জাবি ভিসির পক্ষে মাঠে সোচ্চার বিতর্কিত শিক্ষকরা


» উত্তরা নিউজ I সারাবাংলা রিপোর্ট | | সর্বশেষ আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০১৯ - ০৬:৪১:২৮ অপরাহ্ন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। অপরদিকে উপাচার্যকে বাঁচাতে তার পক্ষে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন উপাচার্যপন্থী শিক্ষকরা।

উপাচার্যপন্থী এই শিক্ষকদের অনেকরই বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি ও বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে নানা রকম অনৈতিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে এই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।

এছাড়া এসকল শিক্ষকদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি, সরকারী টাকা আত্মস্যাৎ ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ। এই প্রতিবেদকের হাতে এরকম অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষকের নাম রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

অধ্যাপক বশির আহমেদ: বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদ উপাচার্যের রাজনৈতিক উপদেষ্টার আসনে আসীন রয়েছেন। তিনি উপাচার্যের অনুসারী শিক্ষক সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ’র সাধারণ সম্পাদক। এই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে রয়েছে নিয়োগে দুর্নীতি, জুনিয়র অধ্যাপক হয়ে সিনিয়র অধ্যাপকের দায়িত্বগ্রহণ, একাধিক পদে দায়িত্ব পালন, ছাত্রীর সাথে ‘অনৈতিক’ সম্পর্ক, অন্য অধ্যাপকদের ভিসির দলে আনতে চক্রান্তমূলক অভিযোগ দায়ের করে সম্মানহানীর ও অভিযোগ। নিয়ম বহির্ভূতভাবে আইন অনুষদের ডীনের পদটি আগলে রেখেছেন এই শিক্ষক। নানান বিতর্ক আর প্রতিরোধের মধ্যেই গত বছরের মার্চ মাসে ডীনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ ও নিয়ম অনুযায়ী আইন ও বিচার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলামের ওই পদ লাভ করার কথা। কিন্তু উপাচার্যের বিপক্ষের গ্রুপের রাজনীতির সাথে অবস্থান নেওয়ায় তাকে উপেক্ষা করে অনুষদের ডীন পদে আসীন হন অধ্যাপক বশির আহমেদ।

পরবর্তীতে ড. রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি অডিও ফাঁসের অভিযোগ এনে তাকে শাস্তির ভয় দেখিয়ে কৌশলে উপাচার্যের দলে ভেড়াতে বাধ্য করেন বশির আহমেদ। এছাড়া ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সিনিয়র এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ‘ছাত্রী হয়রানি’র অভিযোগ উঠলে শাস্তির ভয় দেখিয়ে উপাচার্য বিরোধী শিবির থেকে তাকেও উপাচার্যের দলে ভিড়তে বাধ্য করেন তিনি।

এদিকে জুনিয়র অধ্যাপক হয়েও ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পরিচলকের পদ, শেখ হাসিনা হলের প্রাধ্যক্ষের পদ, প্রভোস্ট কমিটির সভাপতির পদ সহ কয়েকটি পদ ধরে রেখেছেন তিনি। এছাড়া তার বিভাগের এক ছাত্রীর সাথে ‘অনৈতিক’ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিভাগের এক সিনিয়র অধ্যাপক ও তার নিজ দলীয় শিক্ষকরা। এ সম্পর্কিত একটি লিফলেটও রয়েছে এ প্রতিবেদকের হতে।

আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান: আর এক উপাচার্য পন্থী বিতর্কিত-আলোচিত শিক্ষক হলেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও এক হলের প্রাধ্যক্ষের পদ দখল করে রেখেছেন। তার বিরুদ্ধে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।

২০১১ সালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সম্পৃক্ততা থাকায় তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এছাড়া প্রক্টরের দায়িত্ব পেতে তড়িঘড়ি করে পদোন্নতি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অধ্যাপক রাশেদা আখতার: উপাচার্যপন্থী আর এক বিতর্কিত শিক্ষক হলেন অধ্যাপক রাশেদা আখতার। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট, সিন্ডিকেট সহ প্রায় ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রেখেছেন। এর মধ্যে সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ডীন (ভারপ্রাপ্ত), ছাত্রকল্যান ও পরামর্শদান কেন্দ্রের পরিচালক এবং যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলের প্রধান পদেও রয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এত গুলো পদে থাকলেও ক্যাম্পাসের আবাসিকে অবস্থান করেন না তিনি।

ফলে এসব দায়িত্বে ব্যাপক অবহেলা আর অনিয়মের হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই সব অফিস সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কল্যাণ ও পরামর্শ দান কেন্দ্রকে নিষ্ক্রিয় অফিসে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিস; কিন্তু বার্ষিক প্রবেশিকা অনুষ্ঠান ছাড়া ছাত্র সংশ্লিষ্ট কোন অনুষ্ঠান করতে দেখা যায়নি তিনি দায়িত্বকালীন ৬ বছরে।

ড. জেবউন্নেসা জেবা: উপাচার্যপন্থী আর এক বিতর্কিত শিক্ষক হলেন লোকপ্রশাসন বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ড. জেবউন্নেসা জেবা। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে একাধিক গবেষণা পত্রে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া বিভাগে গ্রুপিং তৈরী, বিভাগের এক শিক্ষকের চাকুরী বাঁচাতে অনৈতিক সমর্থন সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ড. মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমান: উপাচার্যপন্থী আর বিতর্কিত শিক্ষক লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ছায়েদুর রহমান। তার বিরুদ্ধে গবেষণা পত্র জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিভাগের নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, যোগ্য প্রার্থীদের বাদি দিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগে দেওয়া সহ এ সম্পর্কিত নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া সম্প্রতি উপাচার্যের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিতে নিজের দল পরিবর্তন করেছেন বলে অভিযোগ করেছে স্বয়ং উপাচার্যপন্থী শিক্ষকরাই।

মহিবুর রৌফ শৈবাল: উপাচার্যপন্থী আর এক বিতর্কিত শিক্ষক হলেন নাটক ও নাট্যতত্ব বিভাগের প্রভাষক মহিবুর রৌফ শৈবাল। তিনি বর্তমান প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য। বিগত ৩রা জুলাই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের ৪ ঘন্টা ব্যাপী চলা সংঘর্ষের সময় দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

শাখা ছাত্রলীগে ও প্রশাসনপন্থী শিক্ষকদের অভিযোগ, তিনি দায়িত্বের চেয়ে নিজ মুঠোফোনে ভিডিও করায় ব্যস্ত থাকেন সব ঘটনায়। এমনকি ছাত্রলীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময়ও তিনি এমনটি করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এছাড়া গত বছর মে মাসে আল বেরুনী হলের পূনর্মিলনী অনুষ্ঠানের সাংষ্কৃতিক পর্বের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সে সময় তার বিরুদ্ধে ‘বিশেষ পানীয়’ কেনার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘সকল নিয়ম মেনেই আমি পদন্নোতি পেয়েছি। প্রশ্নফাঁসের সাথে আমি জড়িত ছিলাম না। এছাড়া আদালতে আমি নির্দোষ প্রমানিত হই।’

লোকপ্রশাসন বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ড. জেবউন্নেসা জেবা বলেন, ‘পরিবারে একসাথে চলতে গেলে বিভিন্ন সময় যেমন ভূল বুঝাবুঝি হয়। তেমনি আমাদের বিভাগে মাঝেমধ্যে একটু ভূল বুঝাবুঝি হয়। আমরা নিজেরাই আলোচনা করে আবার ঠিক করে ফেলি। এবারও একটু ভূল বুঝাবুঝি হয়েছে তবে ছায়েদ ভাই আসলে আমরা উপাচার্য ম্যামের সাথে আলোচনা করে ঠিক করে নিবো।’

নাটক ও নাট্যতত্ব বিভাগের প্রভাষক মহিবুর রৌফ শৈবাল বলেন, ‘ভিডিও করাটা আমাদের দায়িত্ব। আল বেরুনী হলের পূনর্মিলনী অনুষ্ঠানের সাংষ্কৃতিক পর্বের ‘বিশেষ পানীয়’ কেনার টাকা আত্মসাতের সাথে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। এই অভিযোগ ভিত্তিহীন।

এছাড়া অভিযোগের বিষয়ে জানতে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদ, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদা আক্তার ও লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ছায়েদুর রহমানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।

এবিষয়ে উপাচার্যপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ’র সভাপতি আব্দুল মান্নান চৌধুরী বলেন, ‘আমি এবিষয়ে জানিনা। খোঁজ নিয়ে সংগঠন থেকে সিদ্ধান্ত নিবো।’

উত্তরা নিউজ/বেলাল হোসেন