দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২০

একজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে: গোছানো হচ্ছে দিয়াবাড়ী কোয়ারেন্টিন সেন্টার * স্থানীয় বাসিন্দাদের বিক্ষোভ * ইভিএম ব্যবহারে করোনা ঝুঁকি আছে

» Md. Neamul Hasan Neaz | | সর্বশেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২০ - ১০:৫৭:৪০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে আরও তিনজন নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০। নতুন আক্রান্তদের একজন নারী, দু’জন পুরুষ। এরা প্রত্যেকেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে আক্রান্তদের মধ্যে সত্তরোর্ধ্ব একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শুক্রবার করোনাভাইরাস সংক্রান্ত নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা।

তিনি বলেন, নতুন করে তিনজনের দেহে সংক্রমণ ঘটলেও গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কারও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত দেশে একজনেরই মৃত্যু হয়েছে। নতুন আক্রান্ত তিনজনের মধ্যে একজন নারী, তার বয়স ৩৮ বছর। দু’জন পুরুষের মধ্যে একজনের বয়স ৩০-এর ঘরে, অন্যজনের ৭০-এর বেশি। সত্তরোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি ‘ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে’ আছেন। তার অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতা আছে। তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ত্রিশোর্ধ্ব পুরুষ রোগী ইতালি ও জার্মানি ঘুরে এসেছেন। বাকি দু’জন সংক্রমিত হয়েছেন অন্যদের মাধ্যমে। তাদের মধ্যে ওই নারী ইতালি ফেরত একজনের সংস্পর্শে এসেছিলেন। আক্রান্ত ২০ জনের মধ্যে ৩ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ইভিএম সিস্টেম ব্যবহার করলে অবশ্যই ঝুঁকি রয়েছে। ইভিএম সিস্টেম যদি ব্যবহার করা হয়, একই ইভিএম বাটনে বিভিন্ন ব্যক্তি টাচ করলে এটায় অবশ্যই ঝুঁকি আছে। অথচ এমন পরিস্থিতিতে ঢাকাসহ তিন আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ। এই তিন আসনের মধ্যে ঢাকা-১০ আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরে প্রতিষ্ঠিত করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সমন্বিত কন্ট্রোল রুমের তথ্যে দেখা গেছে, সারা দেশে এ পর্যন্ত ১৪ হাজার ২৬৪ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে ৫ হাজার ১৪৯ জন। ঢাকা বিভাগে ৩ হাজার ৮৮৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৪৫৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩ হাজার ৮৯৪ জন, রাজশাহী বিভাগে এক হাজার ৪৮৯ জন, রংপুরে ৬২৭ জন, খুলনায় দুই হাজার ৮৪ জন, বরিশালে ৬১৩ জন এবং সিলেটে এক হাজার ২১৫ জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়।

দেশব্যাপী করোনাভাইরাস শনাক্তকরণে ৬১টি পিসিআর মেশিন কিনছে সরকার। এর মধ্যে ৭টি মেশিন স্বাস্থ্য অধিদফতরের সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরেজ ডিপার্টমেন্ট-সিএমএসডিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় ৮৭ হাজার গ্লাভস, ১৭ হাজার ৭৮৫টি হ্যান্ড বার, ৪৮ হাজার ২০০ ফেস মাস্ক, সু-কভার ও ক্যাপ, ১৩ হাজার ৪৩টি সার্জিক্যাল মাস্ক, ৫শ’টি কম্বো সার্জিক্যাল প্রটেক্টর, ৩ হাজার ৩৮০টি গাউন এবং ৫ হাজার ৫৭০টি আই প্রটেক্টর বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে সিএমএসডিতে ১৬ হাজার ১০০টি গ্লাভস, ২২ হাজার ২৯৫টি হ্যান্ড বার, ৩ হাজার ৪৭৯টি কম্বো সার্জিক্যাল প্রটেক্টর, ১২ হাজার ৬২০টি গাউন এবং ৪ হাজার ৪৩০টি আই প্রটেক্টর মজুদ আছে।

এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা সংক্রান্ত পরামর্শ গ্রহণের জন্য ২৬ হাজার ২৯টি ফোনকল এসেছে। এ পর্যন্ত মোট কল এসছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৬টি।

এছাড়া গত ২১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বিদেশ থেকে ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪২ জন যাত্রী দেশে ফিরেছেন। যাদের বেশির ভাগই করোনা মহামারী হিসেবে চিহ্নিত দেশ থেকে এসেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় এসেছেন ৬ হাজার ৯৬৮ জন। এদের বিভিন্ন বন্দরে স্ক্রিনিং করা হয়েছে। তবে যেহেতু ভাইরাস বাহকের শরীরে লক্ষণ প্রকাশ পেতে প্রায় এক থেকে ২ সপ্তাহ সময় লাগে, তাই স্ক্রিনিংয়ে রোগী শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

ব্রিফিং চলাকালীন আইসিডিডিআরবিতে করোনাভাইরাসে একজনের চিহ্নিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম আলমগীর বলেন, ওই ব্যক্তি এখানে অন্তর্ভুক্ত নন। তার পুনঃপরীক্ষা প্রয়োজন। বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাসের ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের’ (সামাজিকভাবে একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়া) কোনো ঘটনা পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন বিদেশ ফেরতদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আক্রান্ত পাচ্ছি আমরা। পরিবারের বাইরে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

করোনাভাইরাস সংক্রান্ত যে কোনো পরামর্শের জন্য হটলাইন চালু করেছে আইইডিসিআর। হটলাইন নম্বর : ০১৯৪৪৩৩৩২২২, ৩৩৩ এবং স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩। এছাড়া iedcrcovid19gmail.com ঠিকানায় ই মেইল করে বা ফেসবুক গ্রুপ Iedcr, COVID-19 Control Room এর সমস্যার কথা জানাতে পারবেন যে কেউ।

প্রসঙ্গত, বিশ্বজুড়ে নতুন করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৮ মার্চ প্রথম বাংলাদেশে তিনজন আক্রান্তের তথ্য জানায় আইইডিসিআর। ওই তিনজনের মধ্যে দু’জন ছিলেন ইতালি ফেরত। একজন ইতালি ফেরত এক ব্যক্তির পরিবারের সদস্য। এরপর ১৪ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আরও দু’জন আক্রান্তের খবর জানান। ওই দু’জনের একজন ইতালি ও অপরজন জার্মানি থেকে এসেছিলেন। সোমবার তাদেরই একজনের মাধ্যমে পরিবারের এক নারী ও দুই শিশুর আক্রান্ত খবর জানায় আইইডিসিআর। মঙ্গলবার আরও দু’জনের মধ্যে ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। বুধবার নতুন করে একজন নারী ও তিনজন পুরুষের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার কথা জানান আইইডিসিআর। তাদের একজন আগে আক্রান্ত একজনের পরিবারের সদস্য। বাকি তিনজন বিদেশ ফেরত, দু’জন ইতালি থেকে এবং একজন কুয়েত থেকে এসেছেন। বৃহস্পতিবার ইতালি ফেরত এক ব্যক্তির পরিবারের তিন সদস্যের সংক্রমণ ধরা পড়ায় বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ জনে। তাদের মধ্যে একজন নারী, দু’জন পুরুষ। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আক্রান্তদের মধ্যে প্রথম দফার তিনজন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর।

এদিকে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল। সংগঠনের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর ও সম্পাদক ফয়জুল হাকিম এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান। বিবৃতিতে তারা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারী হিসেবে ঘোষণার পর দেশে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় বিভিন্ন রাষ্ট্র জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে বাংলাদেশে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়নি। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস বিস্তার ঘটে চললে সে সময় তাকে প্রতিরোধ করতে আক্রান্ত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল বন্ধ না করার ফলে দেশ বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে করোনাভাইরাসে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বলেছে।

গোছানো হচ্ছে দিয়াবাড়ী কোয়ারেন্টিন সেন্টার : উত্তরার দিয়াবাড়ী সংলগ্ন রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট কোয়ারেন্টিন সেন্টারে এখনও কোনো রোগী বা বিদেশ ফেরত কাউকে আনা হয়নি। তবে সেন্টারটি গোছানোর কাজ চলছে। বৃহস্পতিবার সেন্টারটির দায়িত্ব পাওয়ার পর শুক্রবার সেনা কর্মকর্তারা সেখানে গিয়েছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান যুগান্তরকে বলেন, আমরা গতকাল দুটি কোয়ারেন্টিন সেন্টার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছি। এর মধ্যে আশকোনা হজ ক্যাম্পে আগে থেকেই বেশকিছু লোক কোয়ারেন্টিনে আছে। দিয়াবাড়ী সেন্টারটি এখনও প্রস্তুত হয়নি। বিদেশ ফেরতরা এখানে আসার পর কোথায় থাকবেন, কী খাবেন সেই প্রস্তুতি চলছে। বিছানাপত্র রেডি করা হচ্ছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সেবা নিশ্চিতের জন্য কাজ চলছে। সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করতে দু-একদিন সময় লাগবে।

এক প্রশ্নের জবাবে রাশেদুল আলম খান বলেন, দিয়াবাড়ীতে যাতে কোয়ারেন্টিন সেন্টার না হয়, সেই দাবিতে শুক্রবার স্থানীয়রা বিক্ষোভ করেছেন। তাদের কিছু দাবি-দাওয়া আছে সেই বিষয়টি নিয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ, এলাকাবাসীর মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। উচ্চ পর্যায় থেকে যে ধরনের নির্দেশনা আসবে সেনাবাহিনী সে অনুযায়ী কাজ করবে। সংশ্লিষ্ট অন্য একটি সূত্র জানায়, উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টর এলাকায় দিয়াবাড়ীতে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ভবনে কোয়ারেন্টিন সেন্টার স্থাপনের যাবতীয় কাজ শুরু হয়েছে। কুঞ্জলতা নামের ওই কম্পাউন্ডের ৪টি ভবনের মোট ৩৩৬টি ফ্ল্যাট কোয়ারেন্টিনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।