জিপিএ ফাইভ -আল আমিন সোহেল


» এইচ এম মাহমুদ হাসান | | সর্বশেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ - ০১:০৯:০৮ অপরাহ্ন

ভোর হয়েছে। মিনার হতে ভেসে আসছে আজান। দূর-দূরান্তে পড়ছে সে সুরের মূর্ছনা।ধ্বনিত্ব হচ্ছে বড়ত্বের জয়গান। মুয়াজ্জিনের সুরের তানে উতাল পাতাল করে উঠছে হৃদয়। নেচে উঠছে ধমনী। শরীরের শিরা উপশিরা গুলো ও যেন গেয়ে উঠছে “আল্লাহু আকবার “।গাছে গাছে পাখির কলতানেও যেন ভেসে আসছে মহান মালিকের জিকির।

আঁধার কাটিয়ে আলোর প্রদীপ নিয়ে পূব আকাশে উঁকি দিচ্ছে সূর্যি মামা। ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে অন্ধকারের ঘোর। প্রস্ফুটিত হচ্ছে সুন্দর এক ভোর। ঝলমল করে উঠছে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির কণা। নানা রঙের ফুলের সুবাসে বিমুগ্ধ পরিবেশ।

নামাজ শেষে মায়ের কবর জিয়ারত করে বাড়ি ফিরছিল জামিল। দুমাস আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তার মা ফাতেমা। টাকার অভাবে ভালো হসপিটালে চিকিৎসা করার তৌফিক হয়নি। যার শেষ পরিণতি হয়েছে মৃত্যু। পিতা কে হারিয়েছে জন্মের পূর্বেই। ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। একমাত্র ভরসাস্থল ছিল তার মা। সুখে দুঃখে আগলে রেখেছে তাকে। সামনেথেকে তাকে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে বড় হবার। স্বপ্ন দেখিয়েছে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার।

অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও তার লেখাপড়ার যেন কোন ত্রুটি না হয় সে ব্যাপারে তিনি ছিলেন সদা যত্নবান। অন্যের বাড়িতে কাজ করে যুগিয়েছে তার বই কেনা, টিউশন ফি, প্রাইভেট সহ যাবতীয় খরচের টাকা।

পিতাকে হারিয়ে মা’ই ছিল তার একমাত্র সম্বল। মাকে হারিয়ে আজ সে একেবারে ভেঙে পড়েছে। সে এখন একদম নিঃস্ব। কিন্তু মায়ের শেখানো কথা অনুযায়ী নিজেকে সতেজ রাখার চেষ্টা করে। তার মা তাকে বলেছিল “খোকা মনে রাখবি পৃথিবীতে যার কেউ নেই তার রয়েছে আল্লাহ” তাই সে নিজেকে আল্লাহর উপরে সমর্পণ করেছে।

আনত নয়নে হেঁটে চলছে জামিল। চোখেমুখে অসহায়ত্বের ছাঁপ। ধীরে ধীরে যেন শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে।পা দুটো যেন সামনে এগোচ্ছে না। আঁখিদয় বন্ধ হয়ে আসছে। হঠাৎ মাথা চক্কর দিয়ে পড়ে যায় জামিল। তৎক্ষণাৎ সেন্স হারিয়ে ফেলে।

তিনদিন পর জ্ঞান ফেরে জামিলের। নিজেকে আবিস্কার করে কোন এক হসপিটালের বেডে। চারিদিকে মানুষের সমাগম। প্রত্যেকের হাতে ফুলের তোড়া। কারো হাতে মিষ্টি, মিঠাই। ভিড় ঠেলে সামনে আসার চেষ্টা করছে সাংবাদিকগণ।
সবকিছুই যেন কেমন অচেনা, অপরিচিত লাগছে। কাউকে চিনতে পারছে না সে। “আমি কোথায়, আমি কোথায়, আপনারা কারা? ধরা ধরা গলায় বলতে লাগলো জামিল। হঠাৎ কারও হস্ত স্পর্শে ফিরে তাকাল।
ঃ আমি তোমার প্রিন্সিপাল স্যার। আমাকে চিনতে পারছো না তুমি? বললেন পাশে বসা এক ভদ্রলোক। জামিল তাকে চিনতে পারলো। উঠে বসার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু স্যার তাকে শুয়ে দিলেন।

ঃ আমার কি হয়েছে স্যার আমি এখানে কেন কিভাবে এলাম এখানে?
ঃ তুমি রাস্তায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে। তারপর তোমাকে এই হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে। তিন দিন পর আজ তোমার জ্ঞান ফিরেছে।
ঃ কিন্তু স্যার এনারা কারা চারদিকে এত মানুষ কেন আমিতো কাউকে চিনতে পারছিনা?
ঃ- জামিল তোমার জন্য একটি মহা সুখবর আছে। তোমার এসএসসি রেজাল্ট বের হয়েছে। তুমি গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছো। এবং রাজশাহী বিভাগের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছো। এনারা হলেন বিভাগীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিসারবৃন্দ। তোমাকে কংগ্রেজুলেশন জানাতেই তারা এসেছেন। অবশিষ্টরা হলেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কর্মকর্তা।

ধ্যানমগ্ন হয়ে শুনছিলো জামিল। তার কোন ভাষা মুখে আসছিল না। যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না তার মত গরিবের এই ঝুলিতে এত বড় অর্জন। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে শুধু এদিক ওদিক দেখছিল। দুচোখ বেয়ে ঝরে পড়ছিল অশ্রু কনা।

এ অশ্রু বিরহ বেদনার নয়। এ কান্না কোন বিষাদের নয।় বরং এ কান্না আনন্দের এ কান্না সুখের।

প্রিন্সিপাল স্যার তার চোখের পানি মুছে দিলেন। বিভাগীয় শিক্ষা সচিব পুরস্কার হিসেবে তার হাতে উঠিয়ে দিলেন পাঁচ লাখ টাকার চেক। এবং একটি সংস্থা জামিলের যাবতীয় খরচের দায়ভার গ্রহণ করল। এরপর শুরু হল অন্যদের শুভেচ্ছা জানানোর পালা।

দেখতে দেখতে ফুলের তোড়ার স্তুপ হয়ে গেল। জামিলের অশ্রুকণা যেন থামছেই না। চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছিল তার শরীরে থাকা জামা।
” আপনারা আমার একটি রিকোয়েস্ট রাখবেন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল জামিল। সবাই এক বাক্যে বলে উঠল “অবশ্যই। কেন নয়। সবাইকে নিয়ে জামিল চলে এলো তার মায়ের কবরের পাশে।
ফুলগুলো রেখে দিল মায়ের কবরের শিয়রে। হাঁটু গেড়ে বসে পরল জামিল। দুই হাত দিয়ে কবরের মাটি গুলো বুলাতে লাগলো।আর চিৎকার করে বলতে লাগল মাগো তুমি শুনতে পাচ্ছ? এই যে দেখো তোমার খোকা গোল্ডেন প্লাস পেয়েছে। দেখো মা দেখো………কত মানুষ আমাকে দেখতে এসেছে. আমাকে ফুলের তোড়া দিয়েছে। এই যে ফুলগুলো এগুলো তোমার জন্য। ওমা কথা বলোনা কেন?
মা কথা বলোনা। প্লিজ কথা বলো।

তুমি না বলেছিলে। আমি অনেক বড় হবো। পৃথিবীর সবাই আমাকে চিনবে। আমার ঝুলিতে অনেক বড় বড় অর্জন থাকবে। তুমি আমাকে আদর করবে। কপালে চুমু দিবে। খোকা বলে ডাকবে। দেখো আজ কত ভালো রেজাল্ট করেছি আমি। আমাকে তুমি উইশ করবে না? আমাকে তুমি শুভেচ্ছা জানাবে না?
ওমা…… কথা বল……. মা……। মাগো ওঠো, ওঠো, ওঠো, মা মা মা……….