ছোটগল্প || খাট


» কামরুল হাসান রনি | ডেস্ক ইনচার্জ | | সর্বশেষ আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০১৯ - ১২:০১:৩৫ অপরাহ্ন

শান্তিবালা আর ইন্দ্রজিৎ অধিকারী বুড়ো বয়সে বাংলাদেশ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় এসে বাস গেড়েছেন নয়-দশ মাস হলো। নদীয়া শহরের একপ্রান্তে ভাড়াবাড়িতে প্রথম-প্রথম তারা দুজনই ভীষণ একাকিত্ব বোধ করতেন। মনে হতো এই বয়সে জন্মভূমি ছেড়ে এসে ভুল করেছেন। চারপাশের আলো-হওয়া-রোদও যেন ওদেশের মতো আপন নয়। বিশেষত যেখানে বাসা নিয়েছেন আশপাশে নিকটজন বলে কেউ নেই যার সঙ্গে দুদণ্ড প্রাণ খুলে কথা বলা যায়। দেশে তাদের কোনোকিছুর অভাব ছিল না, প্রভাব-প্রতিপত্তিও ছিল- কারো জ্বালাতন করার সাহস ছিল না, তারা সংখ্যাগুরুদের দ্বারা নিপীড়নের আশঙ্কা করেননি কোনোদিন। অথচ অভিমান করে দেশের মাটি ছেড়ে আসতে হল।

এই পরিস্থিতিটাকে ঠিক অভিমান নয় বরং ক্রোধ বলাই ভালো। যতোই হোক এটা অন্য দেশ, অধিকাংশ লোকের সঙ্গে ধর্মের মিল আছে বটে, তবে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হতেও তো খানিকটা সময় লাগে। ওরা নদীয়া শহরের কাছেই চারতলা বিল্ডিঙের তিনতলায় দুটো রুম ভাড়া নিয়েছেন। শান্তিবালা একদিন স্বামীকে বললেন, ‘আমাদের বাড়িওয়ালার নিচের একটা দোকানঘর খালি হয়েছে। দোকানটা আমরা নিতে পারি না?’

‘দোকান নিয়ে আমরা কী করব?’

‘একটা মনোহারী দোকান করা যায়। কসমেটিকস, ইমিটেশনের গয়না- এসব থাকল। আমিই চালাতে পারব, ইচ্ছে হলে তুমিও মাঝেমধ্যে বসতে পারো। পাড়ার মেয়েরাই হবে আমাদের কাস্টমার।’

‘দরকার কী আমাদের সংসার তো এক রকম চলে যাচ্ছে।’

‘তুমি ভেবেছ আমি টাকার জন্য দোকান করতে চাইছি? মোটেও না, সময়টা কাটবে আরকি। সারাদিন ওই দুটো ঘরের মধ্যে আমার ভালো লাগে না।’

আইডিয়াটা পছন্দ হয়েছিল ইন্দ্রজিতের। তিনি ওদেশে বহু লোকের সাথে ওঠাবসা করতেন। বড় ব্যবসা ছিল। চায়ের আড্ডা থেকে বাড়ি ফিরতেন রাত দশটায়। তরুণ বয়সে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। এখনও বহু পাঠ তিনি মুখস্থ বলতে পারেন। সেই মানুষের প্রবাসে এই বন্দী জীবন ভালো লাগবে কেন? তিনি দোকানের বিষয়ে শুধু রাজিই হন না, বুদ্ধিটার জন্য স্ত্রীকে তারিফও করেন। বলেন, ‘তুমি সত্যিই বুদ্ধিমতী আর বিচক্ষণ, আমি যে একজন শিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করেছিলাম, আমার সে সাফল্য বৃথা যায়নি।’ শান্তিরানির ম্লান মুখে হাসি ফোটে।

দোকানদারি কাজটা মন্দ লাগে না শান্তিরানির। প্রতিদিন নানা রকম মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কেউ মাসী, কেউ কাকি কেউ বা দিদি বলে ডাকে। ‘নতুন দোকান করলেন? আপনাদের কোথায় বাড়ি? ছেলেমেয়ে কজন? তারা কী করে- কোথায় থাকে?’ এসব আলাপও ভালোই লাগে শান্তিরানির। দোকানে তিনি সাদা রঙের নতুন একটা ইলেকট্রিক কেতলি রাখেন। যাদের সঙ্গে আলাপ জমে টিব্যাগ দিয়ে লেবু-চা করে খাওয়ান। তারা বলে, ‘আমরা আগেই শুনেছি- বাংলাদেশের মানুষ লোককে খাওয়াতে ভালোবাসে।’

প্রথম মাসেই দোকান থেকে প্রায় তিন হাজার টাকা লাভ হলো- এই হিসাব কষে দম্পতির মনটা খুশিতে ভরে যায়। শখের কাজ করতে গিয়ে কিছু উপার্জন হলে মন্দ কী! যখন দোকানে কেউ থাকে না, ফোমআঁটা চেয়ারটায় বসে এক কাপ চা খেয়েও ঝিমুনির মতো আসে শান্তিরানির। সেই ঝিমুনির মধ্যে তার দৃষ্টি ও কর্ণকুহরজুড়ে নানার দৃশ্য ও শব্দরাশি খেলা করে। শান্তির ক্লাস ফোর পাস বাবা মন্মথ মণ্ডল ছিলেন শুকনো মালের আড়তদার। তার তিনটে ছেলে আর ওই একটাই মেয়ে। মন্মথের ইচ্ছে ছিল মেয়ে অনেকদূর পর্যন্ত পড়াশুনা করবে- অন্তত মেট্রিকের গণ্ডী না পেরুলে বিয়ে দেবেন না। ক্লাস নাইনে উঠতে-উঠতে ২৯ জন ছেলের সঙ্গে তারা মাত্র দুইজন মেয়ে রইল, বাকি সবার বিয়ে হয়ে যায়। বাবা বলতেন, ‘সাত গ্রামে আমাদের মণ্ডল পরিবারের একটা সম্মান আছে। পড়াশুনা করছ ভালো কথা, কিন্তু কেউ যেন তোমার সম্পর্কে মন্দ কিছু বলতে না পারে। মাটির দিকে তাকিয়ে স্কুলে যাবে। আবার মাটির দিকে তাকাতে-তাকাতে সোজা বাড়ি ফিরে আসবে।’ বাবার সম্মানের যেন হানি না ঘটে সে সম্পর্কে শান্তিরানি সবসময় সচেতন থেকেছেন।

বাবার ইচ্ছে ছিল মেয়েকে বিএ পাস করাবেন। কিন্তু গ্রাম এলাকা- পারিপার্শ্বিক নানা কারণে এসএসসি পাসের পর বাবা মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে বেশ উঠে পড়েই লাগেন। তিনি বললেন, ‘তোমার স্বামী-শ্বশুর যদি রাজি থাকেন তাহলে তুমি আরও লেখাপড়া করতে পারবে।’ বিয়ের পাত্র দেখতে গিয়ে সমস্যা হলো শিক্ষিত  ছেলে তেমন পাওয়া যায় না। মেট্রিক পাস দুচারজন মেলে তারা যে চাকরি করে তাতে সংসার চালানোই মুশকিল। ঘটক এক পাত্রের সন্ধান নিয়ে এলো- পাত্র দেখতে শুনতে ভালো, বাজারে বড় দুটো দোকানের মালিক-  পৈতৃকসূত্রে অবস্থা বিশেষ মন্দ নয়। মেয়ে মেট্রিক পাস আর পাত্র মোটে প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়েছে তাই বাবা বিয়েতে অমত দেন। কিন্তু এর বছরখানেকের মধ্যে উপযুক্ত আর কোনো পাত্র না পাওয়ায় শান্তিরানি ইন্দ্রজিতের বিষয়েই চূড়ান্ত মত দেন। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে শান্তিবালা দেখলেন একটা টিনের বড় বাড়িতে চার ভাইয়ের সংসার। ইন্দ্রজিতের পিতামাতা এবং বড়দা বিগত হয়েছেন। বিধবা বৌদি তার দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন। মেজদা বিয়ে করেছে, তার এক মেয়ে; আর একটি দেবর ক্লাস এইটের ছাত্র।

এতো মানুষের মধ্যে শান্তিরানির প্রথমে ঠিক স্বস্তি লাগে না। তিনি স্বামীকে বলেন, ‘আমাদের একটা আলাদা সংসার হলে দোষ কী?’

ইন্দ্রজিৎ বলেন, ‘দোষ তেমন নেই, কিন্তু বড়দার পিতৃহীন ছেলে দুটো আছে, আছে আমার ভাই সুকেশ। ওদের রেখে আলাদা হওয়াটা কি ঠিক হবে? তবু তুমি যদি মনে করো আমার আলাদা ঘর ভাড়া নিতে আপত্তি নেই।’

‘তুমি যেটা ভালো বোঝ তাই হবে।’

ইন্দ্রজিৎ স্ত্রীর দুখানা হাত নিজের কোলের কাছে নিয়ে বলেন, ‘খুশি হলাম তোমার কথা শুনে। আমার বিশ্বাস তুমি উদার মনের মেয়ে। তুমি শুভব্রত, পরমব্রত আর সুকেশকে নিজের সন্তানের মতো করে যদি দেখ, তাহলে মনে তোমার একটা শান্তি আসবে।’

শান্তিবালা স্বামীর কথা মেনে একান্নবর্তী সংসারটাকে গুছিয়ে নিতে ব্রতী হন। বিশেষত তার পিতা উদার হবারই শিক্ষা দিয়েছেন, সঙ্কীর্ণ হতে নয়। ওদিকে ইন্দ্রজিতও ব্যবসার পিছনে রাতদিন সময় দেন। ক্রমেই তার পুঁজি বাড়ে, বাড়ে দোকানের সংখ্যা, জায়গাজমি- প্রতিপত্তি। পৈতৃক ভিটায় টিনের ভিটা ভেঙে ফেলে চারতলার ভিত্তি দিয়ে বিল্ডিং তোলেন। এর মধ্যে সুকেশ বড় হয়ে ওঠে। দাদার মত অগ্রাহ্য করে কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় রাজনীতিতে যোগ দেয়। সরকারি দলের উপজেলা ছাত্র সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের পদ পেয়ে অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মন্দ কাজের সঙ্গে সে জড়িয়েছে এমন কথা ইন্দ্রজিতের কানে আসে। কিন্তু নেতা-ভাইকে সে কিছু বলতে সাহস করে না। কারণ সে জানতো এখন কোনো ভালো কথাই শুনতে সে প্রস্তুত নয়। উপদেশ দিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। সুকেশকে শহরে সবাই এক নামে চেনে। ওর প্রভাবে বাড়ির ছেলেমেয়েগুলো খারাপ হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় শান্তিবালার সাথে কথা বলে নিজের দুই সন্তান অনিমেষ আর অঞ্জলিকে ভারতে বোর্ডিং স্কুলে পড়তে পাঠিয়ে দেন ইন্দ্রজিৎ। ওরা দুজনই হায়ার সেকেন্ডারিতে ভালো ফল করে ইঞ্জিনিয়ারিঙে ভর্তি হয়। এর মধ্যে বাড়িতে দুটো বড় ঘটনা ঘটে যায়। এক. সুকেশ তার পছন্দমতো মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তোলে। বিয়েতে তার শ্বশুর একটা পালসার মোটর সাইকেল যৌতুক দেয়। দুই. এর পাঁচ দিনের মাথায়  ছোটকাকার মোটর সাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে ১৭ বছর বয়সী পরমব্রত ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মারা যায়- স্পটডেড। ওর দেহটা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। পিতৃহারা পরমব্রতের এই মৃত্যুতে ইন্দ্রজিৎ ভীষণ মুষড়ে পড়েন। তার মনে হয় বাড়িতে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় ভ্রাতুষ্পুত্রের এই অপমৃত্যু। তার মনে হয়েছিল ভাইপোর হাতে মোটর সাইকেল তুলে দেবার কারণে সুকেশকে কিছু চড়-থাপ্পড় অন্তত দেবেন। কিন্তু এতে তো আর ওই কিশোর ফিরে আসবে না, তাই তিনি নিজেকে সামলে নিয়েছেন। তবে তিনি জানেন এই দুর্ঘটনার দায় আমৃত্যু তাকে পোড়াবে।

ইন্দ্রজিতের পুত্র অনিমেষ পড়াশুনার পাশাপাশি ভালো ক্রিকেট খেলতো। ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের ক্যাপ্টেন ছিল। পড়াশুনা শেষ করে অনিমেষ নিউজিল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিকেট টিমের কোচের দায়িত্ব নিয়ে ওয়েলিংটনে চলে যায়। আর অঞ্জলি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙে পাস করে রাজস্থানে একটা বিদেশি কোম্পানিতে চাকরি পায়। বাবা-মায়ের সম্মত্তি নিয়ে ওখানে একটা বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করে সে। জামাই সুধীর মৌলিক বাংলাদেশে এলে যথাযোগ্য মর্যাদা ও আদর আপ্যায়ন সহযোগে জামাইর হাতে মেয়েকে তুলে দেন ইন্দ্রজিত। এর কিছুকাল পর একদিন কী নিয়ে কথায়-কথায় বাড়ির পরিস্থিতি একটু উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকারি দলের সাথে থেকে সুকেশের গলার জোর আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

ইন্দ্রজিৎ বলছিল কত কষ্ট করে সে সংসারটাকে আগলে রেখেছে। তার জবাবে সুকেশ বলে বসে, ‘আর কত কৌশল করে তুমি ওপারে টাকা-পয়সা পাচার করেছ সে-কথা তো একবারও বলছ না।’

বাপ মরেছে আর প্রায় তিরিশ বছর। যে-ভাইকে পিতৃস্নেহে মানুষ করেছে তার মুখে এই কথা শুনে হতবাক হয়ে যায়। সে শুধু বলে, ‘এত বড় কথা তুই আমার সামনে বলতে পারলি?’

সুকেশ গলা চড়িয়ে বলে, ‘যা সত্যি তাই শুধু বলেছি।’

ছোটকাকার সাথে শুভব্রতও একজোট হয়েছে বোঝা যায়। ‘সে বলে সেজকা ছোটকা তো অন্যায় কিছু বলনি।’

পরিস্থিতি দেখে শান্তিরানি মুখ বন্ধ করে বসে থাকতে পারে না। সে বলে, ‘তোরা কীভাবে এতবড় অপবাদ দিতে পারলি আমাদের নামে?’

তখন মেঝো বউ এগিয়ে এসে বলে, ‘সত্য কথা বললে বুঝি অপবাদ হয়ে যায়, না? তোমাদের ওপারে বাড়িঘর সব হয়ে গিয়েছে আমরা জানি। আবার এ-বাড়ির ভাড়াও সব নিচ্ছ।’

ইন্দ্রজিৎ বলেন, ‘বেঁচে থেকে আমার আপনজনদের মুখে এমন কথা শুনতে হবে কখনও ভাবিনি।  তোমরা কখনও ভেবে দেখেছ বাবার টিনের ঘর থেকে কতটা পরিশ্রম করে আমি চার তলা বানিয়েছি। আমাদের ছেলেমেয়ে দুটোকে বাইরে পাঠিয়েছি আমার উপার্জিাত পয়সায়। ভগবান জানেন এই বাড়ির প্রতিটি ইট আমার রক্ত জল করে বানানো পয়সায় কেনা। শান্তি আমি আর এ বাড়িতে থাকব না। এত অপবাদ যেহেতু দেয়া হলো আমি কালই চলে যাব ইন্ডিয়া, এই বাড়ির কোনোকিছুই আমি চাই না। আর তোদের বলে রাখছি, আমি এ পর্যন্ত ওপারে একটি পয়সা পাঠাইনি। এক শতক জমি কিনিনি। আমার কথা যদি মিথ্যে হয়ে থাকে তবে আমার দুটো সন্তানের যেন অপমৃত্যু হয়। ভগবান সাক্ষী রইলেন।’

ইন্দ্রজিৎ আর শান্তিরানি পরদিনই বাড়ি ছাড়তে পারেননি তবে সাত দিনের মাথায় সত্যি সত্যি চিরকালের জন্য তারা বাড়ি ছেড়ে ওপারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাওয়ার সময় শুভব্রতকে ডেকে শান্তিরানি বলেন, ‘তুই তো আমার বড় ছেলে। আমার ঘরটা তোকে দিয়ে গেলাম। বাপের বাড়ি থেকে নিমকাঠের এই খাট আর কিছু বই এনেছিলাম। রবীন্দ্রনাথ-শরৎ-তারাশঙ্করের বইগুলো আমি নিয়ে গেলাম। আর খাটটা তোকে দিয়ে গেলাম। এতে তুই ঘুমিয়ে কাকিকে গঞ্জনা দিস বাবা।’

শুভব্রত কাকির হাত ধরে বলে, ‘তুমি আমাকে মাফ করে দাও। আমি ছোটকাকার কথা শুনে ভুল বুঝে সেদিন ওই কথাটা বলে ফেলেছিলাম। তোমারা দেশ ছেড়ে যেও না।’

‘না, সেটা আর হবার নয়, তোরা তো জানিস তোর সেঝো কাকা সবসময় এক কথার মানুষ। সে যেহেতু  মুখ দিয়ে বলেছে মরে গেলেও সে কথার নড়চড় হবে না।’

ইন্দ্রজিতের মামাতো শ্যালক নদীয়ায় তার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের এই বাসাটা ভাড়া করে দেয়। বাড়িটা একেবারে মন্দ নয়। গতবার মেয়ে-জামাই রাজস্থান থেকে বেড়াতে এসে বলল, ‘তোমরা এদেশে এসে ভালোই হয়েছে। আমরা ছুটি পেলেই তোমাদের কাছে চলে আসব।’ বাবা-মায়ের জন্য একটা ফ্রিজ আর এসি কিনে দিয়ে যায় অঞ্জলি। ওদিকে অনিমেষ নিউজিল্যান্ডে এক শেতাঙ্গ খ্রিস্টান মেয়েকে বিয়ে করেছে। ভিডিও কল করে সে বাবা-মাকে বৌয়ের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু শান্তিরানি তো ইংরেজি জানেন না। তার কষ্ট তিনি একমাত্র পুত্রবধূর সাথে কথা বলতে পারেন না। পুত্রবধূ ক্রিস্টিনা ভাঙা-ভাঙা যে কয়েকটি বাংলা শব্দ বলে তা শুনে শান্তিরানির ভীষণ হাসি পায়, করুণাও হয়। এ বৌ তার স্বপ্নের সাথে মেলে না। তার স্বপ্ন ছিলো একটা বাঙালি বৌ, জামদানি শাড়ি পরে কপালে সিঁদুর দিয়ে তার সামনে ঘুরঘুর করে বেড়াবে। তবু তিনি দূর থেকে ওদের জন্য আশীর্বাদ করেন। অনিমেষ বলেছে, ‘আগামী অক্টোবরে তোমার বৌমার মেয়ে হবে। মেয়েটা একটু বড় হলে আমি ওদেরকে তোমার কাছে নিয়ে আসব।’

শান্তিরানি মনে-মনে ঈশ্বরকে বলেন তার পুতনি যেন শেতাঙ্গ না হয়ে তার ছেলের মতোই হয়। আর তিনি আগেই অনিমেষকে বলে রেখেছেন সে যেন মেয়ের ওইসব ইংরেজি নাম না রাখে। ছেলে যে বলেছে নামটা না-হয় তুমিই  রেখে দিও, সেকথা শুনে শান্তিরানির অন্তর জুড়িয়ে যায়। তিনি মনে-মনে ঠিক করে রেখেছেন পুতনির নাম রাখবেন উমারানি অধিকারী।

আজকাল শুভব্রতও প্রায়ই শান্তিরানিকে ফোন দেয়। এরমধ্যে সে একবার নদীয়ায় তাদের বাসায়  বেড়িয়েও গিয়েছে। ও বলেছে বলেছে, ‘কাকিমা তোমরা এত বড় বাড়ি ছেড়ে এখানে এই দুই কামরাও মধ্যে কীভাবে থাকো?’

‘ভগবান যা ভাগ্যে রেখেছেন, তা-ই চিরকাল মঙ্গল বলে জেনেছি।’

গতকাল শুভব্রত আবার ভিডিও কল করেছিল। ‘কাকি, তোমার কারণে আমি মায়ের অভাব বুঝতে পারতাম না। আমার একটা কথায় তোমরা এতোবড় সিদ্ধান্ত নেবে ভাবতেও পারিনি।’

‘আরে পাগল তোদের কথা তো উছিলামাত্র। আমার অনিমেষ দেশে নেই, অঞ্জলিও এদেশে সেটেল করেছে তাই চলে আসা।’

‘অঞ্জলি তো সেই সুদূর রাজস্থান থাকে। কাকি তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।’

‘আমার কারো উপর কষ্ট নেই। তবে আমরা দুজন ঠিক করেছি এদেশের মাটিতেই আমাদের চিতা জ্বলবে।’

‘কাকি তুমি ইচ্ছে করেই তোমার খাটটা আমাকে দিয়ে গিয়েছ। এই খাটে ঘুমতো গেলে আমার খুব কষ্ট হয়। এটা তোমার বাবার দেয়া স্মৃতি- আমাকে দিতে গেলে কেন?’ মোবাইলে শুভব্রতের ধরা কণ্ঠ, তার চোখে জল।

‘ওদেশে তো তুই-ই আমার আপন জন তাই ওটা তোকে দিয়ে এলাম।’

‘কিন্তু খাটটা আমার অপরাধবোধ আরও তীব্র করে তোলে। তুমি যদি অনুমতি দাও এটা তোমার বাবার বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে আসি। যে শক্ত কাঠ মনে হয় আরও একশ বছরেও এর কিছু হবে না।’

‘দান বা উপহারের জিনিস কি কোনোদিন ফিরিয়ে নিতে আছে? এর মধ্যে এটা দুই বার হাত বদল হয়েছে।’

‘কাকিমা তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি, এই খাটে ঘুমতে আমার অপরাধবোধ হয় একথা সত্যি। আবার এই খাট ছেড়ে আমি অন্য ঘরে ঘুমতে গেলেও ঘুম আসে না। তুমি আমাকে এ-কী উভয় সঙ্কটের মধ্যে ফেলে গেলে? আমার মনে হয় তোমাদের দেশছাড়ার কষ্টটা আমার বুকে পাল্টা শেল হয়ে বিঁধে।’

‘আচ্ছা তুই একটা কাজ করিস।’

‘কী কাকিমা?’ শুভব্রতের উদগ্রিব কন্ঠ।

‘তুই মাঝে মাঝে ভিডিও কল করে আমাকে ওই খাটটা দেখাবি।’

‘আচ্ছা, কাকিমা। তাহলে এখনই একবার দেখাই?’

দিনের বেলা হওয়া সত্ত্বেও শুভব্রত ঘরের সবগুলো আলো জ্বেলে দেয় যাতে শান্তিরানি তার পিতার দেয়া খাটটা মোবাইলে স্পষ্ট দেখতে পায়।  সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিমকাঠে কালো বার্নিশ করা খাটখানা কাকিমাকে দেখায়। শান্তিরানি বলেন, ‘এবার একটু উঠোনে যা-তো।’

শুভব্রত উঠোনে গিয়ে উঠোনের মাটি, শিউলিতলা, জবা আর বকুল গাছ, পুরনো কলতলা সবকিছু দেখায়। সে টের পায় কাকিমা অঝোরে কাঁদছেন।

পরদিন শুভব্রত সকালে কাকিকে আবার ফোন দেয়। বলে, ‘কাকিমা অনেকদিন পর আমি রাতে একটু শান্তি করে ঘুমতে পেরেছি।’

শান্তিরানি বলেন, ‘আমিও বাবা।’

শুভব্রত চোখে জল এনে বলে, ‘তুমি আমাকে মাফ করবে না জানি। কিন্তু তোমার পায়ে একটি নিবেদন করে যাই।’

‘কী?’

‘আর জনমে তুমিই আমার মা হয়ো।’

শান্তিরানিও চোখের জল আটকাতে পারেন না। তার বুকের ভিতরটা নিম কাঠের খাট, শ্বশুরবাড়ির উঠোন এবং আরও বিবিধ স্থূল ও সূক্ষ্ম, প্রকাশযোগ্য ও অপ্রকাশ্য কারণে হুহু করতে থাকে।