উত্তরা নিউজ উত্তরা নিউজ
অনলাইন রিপোর্ট


ডেঙ্গু ঝুঁকিতে কেমন আছেন বস্তিবাসীরা?






প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা৷ হাসপাতালে রোগী ভর্তির নতুন রেকর্ড হয়েছে রবিবার৷ মোট ৮২৪ জন ভর্তি হয়েছেন এদিন৷ ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন অনেকেই৷

তবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির মধ্যে সচেতনতা কম থাকায়, স্বাস্থ্য বিষয়ে তাঁদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলছেন বিশেজ্ঞরা৷

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার নানা কর্মসূচী হাতে নিলেও এর ফল কতটা পাচ্ছেন ঢাকার বস্তিবাসী ও ভাসমান মানুষ? দেশব্যাপী ডেঙ্গুর ভয়াবহতায় কারাগারের বাসিন্দারাই বা কেমন আছেন?

রাজধানীর শুক্রাবাদ এলাকার ভাঙ্গাবাজার বস্তিতে থাকেন আব্দুল মালেক৷ তাঁদের এলাকায় সিটি কর্পোরেশনের লোকজন এখনো মশা নিধনের কোন কর্মসূচী নিয়ে যায়নি৷ তিনি বলেন, ‘‘সিটি কর্পোরেশনের লোকজনও যায়নি আর আমরাও জানাইনি৷ তবে আমাদের এখানে প্রচুর মশা৷ এনিয়ে বস্তির মালিকেরও কোনো উদ্যোগ নেই৷” তিান আরো বলেন, ‘‘ডেঙ্গু মশা কামড়ালে জ্বর হবে৷ ডাক্তারের কাছে যাবো৷ আল্লাহ যা করবেন তাই হবে৷ আর কী হবে!’’

একই অভিজ্ঞতা কলাবাগান বউবাজার বস্তির বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের৷ ওই বস্তিতেও সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন দল যায়নি৷ তবে তাঁর কথা, ‘‘আমাদের এলাকায় ডেঙ্গু মশা হয়না৷ আমাদের কেউ এখনো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়নি৷’’

আতঙ্ক থাকলেও আক্রান্ত হওয়ার খবর তেমন পাইনি: সুলাতান হোসেন ঢাকার সবচেয়ে বড় বস্তি হলো গুলশান এলাকার কড়াইল বস্তি৷ এ বস্তিতে কমপক্ষে চার লাখ মানুষ বাস করেন৷ কড়াইল বস্তির বাসিন্দা সুলাতান হোসেনের অভিজ্ঞতা অবশ্য আলাদা৷ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের এই বস্তিতে সিটি কর্পোরেশন নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটাচ্ছে৷ আমাদের এলাকার ওয়ার্ড কমিশনার তৎপর আছেন৷ আমাদের এখানে আতঙ্ক থাকলেও কেউ আক্রান্ত হওয়ার খবর তেমন পাইনি৷ বস্তি হলেও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন আছে৷”

জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম নূর-উন-নবী বলেন, ‘‘ঢাকা শহরে এখন দুই কোটি লোকের বাস৷ আর এর ৪০ ভাগ মানুষই বস্তিতে থাকেন অথবা ভাসমান৷ সেই হিসেবে তাদের সংখ্যা ৮০ লাখেরও বেশি৷ আরো ৫০ লাখ মানুষ প্রতিদিন ঢাকা শহরে আসা-যাওয়া করেন৷বস্তির মানুষ প্রান্তিক, দরিদ্র জনগোষ্ঠী৷ তাদের জন্য কখনোই বিশেষ কোনো ব্যবস্থা থাকেনা৷ কিন্তু থাকা উচিত৷ কারণ তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা এমনিতেই কম৷ তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাও অপ্রতুল৷”

নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি মোবাশ্বির হোসেন বলেন, ‘‘বস্তির বাসিন্দা এবং ভাসমান মানুষ ছাড়াও ঢাকায় তিনটি ‘ছিটমহল’ আছে৷ এগুলো হলো ক্যান্টমমেন্ট এলাকা, বিজিবি সদর দপ্তর এবং বিমানবন্দর৷ এসব এলকায় সিটি কর্পোরেশন কিছু করতে পারেনা৷ আমার প্রস্তাব হচ্ছে ঢাকার সব এলাকায় একযোগে একই সময়ে এডিস মশা নির্মূলে কাজ করা উচিত৷ আলাদাভাবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে করলে তা কম কার্যকর হবে৷”

এদিকে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘আসলে ডেঙ্গুর জন্য বস্তি বা অভিজাত এলাকা আলাদা কোনো গুরুত্ব বহন করেনা৷ এডিস মশা যে পরিবেশে জন্মায় সেই পরিবেশ যেখানে হবে সেখানেই মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হবে৷ তাই এডিস মশা যাতে জন্মাতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে৷ সেটা বস্তি হোক আর অভিজাত এলাকা হোক৷”

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকা উচিত: ড. একেএম নূর-উন-নবী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ভুঁইয়া ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ডেঙ্গুর বিষয়ে বস্তিবাসীদের জন্য আমাদের আলাদা কোনো কর্মসূচি নেই৷ সবার জন্যই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে৷ বস্তিতেও আমরা মশার ওষুধ ছিটাচ্ছি৷ সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালাচ্ছি৷” দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন থেকেও একই কথা জানানো হয়৷

এদিকে কারা-কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, কারাগারগুলোতে এডিস মশার উপস্থিতির কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি৷ কারাগারের কোনো বাসিন্দা এখনো ডেঙ্গু আক্রান্ত হননি বলে জানান তারা৷ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমাদের কারাগার অনেক পরিস্কার পরিচ্ছন্ন৷ এখানে আমরা কোনো পানি জমতে দেইনা৷ আমাদের কয়েদিরা পালা করে নিয়মিত কারাগার পরিস্কার রাখেন৷ আর মশা নিধনে আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থা আছে৷ আমরা নিয়মিত মশার ওষুধ স্প্রে করি৷ কারাগারে মশারি ব্যবহার করা হয়না৷”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী এবছর ২৮ জুলাই পর্যন্ত ১১ হাজার ৬৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন৷ শুধু জুলাই মাসের ২৮ দিনে ভর্তি হয়েছেন নয় হাজার ৫১০ জন৷ আর একদিনে হাসপাতালে ভর্তির নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে রবিবার, ৮২৪ জন৷ তার আগের দিন শনিবার ভর্তি হয়েছেন ৭৪৯ জন৷

উত্তরা নিউজ/এস,এম,জেড