নারী দিবস ও ইসলামে নারী অধিকার

এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২০ - ০৫:২৩:৫৪ অপরাহ্ন

৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি নানা আনুষ্ঠানিকতায় উদ্যাপিত হচ্ছে। জাতিসংঘ এ বছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, ‘আমি প্রজন্মের সমতা: নারী অধিকারের প্রতি সচেতনতা’। আর বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার’।

১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ মজুরি-বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈরী পরিবেশের প্রতিবাদ করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সুতা কারখানার একদল শ্রমজীবী নারী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের ওপর দমন-পীড়ন চালায় মালিকপক্ষ। নানা ঘটনার পর ১৯০৮ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ও রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম নারী সম্মেলন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ দিনটি নারী দিবস হিসেবে পালন করছে।

নারীদের ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর অভিজ্ঞতা পূর্ববর্তী ইতিহাসের চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমর্ধী। বর্তমান শতাব্দীতে বিভিন্ন দেশে নারী আন্দোলনই শুধু জোরদার হয়ে ওঠেনি, প্রশ্ন উঠেছে, বিংশ শতাব্দীতে নারীদের মর্যাদা কি সত্যি সত্যি বেড়েছে? ইসলাম নারীদের জন্য যে অধিকার ও মর্যাদা নির্ধারণ করেছে তা নারী পুরষের সমঅধিকারের তুলনায় অনেক অনেক বেশি কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক।

ইসলামের আবির্ভাবে নারী পেয়েছে ধর্মে-কর্মে, শিক্ষা-দীক্ষায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে পুরুষের ন্যায় ন্যায্য অধিকার। নারী জাতির অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার বিবরণ দিয়ে পবিত্র কোরআরনের পূর্ণ একটি সূরা (আন নিসা) তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

কুরআনে ‘মহিলা’ শব্দটি ৫৭ বার এবং ‘ইমরাআহ’ অর্থাৎ ‘নারী’ শব্দটির ২৬ বার উল্লেখ হয়েছে। এ ছাড়া কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদীসে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও তাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।

নারীর শিক্ষার অধিকার
নারীদের তালিম তালবিয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আছে, ‘‘তোমরা তাদের (নারীদের) সঙ্গে উত্তম আচরণ করো ও উত্তম আচরণ করার শিক্ষা দাও।’’ [সূরা নিসা : ১৯] মহানবী (সা.) ঘোষণা করেন, ‘‘যার রয়েছে কন্যাসন্তান, সে যদি তাকে (শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে) অবজ্ঞা ও অবহেলা না করে এবং পুত্রসন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য না দেয়; আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’’

মা হিসেবে নারীর অধিকার
ইসলাম নারীদের সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিয়েছে মা হিসেবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত’’। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার এক লোক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)- এর দরবারে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি অধিকারী কে? নবীজি (সা.) বললেন, ‘‘তোমার মা’। ওই লোক জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি উত্তর দিলেন ‘তোমার মা’। ওই লোক আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? এবারও তিনি উত্তর দিলেন ‘তোমার মা’।” [বুখারী]

কন্যা হিসেবে নারীর অধিকার
মহানবী (সা.) বলেছেন, “ময়েশিশু বরকত (প্রাচুর্য) ও কল্যাণের প্রতীক।’’ হাদীস শরিফে আরও আছে, ‘‘যার তিনটি, দু’টি বা একটি কন্যাসন্তান থাকবে; আর সে ব্যক্তি যদি তার কন্যাসন্তানকে সুশিক্ষিত ও সুপাত্রস্থ করে, তার জান্নাত নিশ্চিত হয়ে যায়।’

বোন হিসেবে নারীর অধিকার
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘‘কারও যদি কন্যাসন্তান ও পুত্রসন্তান থাকে আর তিনি যদি সন্তানদের জন্য কোনো কিছু নিয়ে আসেন, তবে প্রথমে তা মেয়ের হাতে দেবেন এবং মেয়ে বেছে নিলে তারপর তার ভাইকে দেবে।’ হাদীস শরিফে আছে, বোনকে সেবাযত্ন করলে আল্লাহ প্রাচুর্য দান করেন।

স্ত্রী হিসেবে নারীর অধিকার
ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে রয়েছে, ‘‘তারা তোমাদের আবরণস্বরূপ আর তোমরা তাদের আবরণ।’’ [সূরা বাকারা : ১৮৭] স্ত্রীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘‘উত্তম স্ত্রী সৌভাগ্যের পরিচায়ক।’’ [মুসলিম] তিনি আরও বলেন, “তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’’ [তিরমিজি]

নারীদের মোহরানা ও তালাকের অধিকার : আল্লাহ বলেন, ‘‘আমি জানি, আমি তাদের স্ত্রীদের ব্যাপারে কি মোহরানা ফরজ করেছি।’’ [সূরা আহজাব :৫০]

বিয়ের স্বাধীনতা
বিয়ের ব্যাপারে স্বাধীনতা ইসলামই দিয়েছে; অর্থাৎ যদি কোনো মেয়ে স্বইচ্ছায় বিয়ে করতে রাজি না হয় তবে তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেয়া যাবে না। নবী (সা.) বলেন, “প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা থেকে পরমার্শ গ্রহণ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণী হতে অনুমতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না।” [মুসলিম]

নারীদের উত্তরাধিকারের অধিকার
ইসলামী ব্যবস্থা আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে, যখন সারা পৃথিবীর কোন অংশে নারীর উত্তরাধিকার তেমনভাবে স্বীকৃত হয়নি, সেই সময়ে নারীদের উত্তরাধিকারের অধিকার ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘পিতামাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, উহা অল্পই হউক অথবা বেশিই হউক, এক নির্ধারিত অংশ।’ [সূরা আন নিসা : ০৭]

বিধবার অধিকার ও সম্মান
বিধবাদের অধিকার সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘‘যারা বিধবা নারীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয়, তারা যেন আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং নিরলস নামাজি ও সদা রোজা পালনকারী।” [বুখারী ও মুসলিম]

অর্থনৈতিক অধিকার
নারীর অর্জিত অর্থে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারো হস্তক্ষেপ করার আইনগত কোনো অধিকার বা ক্ষমতা নেই। যেমন আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে বলেন ‘‘যা কিছু পুরুষরা অর্জন করবে, তা তাদেরই অংশ হবে; আবার নারীরা যা কিছু উপার্জন করবে, তাদেরই অংশ হবে।’’ [সূরা নিসা : ৩২]

পর্দার অধিকার
নারীকে বলা হয়েছে ৩৬ গুণ ক্ষমতা সম্পন্ন ম্যাগনেট বা চম্বুক। আর নরকে দেয়া হয়েছে মাত্র ১ গুণ ক্ষমতা সম্পন্ন লৌহ। চম্বুক ও লৌহ পাশাপাশি অবস্থান করলে একে অপরকে আকর্ষণ করবে। এ আকর্ষণ দূর করতে বিধান দেয়া হয়েছে পর্দার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘হে নবী (সা.)! আপনি আপনার পত্মীদেরকে, আপনার কন্যাদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বলে দিন যে, তারা যেন ওড়না নিজেদের বুকের উপর টেনে দেয়, এটি অধিকতর উপযোগী পদ্ধতি; এতে তাদের পরিচয় পাওয়া যাবে। ফলে তারা নির্যাতিত হবে না। আর আল্লাহ তা‘আলা অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়াল।’’ [সূরা আহযাব : ৫৯]

নারীর প্রতি পুরুষদের দৃষ্টি পড়লে অসঙ্গত ও খারাপ চিন্তা তার ভিতরে এসে যেতে পারে। সে জন্য আল্লাহ পুরুষকে দৃষ্টি অবনত রাখার কথা বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে নবী) আপনি মুমিন পুরুষদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এটা তাদের জন্য উত্তম। অবশ্যই তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবগত।’’ [সূরা নূর : ৩০]

কুরআন ও হাদীসে উল্লিখিত বিখ্যাত নারীগণ :
পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বহু বিখ্যাত নারীর উল্লেখ রয়েছে, তাঁরা নিজ নিজ অবস্থানে সেরা ছিলেন। যেমন : জগন্মাতা মা হাওয়া (আ.), আদমকন্যা আকলিমা, ইবরাহীম (আ.)-এর পত্নী সারা, ইসমাইল (আ.)-এর মাতা হাজেরা, মিসরপতির স্ত্রী জুলায়খা, সুলাইমান (আ.)-এর পত্নী সাবার রানি বিলকিস, ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া, আইয়ুব (আ.)-এর স্ত্রী বিবি রহিমা, ইমরানের স্ত্রী হান্না, ঈসা (আ.)-এর মাতা বিবি মরিয়ম, নবী কারীম মুহাম্মদ (সা.)-এর মাতা আমেনা ও দুধমাতা হালিমা সাদিয়া; উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা.), হাফসা (রা.), আয়িশা (রা.), মারিয়া (রা.)সহ নবী পত্নীগণ; নবীনন্দিনী রুকাইয়া, জয়নব, কুলসুম ও ফাতিমা (রা.); আবু বকর (রা.) এর কন্যা আসমা, শহিদা সুমাইয়া ও নবীজির দুধবোন সায়েমা।

বাংলাদেশে নারীর অবস্থান
বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থা ও তাতে নারীর অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা যথার্থ অর্থেই নেতিবাচক। সমাজ ব্যবস্থা ও পরিবেশগত কারণে যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশে নারীদের প্রতি বৈষম্য চলে আসছে। দৈহিক কারণ তো রয়েছেই। পুরুষ সমাজের চিরাচারিত দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাজের সার্বিক অস্থিতিশীলতার জন্য অবজ্ঞা অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে নারীরা।

পত্রিকার পাতা অথবা টিভি খুললেই আমরা দেখতে পাই নারী নির্যাতনের ও নারী বৈষম্যের করুণ চিত্র। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, ধর্ষণ, বহুবিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, নারী পাচার অকালে গর্ভধারণ ইত্যাদি মানবসৃষ্ট সামাজিক অভিশাপকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে নারী সমাজকেই।

নারী তাঁর নারীত্বের মর্যাদা বজায় রেখেই সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন ও রাখছেন। নারী ছাড়া অন্য কেউই মাতৃত্বের সেবা ও সহধর্মিণীর গঠনমূলক সহযোগী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম নয়। মায়েদের ত্যাগ ও ভালোবাসা ছাড়া মানবীয় প্রতিভার বিকাশ ও সমাজের স্থায়িত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়। মায়েরাই সমাজের প্রধান ভিত্তি তথা পরিবারের প্রশান্তির উৎস।

নারী ও পুরুষ অভিন্ন মানব সমাজের দু’টি অপরিহার্য অঙ্গ। নর-নারী মিলেই মানব সমাজ পরিপূর্ণ হয়। পুরুষ মানবতার একাংশের প্রতিনিধি। অপর অংশের প্রতিনিধিত্ব করে নারী। নারী সমাজকে বাদ দিয়ে মানব সমাজ কল্পনাই করা যায় না। আল্লাহ তা‘আলা রহমত ও দানের ব্যাপারে যেমন তার সৃষ্টির মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি, তেমনি তার বিধানে নারী-পুরুষের অধিকার ও মর্যাদার মধ্যেও কোন তারতম্য রাখেননি।

অতএব, সুন্দর পরিবাব, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চাইলে ইসলাম নারীকে যে মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে তার যথাযথ বাস্তবায়ন দরকার।