জ্বিলহজ্ব মাসের জরুরি নেক আমল সমূহ

করণীয় ও বর্জণীয়

» মুহাম্মদ গাজী তারেক রহমান | উত্তরা নিউজ, স্টাফ রিপোর্টার | সর্বশেষ আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২০ - ০৩:৩৩:৩৮ অপরাহ্ন

১৪৪১ হিজরীর দ্বাদশতম মাস জ্বিলহজ্বের গণনা শুরু হয়েছে। কোরআন-সুন্নাহর অকাট্য দলিল অনুযায়ী চন্দ্র বছরের ১২ মাস বা ৩৫৫ মতান্তরে ৩৫৪ দিনের মধ্যে ৪ টি মাসকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সম্মানিত এবং ৩ টি দশককে সেরা দশক হিসেবে ঘোষনা করেছেন। এই ৪ টি মাসের মধ্যে অন্যতম মাস হচ্ছে জ্বিলহজ্ব এবং ৩ টি সেরা দশকের অন্যতম দশক হচ্ছে জ্বিলহজ্বের প্রথম দশক, এ সময়ে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মহান আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে তদীয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) কে কোরবানীর উদ্যোগ গ্রহণ এবং আরাফাত ময়দানে হজ্ব উপলক্ষে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের আন্তর্জাতিক মহাসমাবেশের স্মৃতিবিজড়িত এই দিনের রয়েছে অনন্য ফজিলত ও বরকত।

যদিও ক্ষনস্থায়ী মানব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও মুল্যবান। ঈমানের দাবী হচ্ছে, মানুষ তার জীবনের সর্বস্তরে, সকল দিক ও বিভাগে, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক জীবনে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিরঙ্কুশ গোলামী করবে, অন্য কারো নয়। কিন্ত মানুষ পদে পদে ভুল করবে দয়াময় স্রষ্টা এটা জানেন বলেই মানুষের সীমিত হায়াত ও বিভিন্ন দুর্বলতা থাকার কারনে দয়া করে মানুষকে কতগুলো বিশেষ সুযোগ ও বোনাস দিয়েছেন। এগুলো হল উপরে উল্লেখিত বিশেষ মাস, দিন ও রাত্রি যেমন চন্দ্র বৎসরের ৩৫৫ দিনের মধ্যে জ্বিলহজ্বের ৯ তারিখে ইয়াওমে আরাফা বা আরাফা দিবসকে শ্রেষ্ঠদিন বলা হয়েছ। আরাফার দিন হলো দোয়া করার উত্তম দিন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘সর্বোত্তম দোয়া হচ্ছে, আরাফাতের দিনের দোয়া।
আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ এদিনে উত্তম যে দোয়াটি পড়তাম তা হচ্ছে ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদীর।’’ এছাড়া রমযানের শেষ দশকের লাইলাতুল কদর বা কদরের রাতকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত হিসেবে বাছাই করা হয়েছে । এ দিন ও রাত্র গুলোতে ইবাদত-বন্দেগী করলে অনেক বেশি পরিমানে সওয়াবের অধিকারী হওয়া যাবে।

জ্বিলহজ্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ নেক আমলের বিষয়ে আলোকপাত করার চেস্টা করছি।
(১) আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত পবিত্র কালামে মাজিদে ইরশাদ করেছেন, ” শপথ ফজরের, শপথ দশ রাত্রির” ( সুরা ফাজর: ১-৩)। স্বনামধন্য সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) সহ অনেক সাহাবী, তাবেঈ ও মুফাসসির বলেন, এখানে দশ রাত্রি দ্বারা জ্বিলহজ্বের প্রথম দশ রাতকে বোঝানো হয়েছে (তাফসিরে ইবনে কাসির ৪/৫৩৫)। এ দশ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। আবু দাউদ ২৪৩ এবং বোখারী ৯৬৯ এ আছে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন রাসুল (সা:) ইরশাদ করেছেন আল্লাহর কাছে জ্বিলহজ্বের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় কোন আমল নেই। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা:) আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও কি এর চেয়ে উত্তম নয়? তিনি বললেন, না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও নয়, তবে সেই ব্যক্তির জিহাদ এরচেয়ে উত্তম যে নিজের জানমাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছে তারপর আর ফিরে আসেনি। সুরা তাওবার ৩৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন “এ সম্মানিত মাস গুলোতে (মহররম, রজব, জ্বিলক্বদ ও জ্বিলহজ্ব) পাপাচারে লিপ্ত থেকে তোমরা নিজেদের উপর যুলুম করোনা”।

এছাড়া তকবির পাঠ করতে হবে, “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।” জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সালাম ফিরাবার পর এই তাকবির পাঠ করতে হবে।

(২) পবিত্র হাদিস গ্রন্থ মুসলিম শরিফে উল্লেখ আছে যে উম্মে সালামা (রা:) থেকে বর্ণিত আছে আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেন, যখন জ্বিলহজ্বের চাঁদ উঠবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কোরবানি করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ” তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্য সালাত কায়েম কর ও কুরবানি কর “(সুরা কাওসার)। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা:) থেকে বর্নিত নবী করিম (সাঃ) বলেন ” আমাকে কোরবানির দিবসে ঈদ পালনের জন্য আদেশ করা হয়েছে, যা আল্লাহ এ উম্মাতের জন্য নির্ধারণ করেছেন”। এক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমার কেবল মাত্র একটি অন্যের দেয়া দুধ দোহনকারী উটনী আছে, আমি কি তা কোরবানি করতে পারি? নবী করিম (সা:) বললেন “তুমি চুল, নখ ও মোচ কাটবে এবং নাভির নিচের পশম পরিস্কার করবে। এটি তোমার পুর্ণ কোরবানি হিসেবে গন্য হবে” ( আবু দাউদ ও নাসাঈ )। এ চুল ও নখকে কোরবানির পর কাটার জন্য ইঙ্গিত করা হয়েছে।

(৩) রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন যে ব্যক্তি জ্বিলহজ্বের প্রথম থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখবে সে আগের ১ বছর ও পরবর্তী এক বছর রোজা রাখার সাওয়াব পাবে, (মুসলিম ও তিরমিজি)। এছাড়া এ দশকে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার জিকির বেশি বেশি করার জন্য আল্লাহ নিজেই তাগিদ করেছেন।

অতএব আসুন আমরা সকলে মিলে আল্লাহর কাছে দোয়া করি তিনি যেন এ মাসে এ দশকে আমাদেরকে বেশি বেশি নেক আমল করার তাওফিক দান করেন, আমীন।

লেখক: অধ্যক্ষ আব্দুস সামাদ, সাবেক প্রিন্সিপাল, আইডিয়াল টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, উত্তরা, ঢাকা।