জ্ঞান অন্বেষণের পুস্তিকা ও পাইপে দুর্নীতির ভূগর্ভস্থ পানি!

গুজবে কান দেবেন না প্রমাণ করুন

» মোঃ সবুর মিয়া উত্তরা নিউজ | | সর্বশেষ আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ০৫:১৮:৩৫ অপরাহ্ন

দেশের প্রায় সব সেক্টরের উন্নয়ন প্রকল্প দুর্নীতির  কাছে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। দেশে বড় বড়  দুর্নীতি গুলো মিডিয়ায় ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে কিন্তু সমাধান হচ্ছে না, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে তথ্য-প্রমাণের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রদান করতে না পারলে দুর্নীতি এক ধরনের গুজবে পর্যবসিত হবে। জামালপুরের সম্মানিত মহামান্য ডিসি সাহেবের ভিডিও ফুটেজ এর মত প্রমাণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

দুর্নীতির মহাউৎসবে আমাদের বসবাস, মেডিকেল কলেজের পুস্তিকা ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ও ওয়াসার প্রকল্পের পানির পাইপ বসিয়ে টাকা লোপাটের অভিযোগ মিডিয়াকে নতুনভাবে আন্দোলিত করতে শুরু করেছে। দুর্নীতি দুইটির খন্ডচিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

জ্ঞান অন্বেষণের পুস্তিকাই দুর্নীতিঃ

গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজের জন্য বইয়ের ১০টি কপি কিনেছে “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর”। বইটির বাজারমূল্য সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা হলেও “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর” প্রতিটি বই কিনেছে ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা করে। ১০ কপি বইয়ের দাম পরিশোধ করা হয়েছে ৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।অর্থাৎ বাজারের দামের তুলনায় ৮ লাখ টাকা বেশি খরচ করে এ বই কিনেছে “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর”দুটি টেন্ডারে ৪৭৯টি আইটেমের ৭ হাজার ৯৫০টি বই কিনেছে “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর”এসব বইয়ের মূল্য বাবদ পরিশোধ করেছে ৬ কোটি ৮৯ লাখ ৩৪ হাজার ২৪৩ টাকা। ২০১৯ সালের ১৯ই জুন টেন্ডারটি পেয়েছিল “হাক্কানী পাবলিশার্স”।

রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজের জন্য ৩১৭টি আইটেমের ২,৪৫৪টি বই, ২ কোটি ৫০ লাখ ৯১ হাজার ২৮৫ টাকায় কেনা হয়েছে। সারাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের জন্য ১৬২টি আইটেমের ৫,৪৯৬টি বই কেনা হয়েছে ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৪২ হাজার ৯৫৮ টাকায়।২০১৯ সালের ২৬ ও ২৭ মে বই কেনার জন্য পৃথক দুটি টেন্ডার আহ্বান করেন “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর”।প্রথম টেন্ডারের মূল্য ধরা হয় পাঁচ কোটি টাকা ও দ্বিতীয়টির মূল্য ছিল ২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। বইগুলো দ্বিগুণ, তিনগুণ কোনও ক্ষেত্রে ১৫ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে।

ওয়াসার পাইপ বসিয়ে হরিলুটঃ

বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় সহ ঢাকায় পানির চাহিদা পূরণকল্পে মিরপুরের ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা হ্রাসকরণ প্রকল্পের জন্য সাভারে ভাকুর্তা,তেঁতুলঝোড়া ও কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নে জায়গা নির্বাচন করা হয়।এ প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় অনুসন্ধানে নামে (দুদক)। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। ওয়াসার ৫৭৩ কোটি টাকার প্রকল্পে গভীর নলকূপসহ পাম্প বসানোর জায়গায় শুধু পাইপ বসিয়ে কাজ শেষ করেছেন ঠিকাদার।

৪৬টি গভীর নলকূপের মধ্যে ৫টিতে পানি ওঠানোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিই বসানো হয়নি,তিনটিতে নলকূপের পাইপ বসিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করে বিল তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার। ৫৭৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ধাপে ধাপে হরিলুট চললেও এখনো অধিগ্রহণ করা জমির অর্থ পরিশোধ করা হয়নি ক্ষতিগ্রস্তদের। ঠিকাদার কোরিয়ান কোম্পানি “হুন্দাই রোটেম” স্থানীয় ঠিকাদার অ্যারিডড গ্রুপ,টাকার লেনদেন ওয়াসার সঙ্গে  হুন্দাই কোম্পানির হয়েছে।

উক্ত‘প্রকল্প’টি ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর অনুমোদিত হয় মোট ৫২১ কোটি টাকার প্রকল্প ২০১২ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০১৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

২০১৬ সালের ২৯ মার্চ সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ৫৭৩ কোটি টাকায় বাড়ানো হয়।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে প্রকল্পের ব্যয় ৫২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।

প্রকল্পের মধ্যে ৪৬টি উৎপাদনযোগ্য কূপ,২টি আয়রন অপসারণ প্লান্ট, ১টি ভূউপরিস্থ জলাধার,৭.৮১হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ,৪৮.৭৮ কি.মি. পানি সরবরাহ লাইন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হলেও ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪৬ শতাংশ। ঠিকাদারকে ৩১৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে কাজের অগ্রগতির সঙ্গে ঠিকাদারের পরিশোধিত বিলের পার্থক্য অনেক। সাভারের ভাকুর্তা, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নে দেখা যায়, তেঁতুলঝোড়ায় বসানো ৫টি গভীর নলকূপের সবই বন্ধ। ঝাউচর বাজার, উত্তর মেইটকা, শ্যামপুর, দক্ষিণ শ্যামপুর ও মুসুরিখোলায় বসানো গভীর নলকূপগুলো সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রধান ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও স্থানীয়দের এখনো পরিশোধ করা হয়নি অধিগ্রহণ করা জমির দাম।

এদিকে যে কটা গভীর নলকূপ চালু হয়েছে তাতেই খাঁখাঁ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এলাকাজুড়ে। ভাকুর্তার কোনো বাড়ির টিউবওয়েল দিয়ে আর পানি উঠছে না। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় খেতে সেচ দিতে পারছে না কৃষক। এ এলাকার ইরি ধান চাষ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

উন্নয়ন আর দুর্নীতি কখনো একে অপরের পরিপূরক হতে পারে না, দুর্নীতি সব উন্নয়নকে পরাভূত করে ব্যর্থতাই নিমজ্জিত করে। সাধারণ মানুষের কল্যাণে অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তাই দেশের আমজনতা মনে করে দুর্নীতি মুক্ত, মানব কল্যাণমুখী উন্নয়ন দিয়ে মানুষকে কল্যাণের দিকে অগ্রগামী করতে হবে, তবেই হবে সত্যিকার অর্থে বাস্তবমুখী উন্নয়ন।