাবে।