মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান
উত্তরা নিউজ


ধর্ষণচেষ্টায় অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের আলমারির চাবি নিয়ে ‘ছুটিতে’ থাকায় পাঠদান ব্যাহত







মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল,নোয়াখালী প্রতিনিধি: নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়েরের দুই সপ্তাহেও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক শাহদাত হোসেন স্বপন গ্রেফতার হননি। যদিও তিনি শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে ‘চিকিৎসা ছুটির’ আবেদন দিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় ওই স্কুলে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
অভিযুক্ত শাহদাত হোসেন স্বপনের বিরুদ্ধে এখনও বিভাগীয় কোন ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। স্থানীয়রা জানান, অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের সব আলমারির চাবি নিয়ে ‘ছুটিতে’ থাকায় এবং তার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় বিদ্যালয়টিতে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। ভারপ্রাপ্ত হিসেবেও তিনি কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাননি। তিনি (শাহাদাত) যেসব ক্লাস নিতেন সেগুলো হচ্ছে না। এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না অন্য শিক্ষকরাও। তারা বলছেন, অচলাবস্থা কাটাতে কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশনা তারা এখনও পাননি। ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা এখনও স্কুলটি পরিদর্শনেও আসেননি।
একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, ‘আমাদের সন্তানদের পিতৃতূল্য প্রধান শিক্ষক যখন তার ছাত্রীদের সঙ্গে একের পর অশালীন আচারণ করে যাচ্ছিলেন, তখন আমরা বাধ্য হয়ে তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছি। কিন্তু মামলা দায়েরের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে গ্রেফতার কিংবা চাকরিচ্যুত করা হয়নি।’
তারা অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক অসুস্থতার সনদ দিয়ে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেই তাকে সহযোগীতা করা হচ্ছে। একজন মামলার আসামি কিভাবে চিকিৎসা ছুটি ভোগ করেন তা নিয়েও প্রশ্ন অভিভাবকদের। এ অবস্থায় অভিযোগের বিচার পাবেন কী না তা নিয়ে তারা সংশয় প্রকাশ করেন।
উত্তর চরক্লার্ক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (প্রথম-অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত) একাধিক শিক্ষক বলেন, গত ২৩ মার্চ প্রধান শিক্ষক শাহাদাত হোসেন স্বপনের বিরুদ্ধে থানায় ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা হয়। তার আগ থেকেই প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। কিন্তু তিনি যাওয়ার সময় বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষের চাবি ও দায়িত্ব কাউকে হস্তান্তর করেননি।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, অভিযুক্ত শাহদাত হোসেন গত ২৩ মার্চ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের প্রশিক্ষণ নেন। ২৪ মার্চ তিনি অসুস্থ বলে চিকিৎসকের সনদ দিয়ে একটি আবেদন তার কাছে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ছুটি মঞ্জুর হয়নি। তাকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। এ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তিনি লিখিতভাবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছেন। প্রথমে মামলার কপি পাঠানো না হলেও পরে পাঠানো হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চিঠি তার কাছে আসেনি।
স্কুলের অচলাবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওই স্কুলে মোট ১২ জন শিক্ষক। এখন সেখানে ১১ জন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। খুব দ্রুত সেখানে অতিরিক্ত একজন শিক্ষক দেওয়া হবে। সিনিয়র একজন শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হবে। স্কুলের কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয় আমরা সেদিকে খেয়াল রাখছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুলের অচলাবস্থার বিষয়টি জানতাম না। বিষয়টি দেখার দায়িত্ব উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার। স্কুলের বর্তমান পরিস্থিতির খবর নেব।’
অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে তিনি সরাসরি চাকুরিচ্যুত করতে পারেন না। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার উপ-পরিচালক, চট্টগ্রামের। তিনি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আসা প্রতিবেদনটি সেখানে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে মামলার (অভিযোগের) কপি দেওয়া হয়নি। উপ-পরিচালকের কার্যালয় থেকে আরও কিছু কাগজপত্র চাওয়া হযেছে। সেগুলো সংগ্রহ করে পাঠালে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, পুলিশ ওই শিক্ষককে গ্রেফতার করে না কেন? পুলিশ চাইলেই তাকে ধরতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুবর্ণচরের চরজব্বার থানার ওসি মোহাম্মদ শাহেদ উদ্দিন বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেফতারে তার গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার অশ্বদিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্ত তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় অবস্থান সনাক্ত করা যাচ্ছে না।
প্রাথমিক শিক্ষা চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক মো. সুলতান মিয়া বলেন, সুবর্ণচরের শিক্ষক শাহদাত হোসেনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তাকে সাময়িক বরখাস্তের চিঠি প্রস্তুতি হচ্ছে। খুব দ্রুত তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, উত্তর চরক্লার্ক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহদাত হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীকে বিদ্যালয়ের নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে এক ছাত্রীর অভিভাবক বাদী হয়ে গত ২৩ মার্চ ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে চরজব্বার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়, ওই ছাত্রী উত্তর চরক্লার্ক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। শিক্ষক আবু শাহাদাত হোসেন স্বপন বিদ্যালয়ের পাশের একটি কক্ষে থাকেন। বিভিন্ন সময় তিনি বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের দিয়ে রান্নাসহ বিভিন্ন কাজ করাতেন। ৬ মার্চ সকালে জরুরি কাজ আছে বলে মেয়েটিকে ডেকে নেন। পরে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। শিশুটি তার হাত থেকে ছুটে বাড়িতে চলে যায়। এরপর থেকে সে বাড়িতে চুপচাপ থাকত। বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বললে কান্নাকাটি করত। পরে জিজ্ঞাসাবাদে সে পরিবারের লোকজনকে ঘটনা খুলে বলে। বিদ্যালয়ের আরও আট ছাত্রী ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করে।