নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবৈধ শাখা

ভিকারুননিসা, আইডিয়াল ও মনিপুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তথ্য চেয়ে দু’দফা চিঠি * অনেক প্রতিষ্ঠান পাঠদানের অনুমতি পর্যন্ত নবায়ন করে না

» Md. Neamul Hasan Neaz | | সর্বশেষ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ - ০৯:৫৩:৫৬ পূর্বাহ্ন

দেশের নামিদামি অনেক স্কুল-কলেজ অবৈধ ক্যাম্পাস চালাচ্ছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পুঁজি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসাধু প্রধানরা অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

ফি দেয়ার ভয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন-স্বীকৃতি পর্যন্ত নবায়ন করে না। চার-পাঁচটি গোষ্ঠী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চেইনশপের মতো একই নামে স্কুল-কলেজের শাখা খুলে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত অবৈধভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যেই অনুমোদন ছাড়া ক্যাম্পাস ও শ্রেণি-শাখা খোলা হয়ে থাকে। এছাড়া অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগও লক্ষ্য থাকে।

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে বেশকিছু অভিযোগ জমা পড়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডকে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এরপরই বোর্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, রাজধানী তথা দেশের বিখ্যাত স্কুলগুলোর বেশকিছু শ্রেণি ও শাখা চলছে, যেগুলোর অনুমোদন আছে বলে বোর্ডের জানা নেই। ওইসব শাখা-শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে, শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে চিহ্নিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ বলেন, রাজধানীর শীর্ষ পর্যায়ের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুমোদন ছাড়া ক্যাম্পাস-শ্রেণিতে পাঠদান চলছে। অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম পর্যায়ে ঢাকার শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে সব তথ্য চাওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেই, সেগুলোকে প্রথমে কারণ দর্শাতে বলা হবে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমোদন বাতিলসহ বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল ক্যাম্পাসের বাইরে চারটি ব্রাঞ্চ বা ক্যাম্পাস আছে। এর মধ্যে মূলটির অনুমোদন আছে। এছাড়া কোনো ক্যাম্পাসেরই অনুমোদন নেই। এর চেয়েও আশ্চর্যজনক হচ্ছে, এত পুরনো ও বিখ্যাত স্কুলটি চলছে কেবল পাঠদানের অনুমতি দিয়ে।

বোর্ডের কোনো স্বীকৃতি নেয়া হয়নি। ৯টি বছর চলেছে অনুমোদন নবায়ন ছাড়াই। অথচ ৩ বছর পরপর তা নবায়নের বিধান আছে। এই বিধান লঙ্ঘন করায় সর্বশেষ বিগত এইচএসসি পরীক্ষায় প্রবেশপত্র আটকে দেয় বোর্ড।

তখন বাধ্য হয়ে একবারে অনুমোদন নবায়ন করে নেয় তারা। এছাড়া অনুমোদন পাওয়া ক্যাম্পাসেও অনুমোদনবিহীন বেশ কয়েকটি শ্রেণি-শাখা খোলার অভিযোগও আছে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন এ ব্যাপারে বলেন, ১০ বছর আগে বিধি মোতাবেক সব ব্রাঞ্চের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হলেও মূলটি বাদে আর কোনো শাখার অনুমোদন দেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, গত পাঁচ বছর আগে আমরা এমপিও সমর্পণ (ফেরত) করেছি, তাই পাঠদানের অনুমোদন আমাদের জরুরি না। তাছাড়া বোর্ড থেকে কখনও এ বিষয়ে আপত্তি জানায়নি। সরকারি সব বিধি মেনে মনিপুর স্কুল পরিচালিত হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক বলেন, এমপিও গ্রহণ বা বর্জনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে শিক্ষা বোর্ডের বিধিবিধান মেনে। অনুমোদন ছাড়া প্রতিষ্ঠান কেউ পরিচালনা করতে পারে না।

তিনি প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন ৯ বছর না নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, স্বীকৃতি ও শাখা খোলার অনুমতি দেয়ার দায়িত্ব বোর্ডের। কোনো প্রতিষ্ঠানই বোর্ডের ক্ষমতা নিজেরা প্রয়োগ করতে পারে না।

সূত্র জানায়, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী ক্যাম্পাসের অনুমোদন নেই। পাশাপাশি অনুমোদন নেই ওই ক্যাম্পাসের কোনো শাখা-শ্রেণির। আরও কিছু শ্রেণি-শাখার অনুমোদন নেই বলে জানা গেছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩০টির মতো বাংলা-ইংরেজি ভার্সনের শাখা-শ্রেণির অনুমোদন নেই।

এসব কারণে প্রথম দফায় ৯ ফেব্রুয়ারি সব ক্যাম্পাস ও অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখা খোলার অনুমতি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়। পরে ১১ ফেব্রুয়ারি আরেক চিঠিতে সব ক্যাম্পাস ও অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখার শিক্ষার্থী সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, এভাবে আরও বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের শাখা চলছে অবৈধভাবে। অনেক প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে ক্যাম্পাস খুলে বসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টাঙ্গাইলভিত্তিক শাহীন স্কুল ও কলেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আছে।

আবার কিছু প্রতিষ্ঠান আছে বছরের পর বছর পাঠদানের মেয়াদ বৃদ্ধি করে না। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের একটি টঙ্গীর সাহাজউদ্দিন সরকার আদর্শ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই অপরাধে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষকে ১১ ফেব্রুয়ারি শোকজ করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।